প্রকাশ : ১৫ মে ২০২৬, ১২:০১
আন্তর্জাতিক পরিবার দিবস
পরিবার শক্তিশালী হলেই সমাজ হবে শক্তিশালী

আজ আন্তর্জাতিক পরিবার দিবস। ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য— “পরিবার, বৈষম্য ও শিশু কল্যাণ”। এই প্রতিপাদ্য আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরে— আমরা কি আমাদের সন্তানদের জন্য একটি ন্যায্য, নিরাপদ ও সমান সুযোগের পৃথিবী গড়ে তুলতে পারছি?
|আরো খবর
পরিবার হলো সমাজের মূল ভিত্তি। একটি সুখী ও সুস্থ পরিবার শুধু কয়েকজন মানুষের একসাথে বসবাস নয়, এটি ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ, নিরাপত্তা ও মানবিকতার এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। পরিবার শক্তিশালী হলে সমাজ শক্তিশালী হয়, আর সমাজ শক্তিশালী হলে দেশ এগিয়ে যায়। কিন্তু বর্তমান সময়ে পরিবার নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে। সম্পর্ক দুর্বল হচ্ছে, সন্তানদের সঙ্গে দূরত্ব বাড়ছে, প্রবীণ মা-বাবা একাকীত্বে ভুগছেন। তাই পরিবারকে নতুন করে গুরুত্ব দেওয়া এখন সময়ের দাবি।
একটি পরিবারকে শক্তিশালী করতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন নিয়মিত যোগাযোগ। বর্তমানে আমরা একই ঘরে থেকেও অনেক সময় একে অপরের সঙ্গে কথা বলি না। মোবাইল ফোন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও ব্যস্ত জীবন আমাদের সম্পর্কের উষ্ণতা কমিয়ে দিচ্ছে। অথচ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে প্রতিদিন কিছু সময় গল্প করা, খোঁজখবর নেওয়া বা অনুভূতি ভাগাভাগি করা সম্পর্ককে গভীর করে তোলে। সন্তানদের মানসিক বিকাশেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
একসাথে খাবার খাওয়ার অভ্যাসও পারিবারিক বন্ধনকে শক্তিশালী করে। আগে পরিবারে সবাই একসাথে বসে খেতো, গল্প করতো। এখন অনেক পরিবারে সেই চিত্র আর দেখা যায় না। অথচ একসাথে খাওয়ার সময় পারস্পরিক বোঝাপড়া বাড়ে, শিশুরা পারিবারিক মূল্যবোধ শেখে এবং পরিবারের সদস্যদের মধ্যে মানসিক দূরত্ব কমে।
পরিবারে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের সংস্কৃতিও খুব জরুরি। আমরা অনেক সময় ধরে নিই যে পরিবারের মানুষ তো দায়িত্ব পালন করবেই। কিন্তু ছোট ছোট ধন্যবাদ, প্রশংসা বা ভালোবাসার প্রকাশ সম্পর্ককে আরও সুন্দর করে তোলে। একজন গৃহিণীর পরিশ্রম, একজন বাবার দায়িত্ব পালন বা পরিবারের প্রবীণ সদস্যদের অবদানকে সম্মান জানানো পারিবারিক সৌহার্দ্য বাড়ায়।
দ্বন্দ্ব বা মতবিরোধ প্রতিটি পরিবারেই থাকে। কিন্তু সেই দ্বন্দ্ব সম্মানের সঙ্গে সমাধান করাই গুরুত্বপূর্ণ। চিৎকার, অপমান বা নীরব দূরত্ব কোনো সমস্যার সমাধান নয়। বরং ধৈর্য, সহানুভূতি ও পারস্পরিক সম্মান একটি পরিবারকে টিকিয়ে রাখে। শিশুরাও তখন শিখে কিভাবে ভিন্ন মতকে সম্মান করতে হয়।
বর্তমান সময়ে পরিবারে কিছু সীমানা নির্ধারণ করাও জরুরি হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে প্রযুক্তি ব্যবহারে সচেতনতা প্রয়োজন। অনেক শিশুই এখন বাস্তব সম্পর্কের চেয়ে স্ক্রিনের জগতে বেশি সময় কাটায়। ফলে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে কথাবার্তা কমে যাচ্ছে। তাই পরিবারে নির্দিষ্ট সময় মোবাইল বা টিভি বন্ধ রেখে একসাথে সময় কাটানোর অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে কাজের বণ্টনে সাম্য বজায় রাখাও জরুরি। সংসার শুধু নারীর দায়িত্ব নয়, পরিবারের সকল সদস্যের অংশগ্রহণ প্রয়োজন।
পরিবারের নিজস্ব ঐতিহ্য বা পারিবারিক রীতি বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। ঈদ, পূজা বা অন্যান্য উৎসবে একসাথে সময় কাটানো, আত্মীয়দের বাড়ি যাওয়া, পারিবারিক অনুষ্ঠান আয়োজন— এসব শিশুদের মধ্যে পরিচয় ও একতার বোধ তৈরি করে। এতে তারা শেকড়ের সঙ্গে যুক্ত থাকতে শেখে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পরিবারের প্রবীণ সদস্যদের যত্ন নেওয়া। বর্তমান সমাজে অনেক বৃদ্ধ মা-বাবা একাকীত্বে ভুগছেন। কর্মব্যস্ততা বা ছোট পরিবার ব্যবস্থার কারণে তারা অনেক সময় অবহেলিত হয়ে পড়েন। অথচ তাদের অভিজ্ঞতা, ভালোবাসা ও আশীর্বাদ পরিবারকে সমৃদ্ধ করে। প্রবীণদের পাশে দাঁড়ানো শুধু দায়িত্ব নয়, এটি মানবিকতার পরিচয়।
আজকের সমাজে আরেকটি বড় সমস্যা হলো বৈষম্য। শহর ও গ্রামের শিশুদের সুযোগ এক নয়, ধনী ও গরিব পরিবারের সন্তানদের প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও বড় পার্থক্য রয়েছে। ডিজিটাল ব্যবধানের কারণে অনেক শিশু পিছিয়ে পড়ছে। আবার কর্মজীবী নারীরা সংসার ও চাকরির দ্বৈত দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে মানসিক ও শারীরিক চাপের মুখে পড়ছেন। তাই পরিবার ও সমাজকে আরও সহানুভূতিশীল হতে হবে।
আন্তর্জাতিক পরিবার দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়— শক্তিশালী পরিবার গড়ে তোলা শুধু ব্যক্তিগত বিষয় নয়, এটি একটি সামাজিক দায়িত্ব। সন্তানদের সুন্দর ভবিষ্যৎ, প্রবীণদের মর্যাদা এবং মানবিক সমাজ গঠনের জন্য পরিবারকে ভালোবাসা, সম্মান ও সময় দিতে হবে। কারণ একটি সুখী পরিবারই পারে একটি সুন্দর সমাজ ও মানবিক পৃথিবী গড়ে তুলতে।








