প্রকাশ : ২১ জুলাই ২০২৬, ১২:৩৯
মার্টিনেজের দেয়াল গুঁড়িয়ে স্পেন চ্যাম্পিয়ন

বহুল কাঙ্ক্ষিত ফিফা ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনাল হয়ে গেলো ঊনিশ জুলাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মেটা স্টেডিয়ামে। নিজের জন্যে শঙ্কা ছিলো ঘুম জয় করতে পারবো কিনা। কিন্তু বাবার মতো অদম্য ফুটবলপ্রেমী প্রখরের সাহচর্যে সে বৈতরণী উৎরে গেলাম সোফায় চিৎকাৎ হয়ে মাঝে মাঝে বসার ভঙ্গি পরিবর্তন করে। রাত এগারোটায় তড়িঘড়ি করে বাসায় ঢুকে বসে গেলাম টিভির সামনে বসার কক্ষকে পিতা-পুত্রের গ্যালারি বানিয়ে। আর্জেন্টাইন সমর্থকদের চাপান-উতোরে উষ্ণ হয়ে ওঠা বাংলাদেশের আবহাওয়ায় মনে করেছিলাম একটা সেরা ফাইনাল হবে বিশ্বকাপের ইতিহাসে, যা দীর্ঘকাল হৃদয়ের মণিকোঠায় গেঁথে থাকবে। কিন্তু সে আশায় গুড়েবালি। বলে না, অতি আশা কাকের বাসা! আমাদেরও হয়েছে তা-ই। অতি আশা নিয়ে বসেছিলাম জমজমাট ফাইনাল দেখবো। যেহেতু বাংলাদেশ টুর্নামেন্টে নেই এবং আমার প্রিয় দলও নেই, তাই সম্পূর্ণ নির্মোহ ও নিরপেক্ষ মন নিয়ে খেলা উপভোগে বসেছিলাম। কিন্তু ফাইনালে দেখলাম, মাঠে দল ছিলো একটা আর তা হলো স্পেন। তার বিপরীতে মাঠে ছিলো মাত্র একজন। তিনি হলেন প্রতিপক্ষের গোলবার সামলানো গোলকিপার এমিলিয়েনো মার্টিনেজ, যিনি গত দুহাজার বাইশের বিশ্বকাপে সেরা গোলকিপার হয়ে গোল্ডেন গ্লাভস্ পেয়েছিলেন। একটা নিশ্ছিদ্র দেওয়াল হয়ে তিনি আগলে রেখেছিলেন তার দলের গোলবার আর বার বার হতাশ করে তুলেছেন স্পেনের গুণে গুণে এগারোজন খেলোয়াড়ের সবাইকে। স্পেনের দুর্ধর্ষ দশটা প্রয়াস একাই ঠেকিয়ে দিয়ে তিনি দেখিয়েছেন অতিমানবীয় দক্ষতা ও নৈপুণ্য।
ঢোলবাদ্য বাজিয়ে জমজমাট শুভ সূচনার পর ফাইনালের বল মাঠে গড়ায় যথা সময়ে। কিন্তু শুরু থেকেই বল সীমাবদ্ধ হয়ে যায় আর্জেন্টাইন অর্ধাংশে। স্পেনের অপেক্ষাকৃত তরুণ খেলোয়াড়দের বিপক্ষে আর্জেন্টাইন বেশি বয়সের দলটাকে নিষ্প্রভ মনে হয়েছে। খেলা দেখে মনে হলো, কোচ লিওনেল স্কালোনি শুরু থেকেই রক্ষণশীল মনোবৃত্তি নিয়ে কৌশল সাজিয়েছেন। দলে অভিজ্ঞ খেলোয়াড় আর বিশ্বসেরা গোলকিপার থাকায় তিনি হয়তো বা চেয়েছিলেন কোনোভাবে খেলাটাকে টেনে টাইব্রেকার পর্ব অবধি নিয়ে যেতে। তখন হয়তো মার্টিনেজ-মেসি জুটি তাদের ঝলক দেখাতো। কিন্তু বিধিবাম। স্পেনের 'লা রোজা'র দলটি গুরু লুইস দে লা ফুয়েন্তেসের মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে আক্রমণে উজ্জীবিত ছিলো। ফুয়েন্তেসের কৌশল ছিলো আক্রমণ আর স্কালোনির স্ট্র্যাটেজি ছিলো রক্ষণের মাধ্যমে গোল সামলানো। ফলে খেলা সমানে সমানে না হয়ে খেলা হয়ে গেছে স্পেনের পক্ষে একতরফা। অন্যান্য দিনের তুলনায় মেসি ছিলেন নিষ্প্রভ এবং অন্য খেলোয়াড়দের মধ্যে ক্লান্তি ও অহংবোধের ছাপ ছিলো। পাশাপাশি তাদের মনোযোগে বিঘ্ন ঘটার একটা কারণ হতে পারে মিশরের বিপক্ষে ম্যাচ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ওঠা নিন্দার ঝড়কে কেন্দ্র করে। আর্জেন্টিনা যেমন আগের কয়েকটা খেলাতে শেষ সময়ে জ্বলে উঠে জয়ী হয়েছে, তেমনি ফাইনালেও অনেকে তা মনে করেছিলো। অতিরিক্ত সময়ে গড়ানো ম্যাচের একশো পাঁচ মিনিট পর্যন্ত মার্টিনেজ প্রায় একাই ঠেকিয়ে রেখেছিলো 'লা রোজা'দের। কিন্তু এরপর আর সামাল দেওয়া সম্ভব হয়নি। নিকো উইলিয়ামসের হেডের পাসে ফেরান তোরেসের জাল কাঁপানো শটে স্পেন এগিয়ে যায় মাঠের খেলায়। মেসিকেন্দ্রিক গড়ে ওঠা দলে মেসির জ্বলে না ওঠায় বিকল হয়ে পড়ে পুরো আক্রমণ ভাগ। ফলে মূল খেলার নব্বই মিনিট এবং অতিরিক্ত সময়ের প্রথম পনর মিনিটে আর্জেন্টিনা স্পেনের গোলে কোনো শট নিতে পারেনি। এটা লাতিন আমেরিকার ফুটবলের জন্যে এক হতাশার অধ্যায়। বরং অতিরিক্ত সময়ে কোচ স্কালোনি স্ট্রাইকার হুলিয়ান আলভারেজকে তুলে নিয়ে ডিফেন্ডার মার্কোজ সেনেসিকে মাঠে নামান, যা বলে দেয় তার লো ব্লকে টিম ফর্মেশনের কৌশলের মূল কাহিনিকে।
ইউরোপ-লাতিনের দ্বৈরথে স্পেনের টিকি-টাকার কাছে হেরে গেলো মেসির দলের শিল্প। বরং তার বদলে আর্জেন্টিনাকে বল প্রয়োগে মনোযোগী হতে দেখা গেলো। মার্টিনেজ না থাকলে আর দুটো গোল বাতিল না হলে হয়তো ব্রাজিলকে পীড়া দেওয়া 'সেভেন আপ' তত্ত্ব কাল থেকে আর্জেন্টিনাকেও ভাগ করে ভোগ করতে হতো। সারা খেলায় আর্জেন্টিনার বিপক্ষে রেফারির কেবল একটা মাত্র সিদ্ধান্ত গেছে আর তা হলো ম্যাচের তিরাশি মিনিটে দ্বিতীয় হলুদ কার্ডের কারণে এনজো ফানান্দেজকে লাল কার্ড দেখিয়ে মাঠ ত্যাগে বাধ্য করা। যেহেতু প্রশ্নটা লাল কার্ডের, সেক্ষেত্রে রেফারি শুধু ফাউল দিয়ে কার্ড না দেখালেই পারতেন। অন্যথায় ম্যাচের অধিকাংশ সিদ্ধান্তে স্পেনের অধিকার রক্ষিত হয়নি বলে মনে হয়েছে। স্পেনের মিকেল মেরিনোর করা প্রথম গোলটি
বল জালে জড়ানোর সঙ্গে সঙ্গেই ম্যাচের রেফারি স্লাভকো ভিনচিচ বাতিল করে দেন। রেফারি আর্জেন্টিনার ওতামেন্দি ও স্পেনের মিকেল মেরিনোর বল দখলের ঘটনায় মেরিনোর পা ওতামেন্দির পায়ে লাগাকে প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচনা করে ফাউলের বাঁশি বাজান। ফলে গোলটি বাতিল হয়। কিন্তু স্পেনের খেলোয়াড়রা এই সিদ্ধান্তে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করলেও রেফারি তার সিদ্ধান্তে অটল থাকেন এবং কোনো ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারির সহায়তা নেননি। অথচ রিপ্লেতে পরিষ্কার দেখা যায়, বল মিকেল মেরিনোর কাছে আসার আগে ডি-বক্সে আর্জেন্টাইন এক খেলোয়াড়ের হাতে লেগে যায়, যা ইচ্ছাকৃত না হলেও ঐ সময় তা অতি গুরুত্বপূর্ণ ছিলো। ফলে হ্যান্ডবলের কারণে এটা পেনাল্টিও হতে পারতো স্পেনের অনুকূলে। দ্বিতীয় গোলটি মাঝমাঠে অনলাইন অবস্থায় ফেরান তোরেস দৌড় শুরু করে হাওয়ায় থাকা বলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে একক প্রচেষ্টায় দৌড়ে গোল করেন। এতক্ষণ তা অফসাইড ঘোষণা না করে বল জালে জড়ানোর পরে তা অফসাইডের উছিলায় বাতিল করা হয়। অথচ এ দুগোলের কোনোটাতেই
ভিএআর-এর সাহায্য নেওয়া হয়নি।
ম্যাচে ভালো খেলেছেন মেসির হাতে পাঁচ মাস বয়সে স্নানের আশীর্বাদ পাওয়া লামিনে ইয়ামাল। তাকে সামাল দিতে আর্জেন্টাইন ডিফেন্ডার ও মাঝমাঠকে বেশ ব্যস্ত থাকতে হয়েছে।
ম্যাচশেষে আর্জেন্টাইন খেলোয়াড়দের বর্বর আচরণ অবশ্য তাদের সুনামের সাথে যায় না। খেলায় স্পেনের রদ্রিকে ফাউল করে হলুদ কার্ড পাওয়া লেয়ান্দ্রো পারাদেস খেলা শেষ না হতেই স্পেনের বেঞ্চের খেলোয়াড় এরিক গার্সিয়ার গলা চেপে ধরেন। ফলে তিনি মাঠের বাইরে থেকেই সরাসরি লাল কার্ড পান। আবার ট্রফি গ্রহণের সময় আর্জেন্টাইন দলটি স্প্যানিশ খেলোয়াড়দের দিকে পিঠ দিয়ে গ্যালারির ভক্তদের দিকে তাকিয়ে থাকে। এটা ছিলো স্পোর্টসম্যানশিপের চরম লঙ্ঘন।
দুহাজার ছাব্বিশের বিশ্বকাপ মেসিকে রিক্ত হাতে ফিরিয়েই দিলো। না কোনো ব্যক্তিগত অর্জন, না কোনো দলগত প্রাপ্তি। সবাই যে বিজয়ীকেই মনে রাখে। তাই দিনশেষে মনে হলো দুহাজার বাইশেই কাপজয়ী হিসেবে মেসির বিশ্বকাপকে বিদায় জানানো উচিত ছিলো। তাহলে ভক্তদের খেলাশেষে মাঠে একা বিধ্বস্ত নিঃসঙ্গ শেরপা হয়ে বসে থাকা অশ্রুবাষ্পাকুল মেসির বেদনা দেখতে হতো না। এ বিশ্বকাপ তাকে কোনো মুকুট না দিয়ে বরং কিছু কলঙ্কের ভাগীদার করে গেলো।
বিদায় লিওনেল! বিদায়!







