প্রকাশ : ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২০:৩৪
শোকের সাগরে ভাসল বলাখাল: সহকর্মীর লাশের সামনে অধ্যক্ষের অটল অভিভাবকত্ব

বলাখাল জেএন উচ্চ বিদ্যালয় এন্ড কারিগরি কলেজ মাঠের ঘাসগুলো আজ হয়তো ভিজে আছে কোনো বৃষ্টির জলে নয়, বরং হাজারো শিক্ষার্থীর চোখের জলে। ভিডিওর সেই দৃশ্যপটটি যারা দেখেছেন, তারা মুহূর্তের জন্য হলেও থমকে দাঁড়িয়েছেন। একজন মানুষ, একজন সাধারণ শিক্ষক—কী অসামান্য ভালোবাসা আর শ্রদ্ধা অর্জন করলে বিদায়বেলায় পুরো এলাকা এভাবে স্তব্ধ হয়ে যেতে পারে!
|আরো খবর
২০১৪ সাল থেকে ব্রেইন ক্যান্সারের মতো এক মরণব্যাধিকে সঙ্গী করে পথ চলছিলেন খোকন মজুমদার স্যার। দীর্ঘ ১৪টি বছর তিনি কেবল যন্ত্রণার সাথেই লড়েননি, লড়েছেন অগণিত শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য। অসুস্থ শরীরে যখন তিনি ক্লাসে আসতেন, তখন তাঁর কণ্ঠস্বরে ক্লান্তির চেয়ে বেশি থাকত সন্তানদের সুশিক্ষিত করার আকুতি। ভিডিওতে তাঁর জানাজার সেই জনসমুদ্রই বলে দেয়, তিনি ক্যান্সারের কাছে হারেননি; বরং ভালোবাসা দিয়ে মৃত্যুকেও জয় করেছেন।
জানাজার দৃশ্যে যখন দেখা যায় কাতারের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমেরিকান স্কলারশিপ নিয়ে ফেরা মেধাবী পুত্র বাবার লাশের শিয়রে দাঁড়িয়ে ডুকরে কাঁদছে, তখন উপস্থিত হাজারো মানুষের বুক ফেটে হাহাকার আসছিল। একজন পিতার এর চেয়ে বড় সার্থকতা আর কী হতে পারে? তিনি এমন এক সন্তান রেখে গেছেন, যিনি বিশ্বমঞ্চে নিজের যোগ্যতার প্রমাণ দিচ্ছেন। সেই অশ্রুসিক্ত মুখটি ছিল একাধারে শোকের এবং সার্থকতার এক প্রতিচ্ছবি।
ভিডিওর একটি দৃশ্যে দেখা যাচ্ছিল, বয়োবৃদ্ধ থেকে শুরু করে বর্তমানের ছোট্ট শিক্ষার্থী—সবাই ভিড় ঠেলে একবার স্যারের কফিনটি ছুঁতে চাচ্ছেন। এই দৃশ্যটি আমাদের সমাজের জন্য এক বড় বার্তা। আমরা প্রায়ই বলি নৈতিকতার অবক্ষয় হয়েছে, কিন্তু খোকন মজুমদার স্যারের বিদায়বেলা প্রমাণ করে দিল—একজন শিক্ষক যদি সত্যিই অভিভাবক হয়ে উঠতে পারেন, তবে আজও মানুষ তাকে দেবতার মতো শ্রদ্ধা করে।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) থেকে শুরু করে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ—সবার শোকবার্তায় একটি শব্দ বারবার ফিরে এসেছে, তা হলো 'অভিভাবক'। খোকন মজুমদার স্যার কেবল বইয়ের পাতা পড়াতেন না, তিনি জীবনবোধ শেখাতেন। আজ তিনি না ফেরার দেশে চলে গেছেন ঠিকই, কিন্তু বলাখাল কলেজের করিডোরে, শ্রেণিকক্ষে কিংবা হাজারো শিক্ষার্থীর হৃদয়ে তাঁর স্মৃতি থেকে যাবে চির অমলিন।
বিদায় হে গুণী শিক্ষক! আপনার এই প্রস্থান আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষের আসল পরিচয় তার কর্মে, বিত্তে নয়। হাজারো মানুষের এই যে চোখের পানি আর দোয়া—এটাই আপনার জীবনের পরম পাওয়া, এটাই আপনার শ্রেষ্ঠ পুরস্কার। আপনি বেঁচে থাকবেন আপনার সৃষ্টিতে, আপনার শিক্ষার্থীদের সাফল্যে।
ডিসিকে/এমজেডএইচ








