প্রকাশ : ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২০:১২
চাঁদপুর কণ্ঠে সংবাদ প্রকাশের জের
ইউএনওর মানবিকতায় স্বাবলম্বী হলেন একপায়ে লড়াই করা আবু তাহের

একটি পা নেই। নেই জমিজমা, নেই স্থায়ী আয়ের উৎস। শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে সঙ্গী করেই অটোবাইক চালিয়ে স্ত্রীকে নিয়ে সংসার চালাচ্ছিলেন মো. আবু তাহের। কিন্তু জীবিকার সেই অটোবাইকটিও হারিয়ে কর্মহীন হয়ে পড়েন তিনি। স্ত্রী জেসমিন বেগমকে নিয়ে চরম অভাব-অনটনে দিন কাটছিল তার। আবু তাহেরের এই জীবনসংগ্রামের কথা তুলে ধরে দৈনিক চাঁদপুর কণ্ঠে সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পর বিষয়টি নজরে আসে ফরিদগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সেটু কুমার বড়ুয়ার। অসহায় এই মানুষটির পাশে দাঁড়াতে তাৎক্ষণিক উদ্যোগ নেন তিনি। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আবু তাহেরকে দেওয়া হয় একটি অটোবাইক।
|আরো খবর
রোববার (২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬) বিকেলে আবু তাহেরের হাতে অটোবাইকের চাবি ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তুলে দেন উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা। এ সময় উপস্থিত ছিলেন ফরিদগঞ্জ উপজেলা একাডেমিক সুপারভাইজার আবদুল্লাহ আল মামুন। অটোবাইকের চাবি হাতে পেয়ে আবু তাহেরের চোখেমুখে ফুটে ওঠে স্বস্তি ও নতুন করে বাঁচার প্রত্যয়। কারণ তিনি কারও কাছে ভিক্ষা চাননি, চাননি নিয়মিত সাহায্যের ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকতে। তার চাওয়া ছিলো শুধু একটি কাজের সুযোগ—যাতে নিজের শ্রমে উপার্জন করে স্ত্রীকে নিয়ে সংসার চালাতে পারেন।
প্রায় ছয় বছর আগে সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হন আবু তাহের। জীবন বাঁচাতে তার একটি পা কেটে ফেলতে হয়। দুর্ঘটনার আগে তিনি ছিলেন কর্মঠ মানুষ। যে কাজ পেয়েছেন, সেটিই করেছেন। নিজের উপার্জনে স্ত্রী, দুই মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে সংসার চালিয়েছেন। দুর্ঘটনার পর বদলে যায় তার জীবন। শারীরিক সক্ষমতা হারানোর পাশাপাশি একমাত্র ছেলেকেও হারান তিনি। দুর্ঘটনার পর ছেলে তাকে ছেড়ে নিখোঁজ হয়ে যায়। তবুও ভেঙে পড়েননি আবু তাহের। জীবিকার তাগিয়ে একসময় অটোবাইক চালানো শুরু করেন। এক পা না থাকলেও বিশেষ কৌশলে গাড়ি চালিয়ে যে আয় হতো, তা দিয়ে কোনোভাবে সংসার চলতো। কিন্তু পরবর্তীতে সেই অটোবাইকের মালিক নিজেই গাড়িটি চালানো শুরু করায় কর্মহীন হয়ে পড়েন তিনি।
আবু তাহেরের স্ত্রী জেসমিন বেগমও অসুস্থ। দুই মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। তাদের স্বামীরাও দরিদ্র হওয়ায় মেয়েদের কাছ থেকে নিয়মিত সহযোগিতা পাওয়ার সুযোগ নেই। ফলে প্রতিবেশীদের দেওয়া খাদ্যসামগ্রী ও সামান্য সহযোগিতার ওপর নির্ভর করেই দিন কাটছিল তাদের। জেসমিন বেগম বলেছিলেন, "জমিজমা কিছুই নেই। মেয়েদের বিয়ে দিয়েছি, তাদের স্বামীরাও গরিব। প্রতিবেশীরা যা দেয়, তাই খেয়ে না খেয়ে বেঁচে আছি। আমিও অসুস্থ। তবে আমার স্বামী অটোবাইক চালাতে পারে। কেউ যদি একটি অটোবাইক দিয়ে সহযোগিতা করেন, তাহলে আমরা নিজেরাই উপার্জন করে চলতে পারব।" তার সেই আকুতি পৌঁছে যায় উপজেলা প্রশাসনের কাছে। আর সেই আকুতির জবাব এসেছে একটি অটোবাইক হয়ে।
আবু তাহের বলেন, "একটি অটোবাইক পেলে আমি আবার কাজ করতে পারবো। নিজের আয় দিয়ে সংসার চালাতে চাই। কারও কাছে হাত পাততে চাই না।"
উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অটোবাইক পাওয়ার পর তার সেই স্বপ্ন এখন বাস্তব হওয়ার পথে। অটোবাইকটি চালিয়ে আবারও নিজের উপার্জনের পথ তৈরি করতে পারবেন তিনি। একই সঙ্গে স্ত্রী জেসমিনের চিকিৎসা ও সংসারের নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ মেটানোর সুযোগও তৈরি হবে।
আবু তাহেরের হাতে অটোবাইক তুলে দেওয়ার ঘটনাটি ফরিদগঞ্জ উপজেলা প্রশাসনের মানবিক উদ্যোগের আলোচনাকেও সামনে এনেছে। এর আগে উপজেলার বড়ালী গ্রামের ছয় শারীরিক প্রতিবন্ধী ভাই-বোনের মানবেতর জীবনযাপনের বিষয়টি সামনে এলে তাদের পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগ নেয় উপজেলা প্রশাসন। জরাজীর্ণ ঘরের পরিবর্তে তাদের জন্য পাকা ঘর নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এছাড়া প্রান্তিক পেশাজীবীদের দক্ষতা ও আত্মকর্মসংস্থানের জন্য প্রশিক্ষণ, ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম, পৌর এলাকার সড়কবাতি স্থাপনসহ জনকল্যাণমূলক বিভিন্ন উদ্যোগেও উপজেলা প্রশাসনের সক্রিয় ভূমিকা রয়েছে।
তবে আবু তাহেরের ক্ষেত্রে উদ্যোগটির বিশেষত্ব হলো—তাকে শুধু সাময়িক সহায়তা করা হয়নি, বরং নিজের শ্রমে উপার্জন করে স্বাবলম্বী হওয়ার একটি স্থায়ী সুযোগ তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। আবু তাহেরের হাতে তুলে দেওয়া অটোবাইকের চাবিটি নিছক একটি গাড়ির চাবি নয়; এটি তাঁর কাছে আত্মমর্যাদা ফিরে পাওয়ার চাবি, কর্মসংস্থানের চাবি, স্ত্রীকে নিয়ে নতুন করে বাঁচার চাবি।
দুর্ঘটনায় একটি পা হারিয়েছেন আবু তাহের। হারিয়েছেন একমাত্র ছেলেকেও। হারিয়েছেন জীবিকার পুরোনো অবলম্বন। কিন্তু হারাননি কাজ করে বাঁচার ইচ্ছা। দৈনিক চাঁদপুর কণ্ঠে তার জীবনসংগ্রামের সংবাদ প্রকাশের পর সেই সংবাদ নজরে আসে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার। আর ইউএনওর উদ্যোগে এবার তার হাতে এসেছে অটোবাইক। সংবাদ থেকে সমাধান—আবু তাহেরের জীবনের এই পরিবর্তন যেন তারই এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এখন ঘুরবে অটোবাইকের চাকা, আর সেই চাকার সঙ্গে ঘুরবে আবু তাহের-জেসমিনের সংসারের চাকা। ভিক্ষা নয়, শ্রমে বাঁচতে চাওয়া এক মানুষের হাতে অটোবাইকের চাবি তুলে দিয়ে নতুন করে স্বপ্ন দেখার সুযোগ করে দিল ফরিদগঞ্জ উপজেলা প্রশাসন।
---







