বুধবার, ১৫ এপ্রিল, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ১৬:৫১

আমাদের বৈশাখ

সাইদা আক্তার
আমাদের বৈশাখ

‘বৈশাখ’ বাংলা বছরের প্রথম মাস। আমি বৈশাখ চিনতে শিখেছি আমার শৈশবে, আমার নানার বাড়িতেÑগ্রামের একদম আদিমতা নিয়ে। তখন মানুষের জীবনের রং, রূপ, গন্ধ, ভালোবাসা, প্রাণের উচ্ছ্বাস নিয়ে প্রকাশিত হতো। বৈশাখ মানেই তখন আড়ম্বরহীন গ্রামের এক আড়ম্বরপূর্ণ, বিশাল প্রাণের স্পন্দন।

জীবন তখন হ্যারিকেন আর চাঁদের আলোয় উদ্ভাসিত। আহা! কী সব দিন। চৈত্রের কাঠফাটা রোদের পর বৈশাখের প্রথম দিন মানেই ছিল উত্তর-পূর্ব কোণ অন্ধকার করে প্রচণ্ড দাপুটে বাতাস নিয়ে প্রবল ঝড়ো মেঘ। কখনো কখনো তা শিলাবৃষ্টিতে পরিণত হতো। দীর্ঘ অনাবৃষ্টির ফলে মাটি চৌচির হয়ে যেত। সে মাটিতে বৃষ্টির পানি এক অভাবনীয় রূপ নিয়ে ঝরে পড়ত। মাটি থেকে তখন অদ্ভুত এক সোঁদা গন্ধ চারপাশে ছড়িয়ে পড়ত।

বৈশাখ মানেই বৈশাখী মেলা। মানুষের মাঝে তখন এত মতবিরোধ ছিল না। ছোট ছোট অনেকগুলো গ্রামের বৈশাখী মেলা হতো গ্রামের বড় হাইস্কুলের মাঠে। আশপাশের সব গ্রামের ছোট-বড়, ছেলে-বুড়োÑসব মানুষের ঢল নামত মেলায়। নানান রঙের ছোঁয়ায় সেই মেলা কী যে অদ্ভুত রকম সুন্দর হয়ে ধরা দিত! মেয়েরা সারাবছর মাটির ব্যাংকে টাকা জমাত এই মেলা থেকে বাহারি চুড়ি, ফিতা, কানের দুল, গলার মালা কেনার জন্য।

কী পাওয়া যেত না সেই মেলায়? মাটির সব ধরনের জিনিস, বাঁশি, বেতের ঝুড়ি, কুলা, পাটি, বাতাসা, মুরকি, গরম ভাজা জিলাপি, বেলুনের ঝাঁক, নানান রঙের প্লাস্টিকের হাতপাখা, খেলনাÑসবই ছিল। কাঠের তৈরি জিনিস, কাঁচের চুড়ির বিশাল আয়োজন। বাঁশির শব্দে চারপাশ আলোড়িত হয়ে উঠত। বহু দূর থেকে শোনা যেত বাঁশি আর মানুষের কলরব।

মেলা শুরু হতো দুপুরের পর থেকেই। বেলা বাড়তে বাড়তে সে মেলা হয়ে উঠত বিশাল মানুষের মিলনমেলায়। রঙের বাহারি ধাঁধায় চোখ জুড়িয়ে যেত। নানা ধরনের খাবারের গন্ধে জিভে জল আসত। বিকেল শুরু হতেই আকাশ কালো হতে থাকত। দোকানিরা দোকান গুটাতে শুরু করত। মেলায় আসা মানুষের মাঝে তাড়াতাড়ি শখের জিনিস বাকি আছে কি নাÑতার হিসাব মেলানোর তাড়া দেখা দিত। বাতাস ঘন হয়ে আসতে শুরু করতেই মানুষের ঘরে ফেরার সময় এগিয়ে আসত। বড়রা ছোটদের কোলে তুলে পা চালিয়ে এগিয়ে যেত, যাতে নির্বিঘ্নে ঘরে ফেরা যায়।

তথাকথিত আধুনিকতার আয়োজনে জীবন আরামদায়ক হয়েছে ঠিকই, কিন্তু হারিয়েছে নিজস্বতার আলো আর ভালোবাসা। এত এত আয়োজনে সেই গ্রামের বছরজুড়ে অপেক্ষায় থাকা বৈশাখের মেলার আজন্ম লালিত ঘ্রাণ কতটুকুই পাওয়া যায়Ñজানি না।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়