প্রকাশ : ২১ এপ্রিল ২০২৬, ২৩:১৮
তরুণ নাট্যকার জসীম মেহেদী রচিত ও নির্দেশিত
অনন্যার ‘জলরূপালী’ নাটক সহসাই মঞ্চে আসছে

অনন্যা নাট্যগোষ্ঠীর ৪৬তম প্রযোজনা তরুণ নাট্যকার জসীম মেহেদী রচিত ও নির্দেশিত গবেষণামূলক সচেতনতামূলক নাটক ‘জলরূপালী’ সহসাই মঞ্চে আসছে। ইতোমধ্যে নাটকটির ৫০% ভাগ মহড়া সম্পন্ন হয়েছে। নাটকটিতে নবীন-প্রবীণ নাট্যশিল্পীদের অংশগ্রহণে প্রায় দেড় মাস ধরে মহড়া চলছে। ‘জলরূপালী’ নাটকটি অনেকটা পালা টাইপের নাটক হিসেবে মঞ্চায়নের প্রস্তুতি চলছে। এ নাটকে অভিনয়, কোরিওগ্রাফি ও জারি-সারি গান প্রাধান্য পাচ্ছে। নাটকটির সকল কোরিওগ্রাফি, সংগীত লেখা ও সুর দিয়েছেন নাটকের রচয়িতা ও নির্দেশক জসীম মেহেদী।
বাংলাদেশ সরকার প্রতি বছর মা ইলিশ ও জাটকা সংরক্ষণের জন্যে চাঁদপুরের মেঘনা-পদ্মা নদীতে সকল প্রকার মাছ ধরা বন্ধ রাখে। যাতে মা ইলিশ মিঠা পানিতে এসে ডিমসহ বাচ্চা দিতে পারে এবং ইলিশের বাচ্চা অর্থাৎ জাটকা মাছ নিধন না করার লক্ষ্যে দু’মাস ও ২২ দিন সকল প্রকার মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রদান করা হয়। এজন্যে সরকারের পক্ষ থেকে নদীতে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের নেতৃত্বে নৌ-পুলিশ, কোস্টগার্ড ও গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন নিয়মিতভাবে অভিযান করে থাকেন। সরকারের কড়াকড়ি অভিযানের মধ্যেও কিছু কিছু অসাধু জেলে প্রশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে মাছ শিকারের জন্যে নদীতে নামছে। অভিযান চলাকালীন ওই সকল জেলে নৌকা ও জালসহ আটক হচ্ছে প্রতিনিয়ত। আটক হওয়া জেলেদের মাঝে অপ্রাপ্ত বয়স্ক ও ১৪/১৬ বছরের কিশোর জেলেও ধরা পড়ছে। পরে আইন প্রয়োগকারী নৌ পুলিশ কর্মকর্তারা আটক হওয়া কিশোর জেলেদের মুচলেকা রেখে ছেড়ে দিচ্ছে। বয়স্ক জেলেদের মৎস্য সংরক্ষণ আইনে কোর্টে চালান দিয়ে জেলে পাঠানো হয়। অভিযানে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা মূল্যের জাল পুড়িয়ে ফেলা হয় এবং আটক নৌকাগুলো ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে ফেলা হয়। মা ইলিশ ও জাটকা সংরক্ষণ অভিযানের সুযোগে কিছু অসাধু ও অতিলোভী আড়তের মহাজনরা অসাধু জেলেদের গোপনে দাদন দিয়ে নদীতে নামানোর জন্যে উৎসাহিত করছে। অথচ সরকারের দেয়া দুটি অভিযানে মাছ না মারার শর্তে হজার হাজার নিবন্ধিত জেলেদের মাঝে চাউলসহ বিভিন্ন উপকরণ দিয়ে সহায়তা অব্যাহত রেখে চলেছে সরকার। সরকারের উদ্দেশ্য হচ্ছে, নদীর ইলিশ বড়ো হলে জেলেরাই লাভবান হবে এবং ভালো মূল্য পাবে। এতো আইন ও অর্থ ব্যয়ের পরও অবৈধ পন্থায় নদীতে জাল ফেলে মা ইলিশ নিধন ও জাটকা ধরা বন্ধ হচ্ছে না।
‘জলরূপালী’ নাটকের কাহিনীর সার সংক্ষেপ : জেলে পাড়ার বাসিন্দা নরেশ মাঝি। বাপ-দাদা চৌদ্দ গোষ্ঠী ছিলো জেলে। সরকারি নিষেধাজ্ঞা শুরু হলে সে কখনো নদীতে জাল ফেলতে নামেনি। আড়তদার মহাজন ও কিস্তির টাকা তুলে নৌকা-জাল কিনে নদীতে নামে। কিন্তু নদীতে মাছ শিকারে নামলেও পূর্বের মতো ইলিশ না পাওয়ায় অন্যান্য জেলেদের মতো নরেশ মাঝিও হতাশ। অভাব-অনটনে দেনায় জর্জরিত নরেশ মাঝি কখনও আশা ছাড়েননি। তার বিশ্বাস অভিযান শেষ হলে ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ ধরতে পারবেন। এদিকে আড়তের মহাজন ও এনজিওর কিস্তিওয়ালারাও বসে থাকেনি। তাদের পাওনা টাকার জন্যে প্রতিনিয়ত বাড়িতে হানা দেয়। প্রতিদিন নদীতে ইলিশ মাছ ধরলেও বাড়িতে ইলিশ মাছ আনতে পারেননি নরেশ মাঝব। তার একমাত্র মেয়ে কাজলীর প্রতিদিন আলু ভর্তা, ডাল দিয়ে ভাত খেতে ভালো লাগে না। সে প্রতিদিন বাপের কাছে আবদার করে ইলিশ মাছ খাওয়ার। নরেশ মাঝি নদীতে মাছ শিকারের পর ঘাটে থাকে আড়তদার মহাজন। সে তার টাকার জন্যে মাছ ঘাটে নৌকা ভিড়ার সাথে সাথে সকল মাছ নিয়ে যায়। এভাবেই চলে নরেশ মাঝির জীবন কাহিনী। ২২ দিনের মা ইলিশ রক্ষা অভিযান শেষ হলেই নরেশ মাঝি ইলিশ ধরতে নদীতে যায়। এ সময় জাল ফেলার পূর্বে ভগবানের কাছে প্রার্থনা করে একটা বড়ো ইলিশ যেন ভগবান মিলিয়ে দেয়। ৫ ঘণ্টা নদীতে মাছ শিকার করতে করতে হঠাৎ তার জালে ৪/৫ কেজি ওজনের রাজা ইলিশ ধরা পড়ে। নদীতে থাকাবস্থায় বিষয়টি জেনে যায় সাংবাদিক, মহাজনসহ অন্যান্য ক্রেতাগণ। তারা মাছ ঘাটে এসে অবস্থান নেয়। ঘাটে আসার পর মহাজনসহ সাংবাদিকগণ রাজা ইলিশ দেখতে আগ্রহ প্রকাশ করে। কিন্তু নরেশ মাঝি জানান, রাজা ইলিশ পাওয়ার পর এ বড়ো মাছটি বাড়িতে নিয়ে মেয়ে কাজলীকে খাওয়াবেন। রাজা ইলিশ নিয়ে মহাজনের সাথে নরেশ মাঝির বাকবিতণ্ডার এক পর্যায়ে বড়ো ইলিশ মাছটির ডাক উঠে। একজন ক্রেতা ১৩ হাজার টাকা দিয়ে রাজা ইলিশটি ডাকে কিনে নেয়। পরে ঐ ক্রেতা মাছটি নরেশ মাঝির মেয়ের জন্যে উপহার হিসেবে জোর করে নরেশ মাঝির হাতে তুলে দেন।
পরবর্তীতে জাটকা সংরক্ষণ অভিযান চলাকালে জেলে পড়ার অপ্রাপ্ত বয়স্ক বেশ ক’জন শিশু-কিশোর অভিযানের তোয়াক্কা না করে নদীতে মাছ শিকারে নদীতে নামলে কোস্টগার্ড তাদের নৌকাটি ধাওয়া করে। কোস্টগার্ড সদস্যরা বারংবার তাদের নৌকা থামানোর জন্যে বললেও তারা না থামিয়ে লগ্গীমারা চরে যাওয়ার চেষ্টা চালালে তাদের লক্ষ্য করে গুলি চালায়। গুলির সাথে সাথে নৌকা থেকে লাফিয়ে নদীতে পড়ে। এদের মধ্যে বলাই নামক এক দাদনদার গুলিবিদ্ধ হয়ে নদীতে তলিয়ে যায়। বাকি কিশোর জেলেরা সাঁতরিয়ে চরে ওঠে। পরে গুলিবিদ্ধ মৃত বলাই’র লাশ ভেসে ওঠে। নৌ পুলিশ লাশ উদ্ধার করে ময়না তদন্তের জন্যে থানায় নিয়ে আসে। ময়না তদন্ত শেষে লাশ জেলে পাড়ায় নিয়ে আসে। ওই সময় শোকে স্তব্ধ হয়ে যায় জেলে পাড়া।
‘জলরূপালী’ নাটকের বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয়ে রয়েছেন : ফাতেমাতুজ জোহরা (গায়েন), হৃদয় কর্মকার (গায়েন), শহীদ পাটোয়ারী, জসীম মেহেদী, কামরুল ইসলাম, সীমা ইসলাম, মানিক দাস, মোহাম্মদ আলমগীর হোসেন পাটওয়ারী, শরীফুল ইসলাম, দুলাল সরকার, আয়শা সিদ্দিকা আভা, আখলাকুল ইসলাম লাকু, দীপক ভট্টাচার্য, বীরেন সাহা, প্রান্তিক, মহিউদ্দিন, আবির, রাফি, আলিফ, আল ইমান, আয়াত আলী, শান্ত প্রমুখ।
‘জলরূপালী’ নাটকের রচয়িতা ও নির্দেশক জসীম মেহেদী নদীতে মাছ শিকারী জেলেদের বাস্তব চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন অভিনয়ের মাধ্যমে। বিশেষ করে সরকারের কড়াকড়ি অভিযানে কিশোর জেলেদের কারা নদীতে নামাচ্ছে, তারও ইংগিত দেওয়া হয়েছে।








