বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:০২

রবীন্দ্রনাথ-নজরুলের স্মৃতিকথনে ১২৭ বছর: স্বৈরাচারী বঞ্চনা কাটিয়ে বাবুরহাট বিদ্যাপীঠের সরকারি করণের অপ্রতিরোধ্য দাবি ‎

অধ্যাপক মোঃ জাকির হোসেন
রবীন্দ্রনাথ-নজরুলের স্মৃতিকথনে ১২৭ বছর: স্বৈরাচারী বঞ্চনা কাটিয়ে বাবুরহাট বিদ্যাপীঠের সরকারি করণের অপ্রতিরোধ্য দাবি ‎
ক্যাপশন: প্রাঙ্গণের মূল ফটক, ড্রোন ভিউতে সুবিশাল ক্যাম্পাস এবং খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে শিক্ষার্থীদের উজ্জ্বল উপস্থিতি—এক নজরে বাবুরহাট উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের সার্বিক দৃশ্যপট।

রবীন্দ্রনাথ-নজরুলের স্মৃতিকথনে ১২৭ বছর: স্বৈরাচারী বঞ্চনা কাটিয়ে বাবুরহাট বিদ্যাপীঠের সরকারি করণের অপ্রতিরোধ্য দাবি

রোটাঃ অধ্যাপক মো. জাকির হোসেন

পদ্মা, মেঘনা ও ডাকাতিয়া—এই তিন প্রমত্তা নদীর প্রাণবন্ত মিলনমোহনায় মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকা রূপসী চাঁদপুর কেবল তার নৈসর্গিক রূপেই মহিমান্বিত নয়; তার ইতিহাস সমাদৃত হয়েছে রাজনৈতিক সংগ্রাম, প্রজ্ঞাপূর্ণ বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা এবং শিক্ষার সুদীর্ঘ ঐতিহ্যে। চাঁদপুর জেলার শিক্ষার মানচিত্র অনুধাবন করলে যে কয়টি প্রতিষ্ঠান শতবর্ষের গণ্ডি পেরিয়ে আজও সমান প্রদীপ্ত দীপ্তিতে জ্ঞানালোক বিতরণ করে চলেছে, তাদের শীর্ষে সগৌরবে জ্বলজ্বল করছে 'বাবুরহাট উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ'। ১৮৯৯ সালে চাঁদপুর সদর উপজেলার অবহেলিত জনপদে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়া এবং শিক্ষার্থীদের প্রবুদ্ধ দেশপ্রেমিক ও সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার অঙ্গীকার নিয়ে যে প্রতিষ্ঠানটির শুভ সূচনা হয়েছিল, তা আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে ১২৭ বছরের এক সমৃদ্ধ ও প্রদীপ্ত ইতিহাস বহন করছে।

এই বিদ্যাপীঠের ইতিহাস কেবল ইট-সুরকির দেয়ালের ইতিহাস নয়, এটি সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চার এক অনন্য ও অমূল্য নথি। ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই প্রতিষ্ঠানের তৎকালীন প্রধান শিক্ষকের সাথে চিঠিপত্রের মাধ্যমে নিয়মিত প্রাতিষ্ঠানিক ও সাহিত্যিক খোঁজখবর রাখতেন। শুধু রবীন্দ্রনাথই নন, আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সাথেও বিদ্যাপীঠটির তৎকাল প্রধানদের নিবিড় ও গভীর পত্রমিতালি ছিল। ফলে সূচনালগ্ন থেকেই এটি কেবল একটি স্থানীয় বিদ্যালয়ে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং সমগ্র প্রাচ্যের আলোকবর্তিকা হয়ে বৃহত্তর অঞ্চলের জ্ঞানচর্চার প্রধান বাতিঘর হিসেবে রূপ লাভ করেছিল।

একটি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে পূর্ণাঙ্গভাবে সরকারি করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় কাঠামোগত যেসকল কঠোর মানদণ্ড ও সক্ষমতা নির্ধারিত রয়েছে, তার প্রতিটি মাপকাঠিতেই বাবুরহাট উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ এক অনন্য ও আদর্শ মানদণ্ড স্থাপন করে।

১. নিষ্কণ্টক ভূসম্পত্তি ও আধুনিক অবকাঠামোগত প্রাচুর্য:
চাঁদপুর শহরের অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যখন ভূমির তীব্র সংকটে সংকুচিত ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে তোড়জোড়ে ব্যস্ত, সেখানে এই বিদ্যাপীঠটি সগর্বে দাঁড়িয়ে আছে ৭.৮৩ একরের (প্রায় ২৪ বিঘা) এক সুবিশাল ও নিষ্কণ্টক ভূসম্পত্তির ওপর। সুবিশাল খেলার মাঠ, দুটি নান্দনিক ও মনোরম পুকুর, স্কুল ও কলেজের পৃথক বহুতল আধুনিক ভবন, সমৃদ্ধ বিজ্ঞানাগার এবং তথ্যপ্রযুক্তির শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব প্রতিষ্ঠানটিকে এক স্বয়ংসম্পূর্ণ বিদ্যাপীঠের অবয়ব দিয়েছে। সদর উপজেলার প্রাণকেন্দ্রে চমৎকার যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে দূর-দূরান্তের সাধারণ ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের প্রায় ২,৮০০ শিক্ষার্থী (স্কুলে ১,৬০০ এবং কলেজে ১,২০০ জন) এখানে পড়াশোনার সুবর্ণ সুযোগ পাচ্ছে।

২. দূরদর্শী শিক্ষানীতি ও সমন্বিত প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তর:
এই প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম কৌশলগত শক্তিমত্তা হলো, এটি কেবল নিম্ন-মাধ্যমিক বা মাধ্যমিকের গণ্ডিতে থমকে থাকেনি। নব্বইয়ের দশকে তৎকালীন বিএনপি সরকারের দূরদর্শী শিক্ষানীতি ও শিক্ষা সম্প্রসারণের সুনির্দিষ্ট কাঠামোর আলোকেই প্রতিষ্ঠানটি বিদ্যালয় থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে উন্নীত হওয়ার ঐতিহাসিক সুযোগ লাভ করে। ১৯৯৫ সালে সমন্বিত কলেজ শাখা চালু এবং ১৯৯৬ সালে তা এমপিওভুক্তির মাধ্যমে এটি অঞ্চলে একীভূত ও নিরবচ্ছিন্ন সমন্বিত শিক্ষার এক সুদৃঢ় ভিত্তি স্থাপন করে। ফলে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে শুরু করে একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের একই প্রাতিষ্ঠানিক ছায়াতলে সাশ্রয়ী খরচে অধ্যয়নের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

৩. রাষ্ট্রীয় তহবিলের অপচয় রোধ ও কৌশলগত সাশ্রয়:
বর্তমানে সরকারি কোষাগারের ওপর অতিরিক্ত চাপ না ফেলে কীভাবে সর্বাধিক নাগরিক সুবিধা সুনিশ্চিত করা যায়, তা রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণের মূল বিবেচ্য হওয়া উচিত। সেই নিরিখে বাবুরহাট উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজকে সরকারি করা সরকারের জন্য একটি অত্যন্ত বিচক্ষণ ও সাশ্রয়ী সিদ্ধান্ত। প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ মো. মোশারেফ হোসেন অত্যন্ত প্রাজ্ঞভাবেই উল্লেখ করেছেন, “দেশে যদি ১০টি প্রতিষ্ঠানও সরকারি করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তবে বাবুরহাট উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ তার মধ্যে শীর্ষস্থানে থাকার দাবি রাখে। আমাদের বিপুল জমি, উন্নত অবকাঠামো ও নিজস্ব আর্থিক স্বাবলম্বিতা রয়েছে।” এটি সরকারি করা হলে চাঁদপুর সদরে পৃথকভাবে নতুন সরকারি কলেজ স্থাপনের সুবিশাল ভূমি অধিগ্রহণ, অবকাঠামো নির্মাণ ও নতুন সেটআপের শত কোটি টাকার রাষ্ট্রীয় অপচয় ও দায়বদ্ধতা থেকে সরকার নিষ্কৃতি পাবে। অর্থাৎ, সীমিত রাষ্ট্রীয় সম্পদের শতভাগ দক্ষ ব্যবহারের এটি এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

৪. সাফল্যগাথা ফলাফল ও প্রখ্যাত প্রাক্তন শিক্ষার্থী:
কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক উভয় পরীক্ষায় প্রতিষ্ঠানটি ধারাবাহিকভাবে ঈর্ষণীয় পাসের হার এবং জিপিএ-৫ অর্জনে জেলায় শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রেখেছে। প্রতিবছরই এখানকার শিক্ষার্থীরা বুয়েট, মেডিকেল কলেজ ও দেশের শীর্ষ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মেধার স্বাক্ষর রাখছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চাঁদপুরের গৌরব বৃদ্ধি করা বহু প্রখ্যাত ব্যক্তিত্বের হাতেখড়ি হয়েছে এই আঙ্গিনায়। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন ড্যাফোডিল গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির প্রতিষ্ঠাতা ড. সবুর খান এবং ক্যানসার শনাক্তকরণ গবেষণায় বিশ্বমঞ্চে প্রশংসিত আন্তর্জাতিক গবেষক ড. আবু আলী ইবনে সিনহা।

৫. স্বৈরাচারী বঞ্চনার অবসান ও দাপ্তরিক আশার আলো:
১২৭ বছরের সুদীর্ঘ যাত্রায় শত শত রত্ন উপহার দিলেও বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে চরম রাজনৈতিক অশুভ শক্তির শিকার হতে হয়েছে এই ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানটিকে। সরকারীকরণের সকল শর্ত শতভাগ পূরণ করা সত্ত্বেও তৎকালীন স্থানীয় নীতিনির্ধারকদের অশুভ স্বৈরাচারী সিদ্ধান্ত, ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ ও দলীয় সংকীর্ণতার বলয়ে বন্দি করে রাখা হয় একে। এর ফলে সরকারি করার সংক্রান্ত দাপ্তরিক ফাইল বারবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের লাল ফিতার দৌরাত্ম্যে থমকে দেওয়া হয়েছে। তবে বিগত দিনের স্বৈরাচারী বঞ্চনার অবসান ঘটিয়ে সম্প্রতি ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) সহকারী পরিচালক-২ বরাবর বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সকল তথ্যাদি প্রেরণ করা হয়েছে এবং জেলা শিক্ষা অফিস থেকেও ইতিবাচক প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ রুহুল্লাহর এই ইতিবাচক পদক্ষেপে চাঁদপুরবাসীর মনে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে।

উপসংহার:
রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের পদচারণা ও স্মৃতিধন্য, সোয়া শতাব্দীর ঐতিহ্যবাহী এবং ২,৮০০ উদীয়মান শিক্ষার্থীর পদচারণায় মুখরিত এই বিদ্যাপীঠটিকে সরকারি ঘোষণা করা এখন কেবল সময়ের দাবিই নয়, বরং ঐতিহাসিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার এক অপরিহার্য তাগিদ। এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ, সুধী সমাজ এবং প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকমণ্ডলীর বক্তব্যেও স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে—এটি সরকারি করা হলে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবে এই অঞ্চলের শ্রমজীবী, নিম্নমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানেরা। বিগত দিনের রাজনৈতিক বৈষম্যের চিরঅবসান ঘটিয়ে এবং রাষ্ট্রীয় তহবিলের সর্বোচ্চ সাশ্রয়ী ব্যবহারের স্বার্থে অবিলম্বে বাবুরহাট উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজকে সরকারি করা হোক—এটিই চাঁদপুরবাসীর এক অখণ্ড ও প্রাণের দাবি।

লেখক:
রোটাঃ অধ্যাপক মো. জাকির হোসেন
প্রাক্তন শিক্ষক (অবসরপ্রাপ্ত), বাবুরহাট উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ
সিনিয়র সাব-এডিটর ও কলামিস্ট, দৈনিক চাঁদপুর কণ্ঠ।

রোটাঃ অধ্যাপক মো. জাকির হোসেন

রোটাঃ অধ্যাপক মো. জাকির হোসেন

ডিসিকে /এমজেডএইচ

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়