প্রকাশ : ১০ মার্চ ২০২৬, ০০:৪৩
৪৪ বছর ধরে আর্তমানবতার সেবা
মসজিদ-ই-গাউসুল আজম ও গোর-এ-গরিবা কমপ্লেক্স

চাঁদপুর শহরের বাসস্ট্যান্ড এলাকা—যেখানে যান্ত্রিক কোলাহল আর জীবনের নিরন্তর ছুটে চলা একাকার হয়ে মিশে আছে। কিন্তু এই কর্মচঞ্চল রাজপথের একদম পাশেই এক আশ্চর্য আধ্যাত্মিক গাম্ভীর্য নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ‘মসজিদ-ই-গাউসুল আজম ও গোর-এ-গরিবা কমপ্লেক্স’। এটি কেবল একটি ধর্মীয় স্থাপত্য নয়, বরং গত ৪৪ বছর ধরে এটি চাঁদপুরের সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং আর্তমানবতার এক সুউচ্চ মিনার হিসেবে দেদীপ্যমান।
এই মানবিক কর্মযজ্ঞের সূচনালগ্নে যে ক'জন ক্ষণজন্মা মানুষের নাম ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে, তাঁদের মধ্যে অন্যতম চাঁদপুরের তৎকালীন পৌর চেয়ারম্যান ও জননেতা মরহুম আব্দুল করিম পাটোয়ারী। তিনি কেবল এই প্রতিষ্ঠানের অন্যতম প্রধান পৃষ্ঠপোষকই ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন গোর-এ-গরিবা’র অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং পরিচালনা কমিটির সফল সহ-সভাপতি। ১৯৮২ সালের সেই কঠিন সময়ে তাঁর প্রশাসনিক প্রজ্ঞা ও বলিষ্ঠ নেতৃত্বে এই প্রতিষ্ঠানটি একটি স্থায়ী রূপ লাভ করে। প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মরহুম আলহাজ্ব মিজানুর রহমান খানের সাথে সহ-সভাপতি হিসেবে আব্দুল করিম পাটোয়ারীর এই যুগলবন্দী প্রচেষ্টাই আজকের এই মহীরুহের মূল ভিত্তি।
এই কমপ্লেক্সের সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী ও সংবেদনশীল অংশটি হলো এর কোল ঘেঁষে থাকা প্রশান্ত-সুনিবিড় গোরস্থান। মুমিন হৃদয়ে বহুকাল ধরে লালিত সেই চিরন্তন বাসনা—“মসজিদের পাশে আমার কবর দিও ভাই, যেন গোর আজাবে মুয়াজ্জিনের আজান শুনতে পাই”—চাঁদপুরের এই পুণ্যভূমি যেন সেই আধ্যাত্মিক আকুতিরই এক মূর্ত প্রতিচ্ছবি। প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত আজানের সুমধুর ধ্বনি আর অগণিত মুসল্লির পবিত্র পদচারণায় মুখরিত এই প্রাঙ্গণ। এখানে চিরনিদ্রায় শায়িত প্রতিটি আত্মা যেন মসজিদের মিনার থেকে ভেসে আসা ঐশ্বরিক বাণীর এক অদৃশ্য শীতলতা অনুভব করে। মসজিদের দেয়াল ঘেঁষে কবরের এই অবস্থান জাগতিক জীবন ও পরপারের মাঝে এক অপার্থিব সেতুবন্ধন তৈরি করে রেখেছে।
শহরের ব্যস্ততম এলাকায় অবস্থিত এই সমাধিস্থলটি মূলত বৈষম্যহীন এক মানবিক সমাজ এর শেষ প্রতিচ্ছবি। এখানে বিত্তবান আর বিত্তহীনের মাঝে কোনো কৃত্রিম দেয়াল নেই; নেই কোনো পাথুরে আভিজাত্য বা দালানকোঠার লড়াই। সারিবদ্ধ প্রতিটি কবরের ওপর জেগে থাকা সবুজ ঘাস আর নিস্তব্ধতা এখানে প্রতিটি দর্শনার্থীকে পার্থিব নশ্বরতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। এই প্রাঙ্গণের ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত সুসংহত—সাধারণ মানুষের পারিবারিক কবর থেকে শুরু করে পরম মমতায় সংরক্ষিত বেওয়ারিশ লাশ এর জন্যে নির্দিষ্ট স্থান—সবই এক কঠোর ও ন্যায়নিষ্ঠ নীতিমালার অধীন। চারপাশের সুউচ্চ প্রাচীর, পরিকল্পিত বৃক্ষরাজি এবং নৈশকালীন আলোকসজ্জা এই প্রাঙ্গণকে এক স্বর্গীয় গাম্ভীর্য দান করেছে, যা প্রিয়জন হারানো শোকাতুর হৃদয়ে এক অনাবিল আধ্যাত্মিক প্রশান্তি ও সান্ত্বনা জোগায়।
বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা অনেক বেশি সুসংহত ও স্বচ্ছ। বর্তমান সভাপতি আলহাজ্ব মো. আবদুর রশিদ খান এবং সাধারণ সম্পাদক আলহাজ্ব মো. আলমগীর হোসেন টিপুর যোগ্য নেতৃত্বে কমপ্লেক্সটি এখন এক আধুনিক কাঠামোয় পরিচালিত। চব্বিশ ঘণ্টার অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস, মৃতদেহের ধর্মীয় তরিকায় গোসলের সুব্যবস্থা এবং হাফেজিয়া মাদরাসার তদারকি—সবই বর্তমান কমিটির নিরলস প্রচেষ্টার ফসল। সাধারণ মানুষের অকৃত্রিম দান আর কমিটির নিখুঁত জবাবদিহিতাই এই আস্থার মূল চাবিকাঠি। ১৯৮২ সালে প্রতিষ্ঠাতা ও সহ-সভাপতি মরহুম আব্দুল করিম পাটোয়ারী এবং প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মরহুম মিজানুর রহমান খানের হাত ধরে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা আজ ৪৪ বছর পেরিয়ে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে। চাঁদপুরের এই গোর-এ-গরিবা আমাদের এই শাশ্বত সত্যই মনে করিয়ে দেয় যে—মানুষের সেবা করাই পরম ইবাদত। আব্দুল করিম পাটোয়ারী ও মিজানুর রহমান খানের প্রবর্তিত সেই সেবার ধারা আজ চাঁদপুরের ললাটে এক গৌরবের তিলক হয়ে দাঁড়িয়েছে।








