শনিবার, ৩১ জানুয়ারি, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ৩১ জানুয়ারি ২০২৬, ০৯:৩১

বিবেকের রক্তক্ষরণ

ক্ষুদীরাম দাস
বিবেকের রক্তক্ষরণ

প্রাচীন ও সুউচ্চ এক মন্দিরের সুতীক্ষè চূড়ায় তখন গোধূলির ম্লান আর রক্তিম আলো এসে পড়েছে, যা’ চারদিকের পরিবেশে এক ধরণের বিষণ্ন গম্ভীরতা ছড়িয়ে দিয়েছিলো। সন্ধ্যারতির পর মন্দিরের পুরোহিত পন্ডিত রামদয়াল যখন ক্লান্ত শরীরে নিজের ছোট ও নিভৃত কামরায় একটু বিশ্রামের জন্যে বসলেন, তখন জানালার বাইরে সন্ধ্যার হিমেল বাতাস বইছিলো। টেবিলের ওপর রাখা প্রদীপটা মৃদু বাতাসে কাঁপছিলো, ঠিক তখনি তার কাঠের দরজায় খুব সন্তর্পণে; অথচ ভীতভাবে একটি মৃদু করাঘাত হলো। পন্ডিতজি কিছুটা অবাক হলেন, কারণ এ সময়ে সাধারণত কেউ তাকে বিরক্ত করে না। তিনি শান্ত স্বরে অনুমতি দেয়ার পর ভেতরে প্রবেশ করলো এ জনপদের এক অতি প্রাচীন ও শ্রদ্ধেয় হিন্দু পরিবারের এক বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্য। লোকটির অবয়ব জুড়ে ছিলো এক গভীর উৎকণ্ঠা আর আতঙ্কের ছাপ, যেন সে কোনো ভয়ঙ্কর দুঃসংবাদ বয়ে এনেছে। সে পন্ডিতজির খুব কাছে এগিয়ে এলো এবং কম্পিত কণ্ঠে জানালো যে, তাদেরই পাড়ার এক প্রান্তে, লোকচক্ষুর আড়ালে থাকা সেই জনশূন্য ও নির্জন বাড়িটি থেকে এক শিশুর করুণ কান্নার শব্দ ভেসে আসছে। সেই কান্না এতোটাই যন্ত্রণাদায়ক আর ভারী যে, তা’ বাতাসের মধ্যদিয়ে যতোই দূরে যাচ্ছে, ততোই যেন মানুষের হৃদয়ে এক অজানা ভয়ের জন্ম দিচ্ছে। লোকটি আরো জানালো যে, এ কান্নার শব্দ দীর্ঘ কয়েকদিন ধরে নিয়মিত বিরতিতে শোনা যাচ্ছে, বিশেষ করে গভীর রাতে যখন চারপাশ নিস্তব্ধ থাকে, তখন সেই অস্ফুট গোঙানি আর কান্নার শব্দে পাড়ার মানুষের ঘুম ভেঙে যায়। কিন্তু সেই বাড়ির চারপাশের পরিবেশ এতোটাই রহস্যময় আর থমথমে যে, পাড়ার কোনো মানুষই একা সেই বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করার বা কী ঘটছে তা’ খতিয়ে দেখার সাহস পর্যন্ত পাচ্ছে না। লোকটির চোখেমুখে ফুটে ওঠা সেই ভীতি দেখে পন্ডিত রামদয়াল বুঝতে পারলেন যে, পর্দার আড়ালে ভয়াবহ কোনো সঙ্কট ঘনীভূত হচ্ছে।

পুরো এলাকাটি যেখানে ধর্মীয় ভ্রাতৃত্ববোধের জন্যে পরিচিত, সেখানে এমন নির্জন বাড়িতে কোনো শিশুর এ অবিরত কান্নার পেছনের রহস্যটা কী, তা’ পন্ডিতজিকে গভীরভাবে ভাবিয়ে তুললো। তিনি অনুভব করলেন, কোনো নিষ্পাপ প্রাণ হয়তো সেখানে অমানবিক যন্ত্রণার মধ্যদিয়ে দিন অতিবাহিত করছে, অথচ লোকলজ্জা বা ভয়ের কারণে সমাজ নীরব হয়ে আছে। লোকটির বর্ণনায় ফুটে উঠছিলো এক অসহায় শিশুর আর্তনাদ, যা’ শুনে পন্ডিতজির মনে হলো ঈশ্বর হয়তো তাকেই এ বিপন্ন শিশুকে উদ্ধারের দায়িত্ব দিয়েছেন। পরিস্থিতি কতোটা ভয়ঙ্কর হতে পারে, তা’ ভেবে পন্ডিতজির কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়লো এবং তিনি তৎক্ষণাৎ নিজের বিশ্রামের কথা ভুলে গিয়ে সেই রহস্যময় বাড়ির উদ্দেশ্যে পা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিলেন। সেই রহস্যঘেরা বাড়িটি ছিলো যমুনার, যে নারী এ হিন্দু সমাজের ভেতরেই থাকতো; কিন্তু চারিত্রিক রুক্ষতার জন্যে সে ছিলো সবার কাছে এক ধরণের অবহেলিত এবং দুঃসম্পর্কের আত্মীয়। এ পাড়ারই এক শিক্ষিত ও সচ্ছল দম্পতিÑসুমন এবং অঞ্জলিÑতাদের সাত বছরের অত্যন্ত আদরের ও নিস্পাপ ছোট্ট মেয়ে তুলিকে লালনপালনের গুরুদায়িত্ব দিয়ে যমুনার কাছে রেখেছিলো। সুমন তার চাকরি সূত্রে অধিকাংশ সময় কক্সবাজার অবস্থান করতে হয় আর অঞ্জলিও তার কর্মস্থল চট্টগ্রামে দিনরাত ব্যস্ত থাকেন। তাদের উভয়ের কর্মব্যস্ততা এতোটাই বেশি আর জীবনের যান্ত্রিকতা এতোটাই প্রখর যে, নিজের কলিজার টুকরো সন্তানকে বুকের কাছে আগলে রাখার মতো ন্যূনতম সময়টুকুও তাদের হাতে নেই। তারা ভেবেছিলো, প্রতিমাসে যমুনার হাতে তুলির খোরাকী, দামী পোশাক, উন্নত মানের খাবার ও অন্যান্য যাবতীয় প্রয়োজনের জন্যে মোটা অঙ্কের টাকার সংস্থান করলেই হয়তো মা-বাবার দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়। টাকার বিনিময়ে ভালোবাসা কেনা যায় না, এ চিরন্তন সত্যটি তারা তাদের অন্ধ কর্মব্যস্ততার কারণে পুরোপুরি ভুলে গিয়েছিলো। খবরটি শোনার পর পন্ডিত রামদয়াল মনে মনে অত্যন্ত বিচলিত হলেন এবং তিনি এক মুহূর্তের জন্যেও আর দেরি করলেন না। তিনি দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় জানতেন যে, এ সমাজ যতোটা সভ্য ও পরিশীলিত বলে নিজেকে দাবি করে, অনেক সময় তার ভেতরের অন্তরালে ততোটাই কুৎসিত অন্ধকার আর বীভৎস সত্য লুকিয়ে থাকে। তিনি দ্রুতপদে যখন যমুনার সেই জরাজীর্ণ ও শেওলা ধরা লোহার গেটের সামনে গিয়ে পৌঁছালেন, তখন চারপাশের পরিবেশ ছিলো একদম নিস্তব্ধ ও থমথমে। এমনকি গাছের পাতাও যেন নড়ছিলো না, যেন পুরো প্রকৃতি কোনো এক অমঙ্গল সংকেতের অপেক্ষায় ছিলো। পন্ডিতজি কান পেতে শোনার চেষ্টা করলেন এবং বন্ধ জানালার কাঠের ফাঁক দিয়ে অস্পষ্টভাবে ভেসে আসছিলো এক শিশুর অতি করুণ ও ভাঙা গলার অস্ফুট গোঙানির শব্দ। সেই শব্দ শুনে পন্ডিতজির মনে হলো, কেউ যেন শিশুটির মুখ চেপে ধরে রেখেছে যাতে তার চিৎকারে আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত না হয়।

পন্ডিতজি অত্যন্ত বিচলিত বোধ করলেন এবং নিজের মনের জোর সঞ্চয় করে সেই পুরনো কাঠের দরজায় বেশ জোরে জোরে কড়া নাড়লেন। দরজার সেই শব্দ নিস্তব্ধ পাড়ায় এক ধরণের গুমোট আবহ তৈরি করলো। বেশ কিছুক্ষণ পর খিল খোলার শব্দ শোনা গেলো এবং যমুনা ধীরে ধীরে দরজা খুললো। দরজা খোলার সাথে সাথেই তার চোখেমুখে ফুটে উঠলো এক ধরণের স্পষ্ট অপরাধবোধ আর ধূর্ততার ছায়া। সে ভাবতেও পারেনি যে, এতো সন্ধ্যায় খোদ পুরোহিত মশাই তার দরজায় উপস্থিত হবেন। তার হাতের আঙুলগুলো কাঁপছিলো আর সে পন্ডিতজির চোখের দিকে সরাসরি তাকাতে পারছিলো না। তার চাউনি ছিলো অনেকটা শেয়ালের মতো সন্ধানী, যেন সে মনে মনে কোনো অজুহাত বা মিথ্যে গল্প সাজানোর চেষ্টা করছিলো।

পন্ডিতজি যমুনার এ অস্বস্তিকর চাহনি দেখে বুঝতে পারলেন যে, ডাল মে কুছ কালা হ্যায়। তিনি তার দীর্ঘ জীবনে অনেক পাপীর চোখের ভাষা পড়েছেন, আর যমুনার চোখে তখন ছিলো এক ভয়ঙ্কর সত্যকে আড়াল করার ব্যর্থ প্রয়াস। ঘরের ভেতর থেকে আসা সেই চাপা কান্নার সুর আর বাইরে যমুনার এই কৃত্রিম বিনয়Ñএ দু’য়ের মধ্যদিয়ে পন্ডিতজি নিশ্চিত হলেন যে, এ বাড়ির ইটের দেয়ালগুলোর ভেতরে কোনো এক নিষ্পাপ স্বর্গীয় দূতের ওপর নারকীয় তাণ্ডব চালানো হচ্ছে। তিনি স্থির করলেন, আজ তিনি এ জরাজীর্ণ গেটের ওপার থেকে সত্য উদ্ধার না করে কোনোভাবেই ফিরবেন না, কারণ ঈশ্বর তাকে এ অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর শক্তি দিয়েছেন। পন্ডিত রামদয়াল আর স্থির থাকতে পারলেন না। তিনি অত্যন্ত কঠোর এবং মেঘমন্দ্র স্বরে প্রশ্ন করলেন, “তুলি কোথায়? আমি এখনই তাকে দেখতে চাই।” তার কণ্ঠস্বরের দৃঢ়তা দেয়ালগুলোতে প্রতিধ্বনিত হলো। যমুনা এমন পরিস্থিতির জন্যে একেবারেই প্রস্তুত ছিলো না। সে অত্যন্ত কাঁচুমাচু করে, হাত কচলাতে কচলাতে আমতা আমতা করে বললো, “পন্ডিত মশাই, মেয়েটার আসলে খুব জ্বর। ও ঘরের একদম কোণে জবুথবু হয়ে ঘুমিয়ে আছে। ও এতোটাই দুর্বল যে চোখ মেলতে পারছে না। ওকে এখন বিরক্ত না করাই সবচেয়ে ভালো হবে, ঘুমালে হয়তো ওর কষ্ট একটু কমবে।” যমুনার কথা বলার ধরণ এবং চোখের চঞ্চলতা দেখে পন্ডিতজির মনে জমে থাকা সন্দেহ আরো ঘনীভূত হলো। তিনি বুঝতে পারলেন, এ নারী কিছু একটা গোপন করার জন্যে আপ্রাণ চেষ্টা করছে।

পন্ডিত রামদয়াল কোনো বাক্যব্যয় না করে নিজের বলিষ্ঠ হাত দিয়ে যমুনাকে আলতোভাবে একপাশে সরিয়ে দিলেন এবং দ্রুতপদে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করলেন। ঘরের ভেতরটা ছিলো ভ্যাপসা গুমোট গন্ধে ভরা। জানালার পর্দাগুলো টানা থাকায় বাইরের আলো ভেতরে প্রবেশ করতে পারছিলো না। তিনি দেখতে পেলেন, ঘরের এক অন্ধকার কোণে অত্যন্ত নোংরা এবং স্যাঁতসেঁতে একটি বিছানায় ছোট্ট তুলি কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে ছিলো। পন্ডিতজি যখন তার কপালে হাত দিলেন, তখন শিউরে উঠলেন; বুঝলেন শিশুটির শরীর তীব্র জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে। কিন্তু যখন তিনি তার গায়ের পাতলা আর ময়লা চাদরটি সরালেন, যা’ দেখলেন তাতে তার পা যেন মাটির সাথে গেঁথে গেলো। ভয়ে আর ঘৃণায় তার পুরো শরীর রি রি করে উঠলো। তিনি দেখলেন, ছোট্ট এ শিশুটির শরীরের এমন কোনো সামান্যতম জায়গা বাকি নেই যেখানে আঘাতের চিহ্ন নেই। কালচে রক্ত জমে থাকা বিশ্রী ক্ষতগুলো স্পষ্টভাবে জানান দিচ্ছিলো যে, দীর্ঘ সময় ধরে তার ওপর অমানবিক ও পাশবিক নির্যাতন চালানো হয়েছে। এমনকি আগুনের ছ্যাঁকার মতো দগদগে ও লাল হয়ে থাকা ঘা তার পিঠের ওপর সারি বেঁধে আছে। শরীরের প্রতিটি ইঞ্চি যেন এক একটি বীভৎস নিষ্ঠুরতার গল্প বলছিলো। যন্ত্রণায় শিশুটি চিৎকার করার শক্তি পর্যন্ত হারিয়ে ফেলেছে, সে শুধু অত্যন্ত করুণ ও মৃদু স্বরে গোঙাচ্ছিলো আর মাঝেমধ্যে অস্ফুটভাবে কাঁদছিলো। তার সেই কান্নার শব্দ পাথরের হৃদয়কেও গলিয়ে দেয়ার মতো হাহাকার বয়ে আনছিলো।

পন্ডিত রামদয়াল রাগে আর ক্ষোভে কাঁপতে শুরু করলেন। তিনি সজোরে ধমক দিয়ে যমুনাকে কাছে ডেকে আনলেন এবং তীক্ষè স্বরে জিজ্ঞেস করলেন, “এ কী অমানুষিক অবস্থা করেছো তুলির? তোমরা কী এর দেখাশোনার জন্য প্রতিমাসে সুমনের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকার সংস্থান করোনি? ভগবানের দোহাই দিয়ে বলো, একটি অবোধ শিশুর সাথে এ কেমনতরো আচরণ?” পন্ডিতজির চোখে তখন আগুনের ফুলকি ঝরছিলো। তিনি বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না যে, একজন মানুষ এতোটা পাষাণ হতে পারে। যমুনা থরথর করে কাঁপতে লাগলো, কিন্তু তার মুখে তখনো কোনো অনুশোচনার লেশমাত্র ছিলো না, বরং ধরা পড়ে যাওয়ার এক ধরণের আতঙ্কই তার চোখেমুখে ফুটে উঠছিলো। পন্ডিতজি অনুভব করলেন, এ শুধু তুলির শরীরের ক্ষত নয়, এ আমাদের সমাজের ভেতরের পচনশীল রূপ যা’ টাকার লোভে মনুষ্যত্বকে বিসর্জন দিয়েছে। যমুনা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিলো, তার মুখে কোনো কথা সরছিলো না। পন্ডিতজির ব্যক্তিত্ব আর ক্রুদ্ধ চাহনির সামনে তার ধূর্ততার সব দেয়াল তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়লো। পরে জেরা করে এবং পারিপার্শ্বিক অবস্থা থেকে জানা গেলো যে, গত এক সপ্তাহ ধরে অবোধ শিশুটি প্রচণ্ড জ্বরে কাতরাচ্ছিলো। তুলির বাবা সুমনকে যমুনা বেশ কয়েকবার ফোনে মিথ্যা উদ্বেগ দেখিয়ে জানিয়েছিলো যে, মেয়ের সুচিকিৎসার জন্যে জরুরি ভিত্তিতে প্রচুর টাকার প্রয়োজন। সুমন তার কলিজার টুকরোর বিপদের কথা শুনে এক মুহূর্ত ভাবেনি, সে তৎক্ষণাৎ কষ্টার্জিত টাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলো। কিন্তু যমুনা কতোটা পাষাণ হলে সেই টাকার এক পয়সাও চিকিৎসার জন্যে বা কোনো ওষুধের জন্যে ব্যয় করেনি। বরং সেই অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে পাঠানো টাকার সম্পূর্ণটাই সে নির্লজ্জভাবে আত্মসাৎ করেছে নিজের ব্যক্তিগত বিলাসিতা আর তুচ্ছ শখের জন্যে। আর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বিষয় হলো, শিশুটি যখন অসহ্য যন্ত্রণায় আর জ্বরের ঘোরে বিছানায় ছটফট করছিলো, তখন তার কান্নার শব্দ যাতে বাইরে না যায় এবং তার শান্তি বিঘ্নিত না হয়, সেজন্যে যমুনা তাকে থামানোর নাম করে আরো নির্দয়ভাবে প্রহার করতো। টাকার নেশা আর অমানবিকতা তাকে পশুর চেয়েও অধম করে তুলেছিলো।

পন্ডিত রামদয়াল আর এক মুহূর্ত কালক্ষেপণ করলেন না। তিনি অত্যন্ত মমতা আর যত্নে সেই কঙ্কালসার আর রক্তাক্ত শিশুটিকে নিজের বলিষ্ঠ কোলে তুলে নিলেন। তুলি তখনো ভয়ে থরথর করে কাঁপছিলো, যেন কোনো স্পর্শই তাকে আর সুরক্ষা দিতে পারবে না এমন এক আতঙ্কে সে কুঁকড়ে গিয়েছিলো। সে এতোটাই ভীত আর মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলো যে, উদ্ধারকর্তা পন্ডিতজির দয়ালু চোখের দিকে সরাসরি তাকাতেও তার প্রচণ্ড কষ্ট হচ্ছিলো। তার দু’চোখ বেয়ে নোনতা জল গড়িয়ে পড়ছিলো। পন্ডিতজি তাকে নিজের বুকের সাথে আগলে ধরে অত্যন্ত কোমল স্বরে অভয় দিয়ে বললেন, “ভয় নেই মা, একদম ভয় পেয়ো না, আমি আছি তোমার পাশে। স্বয়ং ভগবান তোমাকে এ নরক থেকে রক্ষা করবেন, তোমাকে আর কেউ ছুঁতে পারবে না।” পন্ডিতজির সেই অভয়বাণীতে শিশুটি যেন দীর্ঘকাল পর একটু আশ্রয়ের ঘ্রাণ পেলো। সে রাতেই পন্ডিতজি জরুরি ভিত্তিতে সুমন আর অঞ্জলিকে খবর দিয়ে ডেকে পাঠালেন। খবর পেয়েই তারা সব কাজ ফেলে ঝড়ের গতিতে ছুটে এলো। কিন্তু ঘরে প্রবেশ করে যখন তারা নিজেদের একমাত্র মেয়ের এ জীর্ণ আর বীভৎস দশা দেখলো, তখন তারা পাথরের মতো স্তব্ধ হয়ে গেলো এবং পরক্ষণেই ডুকরে কান্নায় ভেঙে পড়লো। সুমন নিজের মাথা দেয়ালে ঠুকছিলো আর অঞ্জলি মেয়ের রক্তাক্ত ক্ষতগুলোতে হাত দিতেও ভয় পাচ্ছিলো। অঞ্জলি তখন হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করতে পারলো যে, তাদের তথাকথিত কর্মব্যস্ততা আর অন্তহীন টাকার পেছনে অবিরাম ছোটা তাদের আদরের সন্তানের জন্যে কতোটা ভয়ঙ্কর আর অপূরণীয় পরিণতি বয়ে এনেছে। তারা নিজেদের বিবেকের কাছে প্রচণ্ড অপরাধী বোধ করছিলো এই ভেবে যে, তারা ভেবেছিলো মাস শেষে যমুনার অ্যাকাউন্টে টাকার অঙ্ক পাঠিয়ে দিলেই হয়তো বাবা-মায়ের দায়িত্ব পালন করা হয়ে যায়। কিন্তু আজ তুলির নিস্তেজ চোখের দিকে তাকিয়ে তাদের মনে হলো, সন্তানের প্রতি মা-বাবার উপস্থিত মমতা আর সরাসরি স্নেহের যে অভাব ছিলো, তা’ পৃথিবীর কোনো বিপুল টাকার বিনিময়ে বা দামী উপহারের মধ্যদিয়ে পূরণ হওয়া কোনোদিনই সম্ভব নয়। তারা বুঝতে পারলো, টাকার চেয়ে জীবনের মানসিক শক্তি আর পারস্পরিক ভালোবাসার বন্ধনই ছিলো আসল রক্ষা কবচ, যা’ তারা অবহেলায় হারিয়ে ফেলেছিলো।

পরদিন সকালে যখন পুব আকাশে সূর্য কেবল উঁকি দিচ্ছে, তখন মন্দিরের বিশাল প্রাঙ্গণে এক জরুরি সভা বসলো। এলাকার ছোট-বড় সকল হিন্দু পরিবারের সদস্যরা সেখানে ভিড় জমালো, কারণ বাতাসের আগে রটে গিয়েছিলো যমুনার সেই বীভৎস নিষ্ঠুরতার কথা। অপরাধী যমুনাকে জনসম্মুখে সেখানে উপস্থিত করা হলো। সে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকলেও তার চোখেমুখে অনুশোচনার লেশমাত্র ছিলো না। পন্ডিত রামদয়াল সভার সামনে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত গম্ভীর এবং বজ্রকণ্ঠে উপস্থিত সকলের উদ্দেশ্যে বললেন, “আমরা জগতের মানুষরা প্রায়ই ভুল করে মনে করি যে, কেবল অগাধ অর্থ আর প্রাচুর্য থাকলেই জীবন সার্থক হয়ে যায়। কিন্তু আমরা চরমভাবে ভুলে যাই যে, হৃদয়ের ভেতরে মানসিক সংগতি, নৈতিক বোধ আর দয়া না থাকলে মানুষ পশুর চেয়েও অধম আর ভয়ঙ্কর হয়ে যায়। তুলি নামের এ ছোট্ট শিশুটির নিথর গায়ের প্রতিটি কালচে ক্ষত আর দগদগে ঘা আমাদের এ সভ্য সমাজের স্বার্থপরতা আর টাকার লালসার এক একটি জীবন্ত চিহ্ন।” তার কথাগুলো উপস্থিত প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে তীরের মতো বিঁধছিলো।

পন্ডিত রামদয়াল তার বক্তব্যের ধার আরো বাড়িয়ে ঘোষণা করলেন যে, কঠোর আইনগত ব্যবস্থার পাশাপাশি যমুনাকে এ সমাজ থেকে সামাজিকভাবে বহিষ্কার করা হবে, যতোক্ষণ না সে তার কৃতকর্মের জন্যে জনসম্মুখে প্রকৃত অনুশোচনা প্রকাশ করে। এরপর তিনি অত্যন্ত কঠোর দৃষ্টিতে সুমন ও অঞ্জলির দিকে তাকালেন। তাদের কান্নায় বিচলিত না হয়ে তিনি নির্দেশ দিলেন, “যতো বড় চাকরিই হোক না কেন, সন্তানের জীবনের চেয়ে তা’ বড় নয়। আমি চাই তোমরা আজই তোমাদের জীবনকে নতুনভাবে পুনর্বিন্যাস করো। এখন থেকে তোমরা এ শিশুকে নিজেদের কোলের কাছেই রাখবে এবং তাকে সুচিকিৎসা আর অঢেল ভালোবাসা দিয়ে সারিয়ে তুলবে। টাকার অঙ্ক দিয়ে যারা সন্তানকে আড়াল করতে চায়, তারা যেন আজ এ ঘটনা থেকে শিক্ষা নেয়।” সুমন আর অঞ্জলি মাথা নিচু করে পন্ডিতজির প্রতিটি আদেশ অবনত মস্তকে গ্রহণ করলো। শহরের হাসপাতালের ধবধবে সাদা আর পরিষ্কার বিছানায় শুয়ে তুলি যখন ধীরে ধীরে তার ক্লান্ত চোখ দু’টি মেললো, তখন সে প্রথম দেখলো তার মা অঞ্জলি তার শিয়রে বসে গভীর মমতায় তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। সেই স্পর্শে কোনো ভয় ছিলো না, ছিলো না কোনো অমানবিক প্রহারের আতঙ্ক। শিশুটি তার অত্যন্ত দুর্বল আর ছোট্ট হাতটি বাড়িয়ে দিয়ে ধীরু পায়ে মায়ের একটি আঙুল শক্ত করে ধরলো, যেন সে নিশ্চিত হতে চাইছিলো এ কোনো স্বপ্ন নয়। হয়তো তার শরীরের গভীর আর বীভৎস ক্ষতগুলো সম্পূর্ণভাবে সারতে এখনো অনেক সময় লাগবে, হয়তো মনের ভেতরের সেই ভয়ঙ্কর স্মৃতিগুলো সহজে মুছে যাবে না, কিন্তু সে এখন অন্তত এটুকু নিশ্চিত যে তাকে আর অন্ধকারের সেই নির্জন নরকে এবং যমুনার নিষ্ঠুর হাতের তলায় ফিরে যেতে হবে না। তার চারপাশ এখন মা-বাবার ভালোবাসার ঘ্রাণে ভরে উঠেছে।

পন্ডিত রামদয়াল তখন মন্দিরের জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বিশাল নীল আকাশের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ভাবছিলেন। তিনি মনে মনে চিন্তা করলেন, জগৎটা যতোটাই জটিল আর কুটিল হোক না কেন, মানুষের ভেতরের ভালোবাসা আর সাহসের মধ্যদিয়ে প্রতিটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে রুখে দাঁড়াতে হবে। তিনি নিজের মনেই এক কঠিন প্রতিজ্ঞা করলেন, “আমি এ সব অসহায় আর নির্যাতিত শিশুদের অধিকারের জন্যে আজীবন লড়বো, যতোদিন না এ পচনশীল সমাজ তাদের জন্য এক নিরাপদ আর সুন্দর চারণভূমি হয়ে ওঠে।” তার দু’চোখে তখন এক দৃঢ় সংকল্পের আভা খেলা করছিলো। বিকেলের শান্ত আর হিমেল বাতাসে মন্দিরের চূড়ায় থাকা ঘণ্টাটি সজোরে বেজে উঠলো। সেই ঘণ্টার গম্ভীর আর পবিত্র ধ্বনি যেন এক নতুন ভোরের বার্তা দিচ্ছিলোÑএমন এক আগামীর বার্তা, যেখানে টাকার অঙ্কের চেয়ে মানুষের রক্ত-মাংসের শরীরের আর স্পন্দিত প্রাণের মূল্য অনেক বেশি হবে। চারদিকের স্তব্ধতা ভেঙে সেই শব্দ জানান দিচ্ছিলো যে, অন্ধকারের শেষে আলোর জয় অনিবার্য।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়