রবিবার, ০৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৩:৩১

সাগরিকা এক্সপ্রেসেই কেনো একের পর এক প্রাণহানি!

দুই বছরে অন্তত ছয় মৃত্যু, নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন

উজ্জ্বল হোসাইন
সাগরিকা এক্সপ্রেসেই কেনো একের পর এক প্রাণহানি!

চাঁদপুর-লাকসাম-চট্টগ্রাম রেলপথে চলাচলকারী সাগরিকা এক্সপ্রেসকে ঘিরে সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক প্রাণহানির ঘটনায় এই রুটে রেলপথের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। গত দুই বছরে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য পর্যালোচনা করে সাগরিকা এক্সপ্রেসের নিচে কাটা পড়ে অন্তত ছয়জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে শিশু-কিশোরী, যুবক, অজ্ঞাত নারী এবং সর্বশেষ এক অজ্ঞাত বৃদ্ধ রয়েছেন।

সর্বশেষ ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ চাঁদপুরে সাগরিকা এক্সপ্রেস ট্রেনের নিচে কাটা পড়ে এক বৃদ্ধের মৃত্যু হয়েছে বলে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। নিহতের পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি। প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, শহরের ওয়্যারলেস এলাকায় চাঁদপুর থেকে ছেড়ে যাওয়া চট্টগ্রামগামী সাগরিকা এক্সপ্রেসের নিচে পড়ে ওই ব্যক্তি মারা যান। ঘটনাটি দুর্ঘটনা, অসাবধানতা নাকি অন্য কোনো কারণে ঘটেছে—তা নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

এর আগে ১৩ আগস্ট ২০২৬ চাঁদপুর শহরের ছায়াবাণী রেলক্রসিংয়ের পূর্ব পাশে সাগরিকা এক্সপ্রেসের নিচে কাটা পড়ে তায়েবা আক্তার (১৪) নামে নবম শ্রেণির এক মাদ্রাসা ছাত্রীর করুণ মৃত্যু হয়। পুলিশ জানায়, পরিচয়পত্রের মাধ্যমে তার পরিচয় শনাক্ত করা হয়। তবে কেনো এবং কীভাবে তিনি রেললাইনের ওপর ছিলেন সে বিষয়ে তখনও নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

২২ মার্চ ২০২৫ শাহরাস্তির দোয়াভাঙ্গা রেলগেট এলাকায় সাগরিকা এক্সপ্রেসের নিচে কাটা পড়ে বাবুল হোসেন (৩২/৩৫) নামে এক যুবকের মৃত্যু হয়। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি মানসিক ভারসাম্যহীন ছিলেন। চট্টগ্রামগামী ট্রেনটি ঘটনাস্থল অতিক্রম করার সময় তিনি ট্রেনের নিচে পড়ে যান।

এর প্রায় তিন মাস পর ১০ জুন ২০২৫ লাকসাম রেলওয়ে জংশন এলাকায় চাঁদপুর থেকে চট্টগ্রামগামী সাগরিকা এক্সপ্রেসের নিচে কাটা পড়ে আনুমানিক ৫০ বছর বয়সী এক অজ্ঞাত নারীর মৃত্যু হয়। পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই নারী রেললাইনের ওপর অবস্থান করছিলেন। ট্রেনের হর্ন ও আশপাশের লোকজনের সতর্কতা সত্ত্বেও তিনি সরে যাননি বলে সংবাদে উল্লেখ করা হয়েছে। তার পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।

আরও আগে ২৪ এপ্রিল ২০২৪  তারিখে হাজীগঞ্জের কাজীগাঁও এলাকায় সাগরিকা এক্সপ্রেসের নিচে পড়ে তাহমিনা আক্তার (২৪) ও তার দেড় বছর বয়সী সন্তানের মৃত্যু হয়। সংবাদ প্রতিবেদনে ঘটনাটিকে আত্মহত্যা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং পারিবারিক বিরোধের বিষয়টিও উঠে এসেছে। এসব  ঘটনা রেলপথের নিরাপত্তাজনিত দুর্ঘটনার পাশাপাশি ভিন্ন একটি সামাজিক বাস্তবতার দিকও সামনে আনে।

দুর্ঘটনা নাকি অব্যবস্থাপনার ফল?

ঘটনাগুলো আলাদা আলাদা হলেও একটি বিষয় চোখে পড়ার মতো—চাঁদপুর-লাকসাম রেলপথের বিভিন্ন স্থানে রেললাইন মানুষের চলাচলের সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে মিশে আছে। বিশেষ করে রেলক্রসিং, অননুমোদিত পারাপারের পথ এবং জনবসতিপূর্ণ এলাকার রেললাইনগুলোতে নিরাপত্তা কতোটা কার্যকর, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

আগের একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে চাঁদপুর-লাকসাম রেলপথের ৫২ কিলোমিটার এলাকায় একাধিক রেলক্রসিং এবং অনুমোদনহীন ক্রসিংয়ের কথা উঠে এসেছিল। রেললাইন ঘেঁষে অবৈধ স্থাপনা ও মানুষের অবাধ চলাচলের বিষয়টিও সেখানে উল্লেখ করা হয়। প্রশ্ন উঠছে রেলওয়ের দায়িত্ব নিয়ে।

রেললাইনে মানুষের অবাধ চলাচল বন্ধে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা আছে কি না, ঝুঁকিপূর্ণ ক্রসিংগুলোতে গেটম্যান দায়িত্ব পালন করছেন কি না, কোথাও অবৈধ পারাপারের পথ তৈরি হয়েছে কি না—এসব বিষয় তদন্ত করা জরুরি।

একই সঙ্গে প্রতিটি প্রাণহানির ঘটনায় রেলওয়ে পুলিশ কী ধরনের তদন্ত করেছে, অপমৃত্যু মামলা হওয়ার পর তদন্তের ফল কী হয়েছে এবং ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো চিহ্নিত করে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ কী ব্যবস্থা নিয়েছে—এসব প্রশ্নের উত্তরও জনসমক্ষে আসা প্রয়োজন। কারণ একটি দুর্ঘটনাকে নিছক ‘অসাবধানতা’ বলে দায় শেষ করে দিলে সমস্যার মূল কারণ অদৃশ্যই থেকে যায়। বিশেষ করে একই রেলপথে বারবার একই ধরনের প্রাণহানি ঘটতে থাকলে সেখানে অবকাঠামোগত দুর্বলতা, নিরাপত্তা ঘাটতি ও জনসচেতনতার পাশাপাশি রেলওয়ের ব্যবস্থাপনাগত দায়িত্বও খতিয়ে দেখা দরকার।

পাঁচ মৃত্যুর পরও কি শিক্ষা নেয়া হবে?

গত দু বছরের প্রকাশিত ঘটনাগুলো বলছে, সাগরিকা এক্সপ্রেসের চলাচলের পথে প্রাণহানি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। কখনো রেলক্রসিংয়ে, কখনো রেললাইনের পাশে, কখনো স্টেশন এলাকায় মানুষের জীবন ঝুঁকিতে পড়ছে।

সম্প্রতি অজ্ঞাত বৃদ্ধের মৃত্যু সেই প্রশ্নটিই আবার সামনে এনেছে—আর কত প্রাণ গেলে চাঁদপুর-লাকসাম রেলপথের ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোকে নিরাপদ করার উদ্যোগ নেয়া হবে?

রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ, জেলা প্রশাসন, রেলওয়ে পুলিশ এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সমন্বিত উদ্যোগে ঝুঁকিপূর্ণ ক্রসিং চিহ্নিতকরণ, প্রয়োজনীয় গেটম্যান নিয়োগ, অবৈধ পারাপার বন্ধ, রেললাইন ঘেঁষে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ এবং জনসচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করা এখন সময়ের দাবি।

সাগরিকা এক্সপ্রেস মানুষের যাতায়াতের নিরাপদ বাহন হোক—মৃত্যুর ফাঁদ নয়।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়