শনিবার, ০৪ এপ্রিল, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ
  •   চাঁদপুর জেলা পরিষদের প্রশাসক অ্যাড. সলিম উল্লা সেলিম!

প্রকাশ : ০৪ এপ্রিল ২০২৬, ০০:১২

অজানা গন্তব্যে

উজ্জ্বল হোসাইন
অজানা গন্তব্যে

বিদায় নিলাম প্রিয় বিদ্যালয় থেকে। অজানা এক গন্তব্যে পাড়ি দিলাম...। ছোটবেলা থেকেই মনের মধ্যে একটা জেদ ছিলো বিজ্ঞান বিভাগে পড়বো এবং মানুষের সেবায় ডাক্তার অথবা শিক্ষক হবো। স্কুলজীবনে যখন জীবনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য নিয়ে রচনা লিখতাম এ দুটোকে বেছে নিতাম। তখন মনে মনে ভাবতাম ডাক্তারি পেশা বিশ্বের অন্যতম শ্রদ্ধেয় ও সেবামূলক পেশা। এটি শুধুমাত্র একটি চাকরি বা আয়ের উৎস নয়, বরং এটি মানুষের জীবন বঁাচানোর এবং তাদের সুস্থতার জন্য কাজ করার মহান সুযোগ। একজন ডাক্তার রোগ নির্ণয়, চিকিৎসা এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাগ্রহণের মাধ্যমে মানুষের সুস্থতা নিশ্চিত করেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিকাশ এবং আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় আজকের ডাক্তাররা রোগ নিরাময়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।

মানবসভ্যতার সূচনালগ্ন থেকেই চিকিৎসকরা মানুষের সেবা করে আসছেন। প্রাচীন মিসর, গ্রীস, ভারত এবং চীনে চিকিৎসাবিদ্যার বিভিন্ন রকম চর্চা ছিল। সক্রেটিস, চরক, ইবনে সিনার মতো চিকিৎসকরা বিশ্বজুড়ে চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিকাশে অবদান রেখেছেন। বর্তমানে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান অনেক উন্নত হলেও, ডাক্তারদের মূল দায়িত্ব এখনও অপরিবর্তিত রয়েছেÑমানুষের জীবন বঁাচানো এবং তাদের কষ্ট লাঘব করা। ডাক্তারি পেশা শুধু চিকিৎসা প্রদান নয়, বরং এটি সমাজের সার্বিক কল্যাণে ভূমিকা রাখে। সমাজের সব শ্রেণির মানুষই ডাক্তারদের উপর নির্ভরশীল। একটি দেশ বা জাতির সার্বিক উন্নতির জন্য স্বাস্থ্যখাতের গুরুত্ব অপরিসীম, আর এই খাতে ডাক্তারদের ভূমিকা মুখ্য।

প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হন এবং চিকিৎসার অভাবে মৃত্যুর মুখোমুখি হন। ডাক্তাররা তাদের চিকিৎসা দিয়ে নতুন জীবন দান করেন। অপারেশন, ওষুধ প্রয়োগ, থেরাপি ইত্যাদির মাধ্যমে তারা মানুষের জীবনে আশার আলো নিয়ে আসেন।

ডাক্তাররা শুধুমাত্র রোগ নিরাময় করেন না, তারা স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। বিভিন্ন স্বাস্থ্য ক্যাম্প, টিকা কর্মসূচি এবং জনসচেতনতামূলক কর্মসূচির মাধ্যমে তারা মানুষকে সুস্থ থাকার উপায় শেখান।

ডাক্তাররা মহামারী ও সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। কোভিড-১৯ মহামারীর সময় ডাক্তারদের আত্মত্যাগ বিশ্ববাসীর সামনে স্পষ্ট হয়েছে। তারা দিনের পর দিন নিজেদের জীবন ঝুঁকিতে ফেলে রোগীদের সেবা করেছেন এবং এখনও করে যাচ্ছেন। বর্তমান সমাজে মানসিক রোগের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। বিষণ্নতা, উদ্বেগ, এবং অন্যান্য মানসিক সমস্যাগুলোর সমাধানে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও মনোবিজ্ঞানীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ডাক্তাররা মানসিকভাবে অসুস্থ রোগীদের সহায়তা করে তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনেন। মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যু হ্রাসে ডাক্তারদের অবদান অপরিসীম। গর্ভবতী মায়েদের সঠিক চিকিৎসা, পুষ্টি পরামর্শ এবং নিরাপদ প্রসব নিশ্চিত করতে ডাক্তারদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তবে বর্তমানে চিকিৎসকদের অর্থ লোভ ও নানা কারণে এই পেশার মূল্যায়ন করা যায় না।

আরো একটি লক্ষ্য নিয়ে রচনা লিখতাম সেটি হলো শিক্ষকতা। এই পেশাটি এখন সবার উপরে মর্যাদার স্থান ধরে রেখেছে। তবে শিক্ষকদের কাঙ্ক্ষিত সুবিধা না পাওয়ার কষ্ট সবসময় মনের মধ্যে কষ্ট দেয়। আমরা জাতি হিসেবে এই মহান পেশার সঠিক মূল্যায়ন করতে পারিনি। তবে আমি ডাক্তার কিংবা শিক্ষক কোনটাই হতে পারিনি। স্কুলজীবন শেষ করে যখন উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি হবো তখন কানের মধ্যেই ওই কথাটি চলে আসতো বিজ্ঞান বিভাগে পড়বো। নানা জায়গায় ভর্তি পরীক্ষা দিলাম। এর মধ্যে বন্ধু তুহিনসহ ঢাকা পলিটেকনিকে ভর্তি পরীক্ষা দিই। দুজনই ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হই। কিন্তু স্বপ্নের ঢাকা শহরের বুকে আমার কোনো ঠঁাই হয়নি। পরিবারের আর্থিক দৈন্যতা আমাকে সেখানে যেতে বারণ করেছে। তবুও একবার জেদ চেপেছিলো যাবোই। কিন্তু পরক্ষণেই স্বপ্নের মৃত্যু হলো। ঢাকা গিয়ে কোথায় উঠবো, কোথায় থাকবো এই স্বপ্নের নগরীতে আমার পড়াশোনার ব্যয় কীভাবে মেটাবো। তাই নানা হিসাব কষে যাওয়া হলো না।

চঁাদপুর সরকারি কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হওয়ার দিনটা এখনও স্পষ্ট মনে পড়ে। নতুন শহর, নতুন মানুষ, আর বুকভরা স্বপ্ন সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত উত্তেজনা কাজ করছিল। মনে হয়েছিল, এই পথই আমাকে অনেক দূর নিয়ে যাবে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বুঝলাম, শুধু স্বপ্ন থাকলেই হয় না, সেই স্বপ্ন ধরে রাখতে লড়াইও করতে হয়। কখনও নিজের সঙ্গে, কখনও পরিস্থিতির সঙ্গে।

কলেজে ভর্তি হওয়ার পরপরই বুঝতে পারলাম, বিজ্ঞান বিভাগে টিকে থাকতে হলে প্রাইভেট পড়া অপরিহার্য। পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, আর গণিত এই তিনটা বিষয় যেন আলাদা এক যুদ্ধক্ষেত্র। ক্লাসে যতটুকু বুঝতাম, তা দিয়ে পরীক্ষায় ভালো করা কঠিন। বন্ধুদের অনেকেই নামকরা স্যারদের কাছে পড়তে শুরু করেছে। আমিও কয়েকটা জায়গায় গিয়ে কথা বললাম। কিন্তু যখন মাসিক টাকার কথা শুনতাম, বুকের ভেতরটা হালকা কেঁপে উঠত।

বাবা একজন মধ্যবিত্ত মানুষ। সংসার চালাতেই যেখানে হিমশিম খেতে হয়, সেখানে আমার প্রাইভেটের বাড়তি খরচ যেন একটা বড় বোঝা। তবুও প্রথমদিকে অনেক কষ্টে কিছু টাকা জোগাড় করে দু-একটা সাবজেক্টে ভর্তি হলাম। কিছুদিন ভালোই চলছিল। নতুন করে পড়াশোনা শুরু করার একটা আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু মাস দুই যেতে না যেতেই টাকার টান পড়ে গেল। বাধ্য হয়ে একে একে সব প্রাইভেট বন্ধ করতে হলো।

সেই সময়টা ছিল খুব কঠিন। ক্লাসে গিয়ে যখন দেখি অন্যরা এগিয়ে যাচ্ছে, আর আমি ধীরে ধীরে পিছিয়ে পড়ছি, তখন নিজেকে খুব অসহায় মনে হতো। বই খুলে বসতাম ঠিকই, কিন্তু অনেক কিছুই মাথায় ঢুকত না। মনে হতো, কেউ যদি পাশে বসে একটু বুঝিয়ে দিত!

এভাবে কয়েক মাস কাটতে থাকল। দিন যায়, মাস যায় কিন্তু আমার পড়াশোনার ঘাটতি যেন বাড়তেই থাকে। মাঝে মাঝে ভয় পেয়ে যেতাম। ভাবতাম, পরীক্ষা যদি এভাবেই এসে যায়, আমি কীভাবে সামলাব?

নতুন শহরে এসে আরেকটা বড় সমস্যা হলো টিউশনি না পাওয়া। ভাবছিলাম, যদি একটা টিউশনি পাই, তাহলে নিজের খরচটা অন্তত নিজেই চালাতে পারব। অনেক জায়গায় খেঁাজ করলাম, পরিচিতদের বললাম, কিন্তু কিছুতেই কিছু হলো না। যেন সব দরজাই বন্ধ।

আমার এক বন্ধু ছিল সোহাগ। সে শেরে বাংলা হোস্টেলে থাকত। একদিন সাহস করে তাকে বললাম, দোস্ত, যদি একটা টিউশনি ম্যানেজ করে দিতে পারিস, খুব উপকার হয়। সে আন্তরিকভাবে চেষ্টা করেছিল, কয়েক জায়গায় কথা বলেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কিছুই হলো না। সে নিজেও লজ্জিত হয়ে বলেছিল, চেষ্টা করলাম, কিন্তু পারলাম না রে। আমি শুধু হেসে বলেছিলাম, কোনো সমস্যা নাই। কিন্তু ভেতরে ভেতরে একটা হতাশা আমাকে গ্রাস করছিল।

এদিকে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা যেন দ্রুত এগিয়ে আসছিল। ক্যালেন্ডারের পাতাগুলো উল্টাতে উল্টাতে হঠাৎই বুঝতে পারলাম সময় আর বেশি নেই। মাথার ভেতর তখন একটাই চিন্তা আমি কি পারব?

রাতের পর রাত জেগে থাকার চেষ্টা করতাম। বই খুলে বসতাম, বুঝতে চেষ্টা করতাম, বন্ধুদের কাছ থেকে নোট নিয়ে পড়তাম। কিন্তু তবুও মনে হতো, আমি অনেক পিছিয়ে আছি। কখনও কখনও এতটাই চাপ অনুভব করতাম যে, বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে যেত। ঠিক সেই সময় সিদ্ধান্ত নিলাম, দুই দিনের জন্য বাড়িতে যাব। মনে হচ্ছিল, একটু পরিবারের কাছে গেলে হয়তো মনটা হালকা হবে। আর ফরম ফিলাপের টাকার কথাটাও বাবাকে বলতে হবে।

বাড়িতে পেঁৗছে মায়ের মুখটা দেখে সব ক্লান্তি যেন দূর হয়ে গেল। মা জিজ্ঞেস করলেন, হঠাৎ চলে এলি? আমি হেসে বললাম, এমনি, একটু দেখতে ইচ্ছে করল। কিন্তু তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, আমার ভেতরে কিছু একটা চলছে।

রাতে খাওয়ার পর বাবার পাশে বসে অনেকক্ষণ চুপ করে ছিলাম। কীভাবে বলব, সেটা বুঝে উঠতে পারছিলাম না। শেষ পর্যন্ত সাহস করে বললাম, বাবা, ফরম ফিলাপের জন্য কিছু টাকা লাগবে।

বাবা একটু চুপ করে রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে বললেন, কত লাগবে? আমি পরিমাণটা বললাম। তিনি মাথা নেড়ে বললেন, ঠিক আছে, ব্যবস্থা করব।

তার কণ্ঠে কোনো অভিযোগ ছিল না, কিন্তু আমি বুঝতে পারছিলাম এই টাকা জোগাড় করা তার জন্য সহজ নয়। সেই মুহূর্তে নিজেকে খুব অপরাধী মনে হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, আমি যেন তাদের ওপর একটা চাপ হয়ে দঁাড়িয়েছি।

পরদিন সকালে বাবা কোথায় যেন বেরিয়ে গেলেন। বিকেলে ফিরে এসে চুপচাপ আমার হাতে টাকা দিলেন। আমি কিছু বলতে পারছিলাম না। শুধু মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলাম যেভাবেই হোক, আমাকে ভালো করতে হবে।

চঁাদপুরে ফিরে এসে নতুনভাবে শুরু করার চেষ্টা করলাম। এবার আর প্রাইভেটের কথা ভাবলাম না। নিজের মতো করে একটা রুটিন বানালাম। প্রতিদিন একটু একটু করে পড়তে লাগলাম। যেটা বুঝতাম না, সেটা নিয়ে লেগে থাকতাম যতক্ষণ না বুঝতে পারছি।

বন্ধুদের সঙ্গেও সময় কাটাতাম, কিন্তু আগের মতো নয়। এখন সময়ের মূল্যটা বুঝতে শিখেছি। মাঝে মাঝে সোহাগের সঙ্গে বসে পড়তাম। সে যেটুকু পারত, আমাকে বুঝিয়ে দিত। পরীক্ষা যতই কাছে আসছিল, ভয়ও ততই বাড়ছিল। কিন্তু সেই সঙ্গে একটা অদ্ভুত সাহসও জন্ম নিচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, এত কিছুর পরও আমি হাল ছাড়িনিÑএটাই আমার সবচেয়ে বড় শক্তি।

অবশেষে পরীক্ষার দিন এসে গেল। হলরুমে বসে যখন প্রশ্নপত্র হাতে পেলাম, তখন মনে হচ্ছিল, এই কাগজটাই যেন আমার সব লড়াইয়ের ফল নির্ধারণ করবে। প্রথমে একটু নার্ভাস লাগছিল, কিন্তু ধীরে ধীরে নিজেকে সামলে নিলাম। প্রশ্নগুলো একে একে পড়তে লাগলাম। কিছু প্রশ্ন দেখে মনে হলো এগুলো আমি পারব। তখন বুকের ভেতর একটা আত্মবিশ্বাস জন্ম নিল। কলম চালাতে শুরু করলাম।

সেই মুহূর্তে বুঝলাম, সবকিছুর পরও আমি লড়াই করে এখানে পেঁৗছেছি। হয়তো সবকিছু নিখুঁত হয়নি, হয়তো অনেক ভুল আছে কিন্তু আমি চেষ্টা করেছি, থেমে যাইনি।

জীবনটা ঠিক এমনই সবসময় সবকিছু সহজ হবে না। কখনও টাকার অভাব, কখনও সুযোগের অভাব, কখনও নিজের ভেতরের ভয় সবকিছু মিলে পথটা কঠিন করে তুলবে। কিন্তু যদি হাল না ছাড়া যায়, তাহলে কোনো না কোনোভাবে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব।

চঁাদপুরের সেই দিনগুলো আমাকে শিখিয়েছে স্বপ্ন দেখতে হলে সাহস লাগে, কিন্তু সেই স্বপ্ন ধরে রাখতে লাগে ধৈর্য আর সংগ্রাম। আর সেই সংগ্রামই একদিন আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তিতে পরিণত হয়।

এরপর একে একে সবগুলো পরীক্ষা দিতে শুরু করলাম। প্রথম কয়েকটা পরীক্ষা মোটামুটি ভালোই হলো। মনে একটু সাহস ফিরে আসছিল হয়তো এত কষ্টের পর কিছু একটা ঠিকঠাক হবে। ঠিক সেই সময়ই হঠাৎ করে একটা টিউশনি জুটে গেল।

খবরটা শুনে প্রথমে আমি কিছুটা দ্বিধায় পড়ে গেলাম। মনে হলো, এখনই কি শুরু করা ঠিক হবে? পরীক্ষা শেষ হলে শুরু করলেই তো হয়। কিন্তু পরক্ষণেই আরেকটা ভয় মাথা চাড়া দিল যদি পরে আর না পাই? যদি এই সুযোগটা হাতছাড়া হয়ে যায়? এই দ্বন্দ্বে কিছুক্ষণ ভুগে শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিলাম না, এখনই শুরু করব। জীবনে এমন সুযোগ বারবার আসে না। আর টাকার প্রয়োজন তো আছেই।

এইভাবেই পরীক্ষার মাঝেই শুরু হলো আমার নতুন রুটিন। সকালে পরীক্ষা, বিকেলে টিউশনি, রাতে নিজের পড়াশোনা আর তার সঙ্গে লজিংয়ের বাড়ির ছেলেমেয়েদের পড়ানো। দিনগুলো যেন হঠাৎ করেই অনেক ছোট হয়ে গেল। ২৪ ঘণ্টা সময় যেন আর যথেষ্ট মনে হতো না।

রাতে যখন সবাই ঘুমিয়ে পড়ত, তখন আমি বই খুলে বসতাম। চোখে ঘুম, শরীরে ক্লান্তি তবুও নিজেকে জোর করে পড়তে বসাতাম। মনে হতো, আর একটু আর একটু পড়ি, তাহলে হয়তো পারব। কিন্তু শরীরের তো একটা সীমা আছে। ধীরে ধীরে ক্লান্তি জমতে শুরু করল। মাথা ধরত, শরীর ভারী লাগত। মাঝে মাঝে জ্বর জ্বর ভাব হতো। তবুও থামিনি। মনে হতো, এখন থামলে সবকিছু ভেঙে পড়বে।

একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে বুঝলাম, শরীরটা একদম ভালো নেই। গা কঁাপছে, মাথা ঝিমঝিম করছে। কিন্তু সেদিনও পরীক্ষা ছিল। নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করে কোনোভাবে পরীক্ষার হলে পেঁৗছালাম। হলের বেঞ্চে বসে মনে হচ্ছিল, শরীরটা যেন আর আমার কথা শুনছে না। প্রশ্নপত্র হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলাম। চোখে সবকিছু ঝাপসা লাগছিল। তারপর ধীরে ধীরে নিজেকে সামলে নিলাম। না, যেভাবেই হোক লিখতে হবে নিজেকে বললাম।

এভাবেই একের পর এক পরীক্ষা দিতে থাকলাম। অসুস্থ শরীর নিয়ে, অদম্য ক্লান্তি নিয়ে তবুও থামিনি। চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার কথাও মাথায় এসেছিল, কিন্তু সময় আর টাকার কথা ভেবে আর যাওয়া হয়নি। মনে হয়েছিল, এই কয়েকটা দিন সহ্য করে যাই, তারপর দেখা যাবে।

সবচেয়ে বেশি ভয় ছিল রসায়ন পরীক্ষাকে নিয়ে। বিষয়টা আগেই দুর্বল ছিল, তার ওপর এই অবস্থায় পড়াশোনাও ঠিকমতো হয়নি। পরীক্ষার দিনটাও খুব খারাপ গেল। প্রশ্নপত্র দেখে বুকটা ধক করে উঠেছিল। কিছু প্রশ্ন চিনতে পারছিলাম, কিন্তু ঠিকভাবে লিখতে পারছিলাম না।

কলম হাতে নিয়ে বসে ছিলাম, কিন্তু মাথা যেন কাজ করছিল না। সময় চলে যাচ্ছিল, আর আমার ভেতরের অস্থিরতা বাড়ছিল। কোনোভাবে যতটুকু পারলাম লিখে এলাম, কিন্তু হল থেকে বের হয়েই বুঝে গিয়েছিলাম এই পরীক্ষাটা ভালো হয়নি।

সেই দিন থেকেই মনের ভেতর একটা অজানা শঙ্কা বাসা বঁাধল। বাকি পরীক্ষাগুলো কোনোভাবে শেষ করলাম, কিন্তু মনটা আর আগের মতো ছিল না। সবসময় মনে হতো যদি খারাপ হয়ে যায়? যদি সব শেষ হয়ে যায়?

পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরও শান্তি পেলাম না। অন্যরা যখন একটু স্বস্তি নিয়ে সময় কাটাচ্ছে, আমি তখন চিন্তার ভেতর ডুবে আছি। টিউশনি চালিয়ে যাচ্ছি, কিন্তু মন পড়ে আছে রেজাল্টের দিকে। অবশেষে সেই দিন এলো রেজাল্ট প্রকাশের দিন।

সকালে থেকেই বুকের ভেতর কেমন যেন ধুকধুক করছিল। হাতে মোবাইল, চোখ স্ক্রিনে কিন্তু সাহস হচ্ছিল না ফলাফল দেখার। মনে হচ্ছিল, এই কয়েকটা সেকেন্ডই হয়তো আমার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে দেবে। অবশেষে কঁাপা হাতে রেজাল্ট দেখলাম। যা হবার তাই হলো-যেটা ভয় করছিলাম, সেটাই হলো। রসায়নে ফল ভালো হয়নি।

মুহূর্তের মধ্যে যেন সবকিছু থেমে গেল। মনে হলো, চারপাশের শব্দগুলো ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে। বুকের ভেতর একটা চাপা ব্যথা অনুভব করলাম। এতদিনের কষ্ট, রাত জাগা, অসুস্থ শরীর নিয়ে পরীক্ষা দেওয়া সবকিছু যেন এক মুহূর্তে অর্থহীন হয়ে গেল। চোখের কোণে পানি চলে এল। নিজেকে খুব অসহায় মনে হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, আমি ব্যর্থ। আমি পারলাম না। মাথার ভেতর ঘুরতে লাগল একটাই প্রশ্ন “আমার স্বপ্ন কি এখানেই শেষ?” যে স্বপ্ন নিয়ে চঁাদপুরে এসেছিলাম, যে স্বপ্নের জন্য এত লড়াই করেছি সেটা কি সত্যিই এত সহজে ভেঙে যাবে?

সেই দিনটা ছিল খুব কঠিন। কারও সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করছিল না। নিজের ভেতরেই ডুবে ছিলাম। মনে হচ্ছিল, চারপাশের সবাই এগিয়ে যাচ্ছে, আর আমি কোথাও আটকে গেছি।

রাতে একা বসে অনেক ভেবেছিলাম। জীবনের এই জায়গায় এসে কি সত্যিই সব শেষ? নাকি এটা একটা ধাক্কা, যেটা আমাকে নতুন করে ভাবতে শেখাবে? ধীরে ধীরে একটা জিনিস বুঝতে পারলাম এই ব্যর্থতাটা হয়তো আমার পুরো গল্প না, এটা শুধু একটা অধ্যায়।

হ্যঁা, আমি ভুল করেছি। হয়তো সময়কে ঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারিনি, হয়তো নিজের শরীরের কথাও শুনিনি। কিন্তু আমি চেষ্টা করেছি। আমি হাল ছাড়িনি। আর সেটাই হয়তো আমার সবচেয়ে বড় শক্তি। সেই রাতেই সিদ্ধান্ত নিলাম না, এখানেই থেমে থাকব না। এই ফলাফল আমার পরিচয় নয়। আমি আবার শুরু করব, নতুন করে।

হয়তো পথটা সহজ হবে না, কিন্তু আমি জানি আমি লড়তে পারি। কারণ আমি সেই মানুষ, যে অসুস্থ শরীর নিয়েও পরীক্ষা দিয়েছে, যে হাজার কষ্টের মধ্যেও স্বপ্ন দেখার সাহস হারায়নি। আর স্বপ্ন সেটা কখনও এত সহজে শেষ হয়ে যায় না। (চলবে)

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়