বুধবার, ১৮ মার্চ, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ
  •   হাজীগঞ্জে ৩ ডাকাত গ্রেফতার। পিকআপ সহ দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার

প্রকাশ : ১৮ মার্চ ২০২৬, ১০:২৯

তোমরা যখন হাসো আলোকিত হয় পৃথিবী

মিজানুর রহমান রানা

গাজার আকাশে ঈদের সকাল। সূর্যের প্রথম কিরণ যখন ভাঙা ঘরবাড়ির ফাঁক দিয়ে প্রবেশ করে, তখন ছোট্ট ইয়াসিন মায়ের হাত ধরে বাইরে বের হয়। তার চোখে ঈদের আনন্দ, কিন্তু চারপাশে ধ্বংসস্তূপ। তবুও সে ভাবেÑআজ ঈদ, আজ আনন্দের মাঝে হাসতে হবে। কিন্তু সে হাসতে পারে না, প্রিয়জনদের মৃত্যু তাকে ব্যাথিত করে তোলে।

মা তার মাথায় হাত বুলিয়ে বলেন, “বাবা, ঈদ মানে শুধু নতুন জামা নয়, ঈদ মানে আল্লাহর কাছে রোজার সওয়াবের আশা।”

ইয়াসিনের মনে প্রশ্ন জাগেÑ মহান আল্লাহর কাছে কাছে প্রাপ্তির আশা কি সত্যিই এত শক্তিশালী?

গাজার মসজিদগুলোতে মানুষ জড়ো হয়। কেউ নতুন কাপড় পরতে পারেনি, কেউবা পুরনো জামা ধুয়ে পরেছে। শিশুরা খালি পায়ে দৌড়ায়, তাদের হাসি যেন ভাঙা দেয়ালের প্রতিধ্বনি।

ইমাম সাহেব ঈদের জামাতের খুতবায় বলেন, “ঈদ আমাদের শেখায়Ñকষ্টের মাঝেও আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞ থাকতে। আর আশা না হারাতে, আল্লাহ সকল মানুষের প্রতি সমান খেয়াল রাখেন, সুখে-দুঃখে তাই আমাদেরকে ধৈয্য ধারণ করতে হবে, আল্লাহর উপর ভরসা করতে শিখতে হবে। ”

শিশুরা নামাজ শেষে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে। তাদের চোখে ক্ষণিকের জন্য যুদ্ধ নেই, শুধু ঈদের আনন্দ।

গাজার ঘরে ঘরে ঈদের রান্না নেই। অনেক পরিবারে খাবার বলতে শুধু রুটি আর খেজুর। তবুও মায়েরা চেষ্টা করেন শিশুদের মুখে হাসি ফোটাতে।

ছোট্ট লায়লা মাকে জিজ্ঞেস করে, “আমাদের বাড়িতে সেমাই নেই কেন?”

মা হেসে উত্তর দেন, “বাবা, সেমাই না থাকলেও আমাদের কাছে আল্লাহর খাছ রহমত আছে।”

লায়লা রুটির টুকরো খেয়ে বলে, “এটাই আমার ঈদের মিষ্টি। তাই না মা?”

মা হেসে বলেন, “আল্লাহ আমাদেরকে পরীক্ষা করার জন্য দুনিয়াতে পাঠিয়েছে মা মনি, কে আমলে শ্রেষ্ঠ তা পরীক্ষা দেওয়ার জন্য। আর এর ফল পাবো আমরা জান্নাতে।”

গাজার শিশুরা খেলনা চায়। কিন্তু দোকান নেই, বাজার নেই। তারা ভাঙা ইট দিয়ে গাড়ি বানায়, কাঠের টুকরো দিয়ে পুতুল।

ইয়াসিন আর লায়লা মিলে খেলা করে। তারা ভাবেÑএকদিন সত্যিকারের খেলনা পাবে। তাদের স্বপ্নে ঈদ মানে রঙিন বেলুন, চকচকে পোশাক, আর মিষ্টির পাহাড়।

বড়রা শিশুদের গল্প শোনায়। নবী ইব্রাহিমের কোরবানির গল্প, ধৈর্যের গল্প। শিশুরা মনোযোগ দিয়ে শোনে। তারা শেখে ত্যাগ মানে শুধু পশু কোরবানি নয়, বরং নিজের স্বার্থ ত্যাগ করে অন্যকে ভালোবাসা।

লায়লা বলে, “আমরা যদি খেলনা না পাই, তবুও হাসি ভাগ করে নিতে পারি।”

তারা উত্তর দেয়, “আল্লাহতায়ালা আমাদেরকে নবী ইব্রাহিম ও ইসমাইল (আ.) এর মতো ধৈয্য ধারণ করার তৌফিক দান করুন।”

বিকেলে শিশুরা ছাদে উঠে আকাশ দেখে। সেখানে আতশবাজি নেই, নেই রঙিন আলো। কিন্তু তারা কল্পনায় আকাশে বেলুন উড়ায়।

ইয়াসিন বলে, “দেখো, আমি লাল বেলুন উড়ালাম।”

লায়লা হাসে, “আমি নীল বেলুন উড়ালাম।”

তাদের কল্পনা আকাশকে রঙিন করে তোলে।

রাতে গাজার আকাশে তারা জ্বলে। শিশুরা মাটিতে বসে তারা গোনে। তারা ভাবেÑপ্রতিটি তারা যেন তাদের জন্য ঈদের উপহার।

মা বলেন, “তোমরা যখন হাসো, তখন পুরো পৃথিবী আলোকিত হয়।”

ঈদের শেষে শিশুরা ক্লান্ত হয়ে ঘুমায়। তাদের স্বপ্নে শান্তির গাজা, রঙিন ঈদ, খেলনা আর মিষ্টি।

তাদের ঈদ হয়তো অন্য শিশুদের মতো নয়। কিন্তু তাদের ঈদে আছে ভালোবাসা, আছে আশা।

গাজার ছোট্ট সোনামনিদের ঈদ হলো বেদনার মাঝেও এক আনন্দ খোঁজার গল্প। তারা শিখেছে ঈদ মানে শুধু ভোগ নয়, ঈদ মানে ভাগাভাগি, কৃতজ্ঞতা আর আশার আলো। এভাবেই তারা প্রত্যেকে আল্লাহকে পাবার জন্য, আল্লাহর ভালবাসা পাবার জন্য ধৈয্য ধারণ করে আর আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকে।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়