সোমবার, ১১ মে, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ১১ মে ২০২৬, ০৩:১৪

আঁচলের ভাঁজে গড়া এক সাম্রাজ্য!

পঞ্চম শ্রেণী পাস এক মায়ের দূরদৃষ্টি, ত্যাগ ও নীরব বিপ্লবের অনুলিখিত ইতিহাস

অধ্যাপক মো. জাকির হোসেন,১০ মে ২০২৬
আঁচলের ভাঁজে গড়া এক সাম্রাজ্য!
ক্যাপশন: ছবি লেখকের কল্পনায়।

আঁচলের ভাঁজে গড়া এক সাম্রাজ্য: পঞ্চম শ্রেণী পাস এক মায়ের দূরদৃষ্টি, ত্যাগ ও নীরব বিপ্লবের অনুলিখিত ইতিহাস
২০১৯ সালের ১৩ ডিসেম্বর।
দিনটি কেবল ক্যালেন্ডারের একটি তারিখ নয়; আমাদের পরিবারের ইতিহাসে সেটি এক অপয়ূরণীয় শূন্যতার দিন। সেদিন আমাদের মাথার ওপর থেকে সরে গিয়েছিল এক অদৃশ্য ছায়াবৃক্ষ, নিভে গিয়েছিল সংসারের নীরব প্রদীপ, থেমে গিয়েছিল এমন এক হৃদস্পন্দন— যার শব্দে টিকে ছিল পুরো পরিবার।

আজ বিশ্ব মা দিবসে পৃথিবীর বহু মানুষ হয়তো ফুল, শুভেচ্ছা আর আনুষ্ঠানিকতায় মাকে স্মরণ করছে। আর আমি ফিরে যাচ্ছি স্মৃতির সেই দীর্ঘ করিডরে, যেখানে এখনো ভেসে আসে এক পরিচিত কণ্ঠ—
— “কি হয়েছে তোর?”
মাত্র তিনটি শব্দ।
কিন্তু সেই তিনটি শব্দের ভেতর লুকিয়ে ছিল পৃথিবীর সমস্ত নিরাপত্তা, সমস্ত মমতা আর এক অলৌকিক অনুভূতির স্পর্শ।

আমি হয়তো কিছুই বলিনি। মুখে হাসি ছিল। বাইরে থেকে সব স্বাভাবিক। অথচ মা আমার চোখের ভেতর জমে থাকা অস্থিরতা পড়ে ফেলতেন। তিনি ছিলেন এমন এক মানুষ, যিনি সন্তানের নীরবতারও শব্দ শুনতে পেতেন। আজ বুঝি, মা কেবল সন্তান জন্ম দেন না; মা সন্তানের অদৃশ্য কষ্টেরও ভাষান্তর করতে পারেন।

পঞ্চম শ্রেণীর গণ্ডি পেরোতে না পারা সেই নারী কীভাবে হয়ে উঠলেন একটি পরিবারের ‘ভিশনারি’

আমার মা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারী ছিলেন না। তিনি কোনো সেমিনারে বক্তব্য দেননি, কোনো বই লেখেননি, কোনো বড় প্রতিষ্ঠানের প্রধানও ছিলেন না। তবুও আজ পেছনে তাকালে মনে হয়— তিনি ছিলেন আমাদের পরিবারের সবচেয়ে বড় কৌশলবিদ, সবচেয়ে দক্ষ অর্থনীতিবিদ এবং সবচেয়ে দূরদর্শী পরিকল্পনাকারী। মাত্র পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা করেও তিনি বুঝেছিলেন— দারিদ্র্যকে হারানোর সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো শিক্ষা। এই উপলব্ধিটুকুই তাঁকে অসাধারণ করে তুলেছিল। তিনি হয়তো আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার ভাষা জানতেন না, কিন্তু তিনি জানতেন— একটি বই একটি পরিবারকে বদলে দিতে পারে, একটি পেন্সিল একটি প্রজন্মকে আলোকিত করতে পারে।

চকলেট নয়, কাটপেন্সিল: এক মায়ের নীরব বিপ্লব

শৈশবে আমরা যখন চকলেটের জন্য বায়না ধরতাম, মা সহজে টাকা দিতেন না। ছোটবেলায় মনে হতো— মা খুব কঠোর। কিন্তু যেই বলতাম— “মা, কাটপেন্সিল লাগবে…” অমনি আঁচলের গিঁট খুলে টাকা বেরিয়ে আসত। আজ উপলব্ধি করি, মা সেদিন আমাদের হাতে কেবল একটি কাটপেন্সিল তুলে দেননি; তিনি তুলে দিয়েছিলেন ভবিষ্যতের চাবিকাঠি। তিনি জানতেন, চকলেট মুহূর্তের আনন্দ দেয়, কিন্তু শিক্ষা মানুষের ভাগ্য বদলে দেয়। এটাই ছিল তাঁর দর্শন। এটাই ছিল তাঁর নীরব বিপ্লব। একজন স্বল্পশিক্ষিত মা তাঁর সন্তানদের ভেতরে যে শিক্ষাবোধ, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং ভবিষ্যৎ-চিন্তার বীজ বপন করেছিলেন— সেটিই আজ আমাদের প্রতিষ্ঠার ভিত্তি।

স্বল্প বেতনের সংসারে মায়ের অর্থনীতি ছিল এক অলিখিত বিশ্ববিদ্যালয়

বাবা ছিলেন স্বল্প বেতনের সরকারি কর্মকর্তা। পাঁচ ভাই-বোনের সংসার চালানো তখন কোনো সহজ বিষয় ছিল না। কিন্তু সংসারের প্রকৃত অর্থমন্ত্রী ছিলেন মা। মাস শেষে বাবা তাঁর পুরো বেতনটাই মায়ের হাতে তুলে দিতেন। সেটি ছিল শুধু দায়িত্ব নয়; ছিল এক গভীর আস্থা। মা সেই সীমিত অর্থ এমন নিখুঁতভাবে পরিচালনা করতেন, যেন তিনি কোনো অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক। অপ্রয়োজনীয় খরচ তিনি প্রায় অপরাধের চোখে দেখতেন। নিজের জন্য শখ বলতে কিছুই ছিল না তাঁর। বছরে দুইটির বেশি শাড়ি কিনেছেন— এমন স্মৃতি আমার নেই। কিন্তু সন্তানের পড়াশোনার খরচে তিনি কখনো আপস করেননি। আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে মাসের নির্দিষ্ট সময়ে টাকা পৌঁছে যেত। কখনো বলতে হয়নি— “মা, টাকা লাগবে।” তিনি আগেই বুঝতেন। কারণ মা সন্তানের প্রয়োজন মুখে বলার আগেই অনুভব করতে পারেন।

ঈদের আনন্দের চেয়ে সন্তানের ভবিষ্যৎ ছিল বড়

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের একটি ঈদ আজও স্মৃতিতে অমলিন। পরীক্ষার কারণে বাড়ি ফিরতে পারিনি। বাবা খুব কষ্ট পেয়েছিলেন। কিন্তু মা ছিলেন অবিচল। তিনি জানতেন, একটি পরীক্ষার গুরুত্ব কখনো কখনো একটি উৎসবের চেয়েও বড়। তিনি আমাকে একবারও বলেননি— “বাড়ি চলে আয়।” কারণ তিনি আবেগের চেয়ে ভবিষ্যৎকে বড় করে দেখতে শিখেছিলেন। অন্যদিকে বাবা সন্তানের অনুপস্থিতি সহ্য করতে না পেরে ঈদের দিন নিজের কর্মস্থলে চলে গিয়েছিলেন। আর মা বুকের ভেতর কষ্ট চাপা দিয়ে দৃঢ় থেকেছেন, যেন সন্তানের মনোযোগে কোনো ব্যাঘাত না ঘটে।

হারিয়ে যাওয়া অলঙ্কার, কিন্তু না হারানো আত্মসম্মান

১৯৭৪ সালে এক প্রতারক বাবার পরিচয়ের সুযোগ নিয়ে মায়ের বিয়ের সমস্ত অলঙ্কার নিয়ে উধাও হয়ে যায়। সেই গহনাগুলো আর কোনোদিন ফেরত আসেনি। কিন্তু বিস্ময়কর বিষয় হলো— মা আর কখনো নতুন অলঙ্কার কেনার কথা ভাবেননি। অথচ সংসারের সমস্ত অর্থ তাঁর হাতেই থাকত। চাইলে তিনি নিজের জন্য অনেক কিছু করতে পারতেন। কিন্তু তিনি নিজের সাজসজ্জার চেয়ে সন্তানের ভবিষ্যৎকে বড় মনে করেছেন। তিনি বুঝেছিলেন— গহনা নারীর সৌন্দর্য বাড়ায়, কিন্তু শিক্ষা পুরো পরিবারকে সম্মানিত করে।

একটি নিম্নমানের ভাড়া বাসা বদলে দিয়েছিল পুরো পরিবারের ভবিষ্যৎ

আমার জ্যাঠা ছিলেন সরকারি কর্মকর্তা। অবসরের পর তাঁকে একটি অস্বস্তিকর ভাড়া বাসায় থাকতে দেখে মা গভীরভাবে নাড়া খেয়েছিলেন। সেদিনই তিনি সিদ্ধান্ত নেন— “বাবার অবসরের আগেই নিজের একটি বাড়ি করতে হবে।” সেই সিদ্ধান্তই আজ আমাদের অস্তিত্বের ভিত্তি। বাবার সীমিত বেতন থেকে তিলে তিলে টাকা জমিয়ে প্রথমে জমি কেনা, পরে ধীরে ধীরে একটি বাড়ি নির্মাণ— এটি ছিল এক নারীর নীরব সংগ্রামের ইতিহাস। আজ চাঁদপুর শহরের সেই বাড়িতেই আমরা তিন ভাই বসবাস করছি। দুই বোনও নিজেদের জীবনে একই শিক্ষা ধারণ করে নিজেদের আবাস গড়ে তুলেছেন। একজন পঞ্চম শ্রেণী পাস নারী তাঁর দূরদৃষ্টিতে পুরো একটি প্রজন্মের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছেন।

তিনি ছিলেন আমাদের পরিবারের নীরব রাষ্ট্রনায়ক

আজ বুঝি, মা ছিলেন না কেবল একজন গৃহিণী। তিনি ছিলেন— একটি পরিবারের অদৃশ্য প্রধানমন্ত্রী, একজন অলিখিত অর্থনীতিবিদ, একজন কঠোর শিক্ষানীতির প্রণেতা, একজন দূরদর্শী পরিকল্পনাকারী, এবং সর্বোপরি— একজন নীরব বিপ্লবী নারী। আমরা পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে চারজন আজ সমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত। এই অর্জনের পেছনে সবচেয়ে বড় নামটি যদি বলতে হয়, তবে সেটি আমাদের মা।

রাত দুটোয় মায়ের কাছে ফিরে যাওয়া

এখন গভীর রাত। ঘড়ির কাঁটা দুটো ছুঁয়েছে। চারপাশ নিস্তব্ধ। পাশে আমার স্ত্রী ঘুমিয়ে আছে। অন্য রুমে নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে আমার মেয়ে। অথচ আমি বসে আছি আলো-আঁধারির এই নির্জন রাতে, মাকে নিয়ে লিখছি। লিখতে লিখতে কখন যে চোখ ভিজে গেছে, নিজেই বুঝতে পারিনি। শব্দগুলো ঝাপসা হয়ে আসছে। বুকের ভেতর এক ধরনের চাপা কান্না জমে উঠছে। হয়তো এটাই মা। মানুষ চলে যায়, কিন্তু কিছু শূন্যতা কখনো যায় না। আজ এত বছর পরও মনে হয়, দরজার ওপাশ থেকে মা ডাক দেবেন— “কি হয়েছে তোর?” আজও মনে হয়, পৃথিবীর সব মানুষ ঘুমিয়ে পড়লেও একজন মানুষ ঠিক জেগে থাকতেন আমার জন্য। মাঝে মাঝে খুব অপরাধবোধ হয়। আমরা বড় হতে হতে বুঝতেই পারিনি, একজন মা কত নিঃশব্দে নিজের জীবনটাকে ক্ষয় করে দেন সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য। আমার মা নিজের জন্য কিছু চাননি। না অলঙ্কার, না বিলাসিতা, না ব্যক্তিগত স্বপ্ন। তিনি চেয়েছিলেন শুধু সন্তানের প্রতিষ্ঠা, একটি নিরাপদ ছাদ, আর শিক্ষিত ভবিষ্যৎ।

আজ আমি নিজেও বাবা। আজ আমার মেয়েকে ঘুমালে দেখলে হঠাৎ মায়ের কথা আরও বেশি মনে পড়ে। তখন বুঝতে পারি, সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে একজন মা কত গভীর উদ্বেগ, কত অদৃশ্য ভয় আর কত নীরব প্রার্থনা বুকে নিয়ে বেঁচে থাকেন। এই রাত, এই কান্না, এই স্মৃতি— সবকিছু মিলিয়ে আজ মনে হচ্ছে, মা আসলে কখনো দূরে চলে যান না। তাঁরা সন্তানের ভেতরেই থেকে যান— রক্তে, অভ্যাসে, বিবেকে, আর গভীর রাতের নিঃশব্দ কান্নায়।

চিরন্তন কৃতজ্ঞতাঞ্জলি

মা আজ নেই। তবু প্রতিটি বইয়ের পাতায়, প্রতিটি অর্জনের ভেতরে, প্রতিটি শৃঙ্খলার অভ্যাসে, প্রতিটি সঞ্চয়ের শিক্ষায়— তিনি আজও বেঁচে আছেন। আজও কোনো কঠিন মুহূর্তে মনে হয়, কেউ যেন খুব পরিচিত কণ্ঠে বলছে— “কি হয়েছে তোর?” আর তখন মনে হয়, পৃথিবীতে মা নামে মানুষগুলো কখনো সত্যিকার অর্থে মারা যান না। তাঁরা সন্তানের ভেতরে আজীবন বেঁচে থাকেন— নীতি হয়ে, সাহস হয়ে, প্রেরণা হয়ে। বিশ্ব মা দিবসে সেই মহীয়সী মায়ের প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা, অসীম ভালোবাসা এবং অনন্ত কৃতজ্ঞতা। কারণ ইতিহাসে অনেক সাম্রাজ্যের গল্প লেখা হয়, কিন্তু একটি পরিবারকে তিলে তিলে গড়ে তোলা মায়েদের মহাকাব্য খুব কমই লেখা হয়।
ডিসিকে /এমজেডএইচ

অধ্যাপক মো. জাকির হোসেন

প্রতিবেদক:
অধ্যাপক মো. জাকির হোসেন

বিশেষ প্রতিনিধি, সিনিয়র সাব-এডিটর, ও কলামিস্ট, দৈনিক চাঁদপুর কণ্ঠ।

তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক, চাঁদপুর জেলা বিএনপি।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়