প্রকাশ : ২৬ আগস্ট ২০২৬, ০৯:৩৯
ঈদে মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উদযাপনের বৈধতা

৫৭০ খ্রিস্টাব্দে রবিউল আউয়াল মাসের ১২ তারিখে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হেদায়াতের বাণী নিয়ে এ ধূলির ধরায় আগমন করেছেন। তঁার আগমনে সৃষ্টিকুলের সবাই খুশি হয়েছিল একমাত্র ইবলিস (শয়তান) ব্যতীত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আগমন উপলক্ষে আনন্দ উদযাপন করা কুরআন-সুন্নাহ এবং সালফে সালিহীনের আমল দ্বারা প্রমাণিত। নিম্নে এ সম্পর্কে আলোকপাত করা হলো। পরিচয়: ‘ঈদ’ শব্দের অর্থ: খুশি, আনন্দ উদযাপন করা; ‘মিলাদ’ শব্দের অর্থ: জন্ম বৃত্তান্ত। সুতরাং ‘ঈদে মিলাদুন্নবী’ অর্থ: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দুনিয়ায় আগমনের বৃত্তান্ত আলোচনা করা এবং এ উপলক্ষে আনন্দ উদযাপন করা। কুরআনুল কারীমের আলোকে ঈদে মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম: আল্লাহ তায়ালা বলেন: “হে রাসূল! আপনি স্মরণ করুন ঐ দিনের ঘটনা, যখন আমি আম্বিয়া কিরামের নিকট থেকে অঙ্গীকার নিয়েছিলাম যে, যখন আমি তোমাদেরকে কিতাব এবং হিকমত (নবুয়ত) দান করবো, অতঃপর তোমাদের কাছে এক মহান রাসূলের শুভাগমন হবে, যিনি তোমাদের প্রত্যেকের নবুয়তের সত্যায়ন করবেন, তখন তোমরা সবাই অবশ্যই তঁার উপর ঈমান আনয়ন করবে এবং সর্বতোভাবে তঁাকে সহায়তা করবে। তোমরা কি এ কথার অঙ্গীকার করছো এবং অঙ্গীকারে কি অটল থাকবে? নবীগণ (আ.) বললেন-হ্যঁা, আমরা অঙ্গীকার করলাম। আল্লাহ তায়ালা বললেন: তোমরা পরস্পর সাক্ষী থেকো এবং আমিও তোমাদের সাথে সাক্ষী রইলাম। (সূরা আলে-ইমরান: ৮১-৮২)
অত্র আয়াতের দ্বারা কয়েকটি বিষয় প্রতীয়মান হয়, অন্যান্য নবীগণ (আ.) থেকে আল্লাহ তায়ালা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আগমন সম্পর্কে জানিয়ে তঁার প্রতি ঈমান আনা ও সহায়তা করার ব্যাপারে অঙ্গীকার আদায় করেছিলেন; রূহানী জগতে সকল নবী (আ.) উপস্থিত হয়েছিলেন এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আগমনের পূর্বেই তঁার আগমনের আলোচনা হয়েছিল।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, আল্লাহ ঈমানদারদের উপর অনুগ্রহ করেছেন যে, তাদের মাঝে তাদের নিজেদের মধ্য থেকে নবী পাঠিয়েছেন। তিনি তাদের জন্য তঁার আয়াতসমূহ পাঠ করেন। তাদেরকে পরিশোধন করেন এবং তাদেরকে কিতাব ও কাজের কথা শিক্ষা দেন। বস্তুতঃ তারা পূর্বে ছিল পথভ্রষ্ট। (সূরা আলে-ইমরান: ১৬৪)
অনুগ্রহ পেয়ে খুশি উদযাপন করা আল্লাহ তায়ালার নির্দেশ। যেমন, আল্লাহ তায়ালা বলেন, (হে নবী!) আপনি বলুন, আল্লাহরই অনুগ্রহ ও তঁার দয়া প্রাপ্তিতে তারা যেন আনন্দ প্রকাশ করে। এটা তাদের সমস্ত ধন-সম্পদ সঞ্চয় করা অপেক্ষা শ্রেয়। (সূরা ইউনুস: ৫৮)। এই আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম জালালুদ্দিন সুয়ূতী (রহ.) তঁার তাফসীর গ্রন্থ আদ-দুররুল মানছুরে উল্লেখ করেন: হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) এই আয়াতের তাফসীরে বলেন, এখানে ফাদ্বলুল্লাহ (আল্লাহর অনুগ্রহ) দ্বারা ইলমে দ্বীন বুঝানো হয়েছে, আর রহমত (দয়া) দ্বারা প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বুঝানো হয়েছে। যেমন: আল্লাহ তায়ালা বলেন, (হে নবী!) আমি আপনাকে সমগ্র বিশ্বের জন্য রহমতস্বরূপ প্রেরণ করেছি। (সূরা আম্বিয়া: ১০৭)।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় নেয়ামত এবং রহমত। নেয়ামত পেয়ে শুকরিয়া আদায় করা আমাদের কর্তব্য। যেমন, আল্লাহ তায়ালা বলেন, তোমরা আল্লাহর নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করো, যদি তোমরা তঁারই ইবাদত করো। (সূরা নাহল: ১১৪)। সুতরাং তঁার আগমনে ঈদ বা খুশি উদযাপন করার মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালার নির্দেশ পালন করা যায়।
হাদীস শরীফের আলোকে ঈদে মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম: হযরত আবু কাতাদাহ (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে সোমবারের রোজা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, ঐদিন আমি জন্মলাভ করেছি এবং ঐদিন আমার উপর (কুরআন) নাযিল হয়েছে। (সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৬৪০) এ হাদীস শরীফ দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেই নিজের বিলাদত দিবস পালন করতেন। এছাড়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেই নিজের আকিকা করেছেন। তঁার দাদা বিলাদতের পর সপ্তম দিনে আকিকা করার পরও তিনি পুনরায় আকিকা করার দ্বারা নিজের মিলাদকে স্মরণ করেছেন। এর দ্বারাও বুঝা গেল, মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উদযাপন করা সুন্নাত। হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত। একদিন তিনি কিছু লোক নিয়ে নিজ ঘরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মিলাদের (জন্ম বৃত্তান্ত) আলোচনা করে আনন্দ উৎসব করছিলেন এবং তঁার প্রশংসাবলি আলোচনা করছিলেন। এমন সময় প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেখানে উপস্থিত হয়ে এটা দেখে বললেন: তোমাদের সকলের জন্য আমার শাফায়াত অবধারিত হয়ে গেলো। (ইবনে দাহইয়া কৃত আত-তানভীর ফি মাওলিদি বাশিরিন নাযীর)। ঈদে মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে সালফে সালিহীনের আমল:
হযরত হাসান বসরী (রহ.) বলেন, আমার কাছে যদি উহুদ পাহাড় পরিমাণ স্বর্ণ থাকতল, তবে আমি তা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিলাদত দিবস উপলক্ষে খরচ করতাম। (আন-নি‘মাতুল কুবরা আলাল-আ‘লাম, পৃ. ১১)। আব্দুল হক মুহাদ্দিসে দেহলভী (রহ.) ‘মা সাবাতা মিনাস-সুন্নাহ’ গ্রন্থে লিখেছেন, হাজার মাসের চেয়ে উত্তম লাইলাতুল কদর, ফযিলতের রাত শবে বরাত, শবে মিরাজ, দুই ঈদের রাত এ সবই রহমাতুল্লিল আলামীনকে দান করা হয়েছে। যঁাকে দান করা রাত হাজার মাসের চেয়ে উত্তম, স্বয়ং তঁার আগমন দিবস যে কত লক্ষ-কোটি দিবস-রজনীর চেয়ে উত্তম তাতে সন্দেহের অবকাশ নেই।
ঈদে মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পালনের উপকারিতা: ঈদে মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উদযাপনের মধ্যে অনেক কল্যাণ রয়েছে। যেমন: হযরত আব্বাস (রা.) বলেছেন, যখন আবু লাহাব মারা যায় তার এক বছর পর স্বপ্নে দেখি যে, সে বড়ই খারাপ অবস্থায় আছে এবং সে বলছিল, তোমাদের কাছ থেকে আসার পর কোনো শান্তি পাইনি। তবে হ্যঁা এতটুকু যে, প্রত্যেক সোমবার আমার আযাব হালকা করে দেয়া হয়। তা শুনে হযরত আব্বাস (রা.) বললেন, এটি এজন্যই যে, প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সোমবার দিনে দুনিয়াতে আগমন করেছেন। আর ছোয়াইবা নামীয় জনৈক ক্রীতদাসী তাকে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আগমনের শুভ সংবাদ দিয়েছিল বিধায় সন্তুষ্টচিত্তে আবু লাহাব তাকে আযাদ (মুক্ত) করে দিয়েছিল। (ফাতহুল বারী, খ. ৯, পৃ. ১১৮; আইনী, খ. ২০, পৃ. ৯৫; জুরকানী আলাল-মাওয়াহিবিল লাদুন্নিয়াহ, খ. ১, পৃ. ২৬০)।
এই হাদীসের ব্যাখ্যায় আল্লামা আবুল খায়ের শামসুদ্দিন ইবনে জাযরী (রহ.) বলেছেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিলাদাতের রাতে তঁার আগমনের সুসংবাদ শুনে খুশি হওয়ার কারণে যদি এমন জঘন্য কাফের যার বিরুদ্ধে কুৎসা রটনা করে পবিত্র কুরআনে সূরা লাহাব নাযিল করা হয়েছে, এমন কাফেরের শাস্তি যদি হালকা করা হয়, তবে একজন তাওহীদবাদী মুসলমান যদি তঁার আগমনের তারিখে খুশি হয়ে সাধ্যমতো সম্পদ ব্যয় করে, তঁার প্রতিদানের অবস্থা কেমন হতে পারে? তিনি বলেন, আমার জীবনের শপথ, নিশ্চয়ই তঁার প্রতিদান আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে এটাই হবে যে, আল্লাহ তায়ালা তঁাকে বিশেষ অনুগ্রহে জান্নাতুন নাঈমে প্রবেশ করাবেন (সুবহানাল্লাহ)।
উপর্যুক্ত আলোচনায় প্রতীয়মান হলো যে, ঈদে মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পালন করা সুন্নাত। প্রচলিত পদ্ধতিতে মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পালন করা মুস্তাহাব। সুন্নাতের পাশাপাশি মুস্তাহাবের ফায়েদা লাভ করা যাবে। ইমাম ইবনে হাজার হায়তামী (রহ.) বলেন, বিদআতে হাসানার কাজ মুস্তাহাব হওয়ার উপর সকল বিজ্ঞ আলিমগণের ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং মিলাদ শরীফের আমল ও সেটার উদ্দেশ্যে লোকদের মাহফিল করা অনুরূপ মুস্তাহাব (তাফসীরে রুহুল বায়ান, খ. ৯, পৃ. ৫৬)।
সুতরাং ঈদে মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পালনের লক্ষ্যে জশনে জুলুছ (আনন্দ মিছিল) করা, নাত মাহফিল করা, জন্ম বৃত্তান্ত আলোচনা করা, মানুষদেরকে খাওয়ানো এবং দান-খয়রাত করা অত্যন্ত ভালো কাজ। এ ধরনের কাজ করলে নিঃসন্দেহে অশেষ নেকি পাওয়া যাবে। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে ঈদে মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উদযাপনের মাধ্যমে তঁার প্রিয় হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মুহাব্বত অর্জন করার তাওফিক দান করুন। আমীন!
লেখক: প্রভাষক (আরবি), রামপুর আদর্শ আলিম মাদরাসা, চঁাদপুর সদর, চঁাদপুর; পিএইচডি, গবেষক, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।








