শনিবার, ৩০ আগস্ট, ২০২৫  |   ৩১ °সে
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ৩০ আগস্ট ২০২৫, ০৯:১৭

ধারাবাহিক উপন্যাস-৫

নিকুঞ্জ নিকেতন

রাজীব কুমার দাস
নিকুঞ্জ নিকেতন

সেদিন যদিও সারোয়ারের সাথে আমাদের তেমন একটা আলোচনা হয়নি কিন্তু পরবর্তী দিন থেকে আমাদের মাঝে একটা সম্পর্কের বীজ অঙ্কুরিত হয়েছিল। সে ছিল আমাদের চাহিদার চাইতেও বেশি কিছু। নিজেকে প্রাণোজ্বল রাখার জন্য আমাদের সর্বোচ্চটাও যেখানে নগণ্য ছিল সেখানে সারোয়ার আমাদের বেরসিক জীবনের উপকরণ হয়ে গেল। আমরা যতই মিশি তার সাথে আমাদের ভিতরের শূন্যতাগুলো এক এক করে উধাও হতে লাগল। দিন যায় মাস যায় আমরা ধীরে ধীরে তার প্রতি আসক্ত হয়ে গেলাম। এখানে সে এসেছিল তার সময়টুকু কাটাতে অথচ আমরা এখন তার অপেক্ষায় থাকি। একদিন না আসলে আমাদের অস্থির লাগে যেন আজকের শুরুটা ফিকে হয়ে গেছে। তার চঞ্চলতা, ভঙ্গিমা, অস্থিরতা যেন আমাদের আরও একধাপ গতিশীল করে দিয়েছে। প্রতিদিন সাড়ে ছয়টা থেকে আটটার সময়টুকু যেন সারাদিনের খোরাক ছিল। এভাবেই কেটে গেল বেশ কয়েক মাস তারপর সেই সময়টা তার জীবনে চলে এসেছে। আমার মনে আছে দিনটা ছিল বৃহস্পতিবার, সারোয়ারের শেষ অফিস। অবসরে গেলে কী করবে, কীভাবে কাটাবে প্রতিদিনই আড্ডায় এসে বর্ণনা দিয়ে যায় কিন্তু সেদিনের বিষয়টা ছিল ভিন্ন। সকাল পৌঁনে সাতটা আমরা বরাবরের মতোই অপেক্ষা করছি সারোয়ারের। সে এসেছে সাতটা পনেরো মিনিটের দিকে। আজ চাকচিক্য নেই, কোনো চঞ্চলতা নেই। কিছু একটা সে হারিয়ে ফেলছে এমন অনুভব তার চোখে-মুখে প্রকাশ পাচ্ছে। বিষয়টা আমাদের বুঝতে আর বাকি ছিল না। পঁচিশ বছরের যুবকের মতো মনটা যেন আজ বয়স্ক হয়ে গেল এক পলকে। সে চেষ্টা করছে বুঝতে না দিতে কিন্তু অনুভবটা কী আর লুকিয়ে রাখা যায়, সেটা চেহারায় স্পষ্ট ফুটে উঠেছে। চাকুরির শেষ দিনটা কাটিয়ে আসা খুবই বেদনার। সারা দিন মনের মধ্যে চেষ্টা থাকে সময় যেন খুব ধীর গতিতে যায় কিন্তু সময়কে কী আর বেঁধে রাখা যায়! সকালে অফিসে পাড়া দিলেই মনে হয় আজকের পর থেকে তো আমার আর কোনো কিছুই থাকছে না। মনে হয় অফিসের পিয়নটাও যেন কাল থেকে আমাকে চিনবে না। এত বছর একটা অধিকার, একটা বৈশিষ্ট্য নিয়ে কাজ করা এই আমি যেন কাল থেকে পুরোটাই শূন্য। তখন মন থেকে না চাইলেও কিছু প্রশ্নের জন্ম হয়। এই চেয়ার-টেবিল, এই রুমটা কী আর আমার নেই? অফিসের কলিগগুলো কী এখন আমাকে একজন প্রাক্তন হিসেবে গ্রহণ করবে? আমার চাকরিজীবি হয়ে থাকার গৌরব আর থাকল না? আমি তো এখন আর বেতনভুক্ত না, তাহলে...? কাল থেকে যখনই এই অফিসে আসব তখন কী তারা বিরক্ত বোধ করবে? ইত্যাদি ইত্যাদি নানা প্রশ্ন থাকবে আশপাশে আর উত্তরগুলো মনের কৃষ্ণ গহ্বরে হারিয়ে যায় যাকে খুঁজতে হবে সময় নিয়ে। সারোয়ার আর প্রাণোজ্বল ছিল না সেদিন। বুঝতে পারছিলাম অবসরকে ঘিরে তার মধ্যে একটা দ্বিধা, একটা শূন্যতা কাজ করছে। মুখে যতই বুলি ঝাড়ুক না কেন মন থেকে সেই দ্বিধা সে দূর করতে পারেনি। সকাল আটটার আগেই বিদায় নিল আর বলে গেল-শেষ অফিসটা আজ দেরি করে নিজের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ হতে চাই না। আমরাও তাকে বাঁধা দেইনি। ফিরে গিয়ে আবার এসে বলে গেলÑদাদা আজ আমার শেষ অফিস। আমরা মুচকি হেসে তাকে বিদায় জানাই। পরবর্তী দিন সে বরাবরই চলে আসে ভোরের আড্ডায় আমরা এবার নতুন করে স্বাগত জানাই। সেই চাঞ্চল্য মন আর অস্থিরতায় আমাদের দিনটা শুরু হলো। রাউন্ড শেষে যখন বেঞ্চিতে বসি তখন তাকে জিজ্ঞেস করি জীবনের শেষ কর্ম দিবসের কথা। একটু নীরব থেকে বলেÑ

‘ভালো...কাল যখন শেষ অফিস করলাম তখন কেমন যেন একটা ভয় কাজ করছিল দাদা। ভয়টা কীসের তা খুঁজে পাইনি, তবুও একটা ভয়। আমি যদিও অফিসে দেরি করে যাইনি কভু তারপরও মাঝে সাজে হয়ে যায় দশ পনেরো মিনিট এদিক-ওদিক কিন্তু সেদিন যথাসময়ে নয়টায় অফিসের চেয়ারে বসি। ‘শেষ ভালো যার সব ভালো তার’ এই বাক্যটাকে মেনে শেষটা ভালো করার চেষ্টা ছিল আমার। আমাকে ফেয়ারওয়েল দেওয়ার একটা আয়োজন চলছে এটা বুঝতে পারছিলাম। অফিসের পিয়নটা চমৎকার করে এককাপ চা এনে দিল। পেয়ালা হাতে নিতেই বুঝতে পারছি প্রতিদিনের চেয়ে আজ চা স্পেশাল করে বানিয়েছে অর্থাৎ সরকারি রং চায়ে একটু এলাচ মিশিয়ে সুস্বাদু করার চেষ্টা করেছে। গতানুগতিকের চেয়ে আজ ভালোবাসার পরিমাণ ছিল বেশি। আমাকে ঘিরে সকলের মধ্যে একটা দয়া ভাব লক্ষ্য করলাম। আজ শেষ কর্মদিবস তাই আমাকে কোনো প্রকার কাজের চাপ দেওয়া যাবে না। আমি যেন মনে কষ্ট না পাই সেদিকে সকলে খেয়াল রাখছে। অফিসের যে পিয়নকে বলেও কাজ করানো ছিল দায় সে আজ না চাইতেই আমার কাছে সবকিছু হাজির করছে। বিষয়টা এমন মনে হলো যেন আজ আমি অবসরে নই ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়াব। এমন সহানুভূতিক আচরণ পেয়েছিলাম চাকরি জীবনের শুরুতে নবাগত বলে আর আজ শেষ তাই একই অনুভব নিয়ে বিদায় নিলাম। শুরুটা যেমন ছিল শেষটাও তেমনই ছবি ফুটিয়ে তুলেছিল চোখের সামনে।’

‘তারপর?’

‘তারপর আর কী। এগারোটার দিকে আমাকে চার্জ বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য নথিপত্রের লিস্ট চাওয়া হলো। যদিও এ কাজগুলো আমি গত কয়েক দিনেই তৈরি করে রেখেছিলাম তারপরও শেষ একবার চোখ বুলিয়ে নিলাম। আমার জুনিয়রকে চার্জ বুঝিয়ে দেই অফিসিয়ালি। এভাবে সময় কেটে যায় প্রায় ঘণ্টা খানেক। সেদিন অফিসেই আমার বিদায় উপলক্ষে আয়োজন করায় টিফিন ক্যারিয়ারটা খোলার প্রয়োজন পড়েনি। সকলে মিলে আমাকে এক আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে বিদায় জানাল। দুপুরে সকলের সাথে লাঞ্চ করার সময় কেমন একটু অসহায় বোধ করলাম। ওরা যেন আমার কাছ থেকে আমার সত্ত্বাটাকে ছিনিয়ে নিচ্ছে যা আগলে রেখেছিলাম এত বছর। জানেন দাদা আমি একটা বাচ্চা শিশুর মতো এদিক-ওদিক তাকাচ্ছি কিন্তু মানিয়ে নেওয়াটা বেশ কষ্টকর।’

‘অবসর এটাকেই বলে ভাই। এজন্যই সেদিন বলেছিলাম অবসরের বিষয়টা আপনি চাকরি করছেন তাই বুঝেন না। যাইহোক আমাদের এখন আর বাসায় ফেরার তাড়া থাকছে না।’

বরাবরের মতোই দ্বিতীয় রাউন্ড শেষ করে এসে বেঞ্চিতে বসি আমরা। কিছুক্ষণ পর সারোয়ার অফিস আছে বলে বিদায় নেয়। বুঝতে পেরেও তাকে বাঁধা দেইনি। এত বছরের অভ্যেসগুলো তো আর অবসরে যায়নি সেটাকে অবসরে পাঠাতে আরও কিছু সময় লাগবে। এখন হয়তো বাসায় গিয়ে ঝটপট অফিসের জন্য তৈরি হবে। কেউ যদি কিছু না বলে তাহলে নাশতার পর্বটা শেষ করেই তড়িঘড়ি করে বেড়িয়ে পড়বে তারপর মনে পড়ে গেলে মুখ ভাড় করে ফিরে আসবে। আমার বেলায় শুরুতে এমনটা হয়েছিল বহুবার। সকালে প্যান্ট শার্ট পড়ে অফিসে গিয়ে যখন দেখি অন্য লোক বসা তখন হঠাৎ খেয়াল হয় আরে আমি তো অবসরে এখন। এটা চলবে কয়েক দিন বা দু এক মাস। তারপর ধীরে ধীরে মানিয়ে নেওয়া যাবে। এই মানিয়ে নেওয়াটা যত দ্রুত ঘটে ততই মঙ্গল কারণ অবসর গ্রহণের এই ধাক্কা অনেকে সইতে পারে না। আমার দেখা অনেক চাকরিজীবি আছে যারা অবসরের পর বেশ তাড়াতাড়িই অসুস্থ্য হয়ে যায় বা মৃত্যু ঘটে। যদিও আমরা প্রতিটি চাকরিজীবিই এটা বুঝিÑজন্ম হলে যেমন মৃত্যু অবধারিত তেমনি চাকরি হলে অবসর নিশ্চিত। সারোয়ারকে সেদিন বুঝতে পেরেছিলাম কারণ অবসরের স্বাদ আমরা গ্রহণ করেছিলাম বহু আগে আর এটা আমাদের জীবনধারারই একটা অধ্যায়। দু-চারদিন পর সারোয়ার সেই আগেরটা হয়ে গিয়েছিল। এখন বরাবরের মতোই আমাদের আড্ডা হয় আর ঘোরাফেরা হয় জমিয়ে। [পরের পর্ব আগামী সংখ্যায় ছাপা হবে]

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়