প্রকাশ : ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৪৪
মানুষের পানীয় জল কেড়ে নিচ্ছে এআই প্রযুক্তি

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি আজ মানুষের জীবনযাত্রা, শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা, গবেষণা এবং যোগাযোগব্যবস্থায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনছে। কিন্তু এই প্রযুক্তির অগ্রগতির আড়ালে রয়েছে একটি ক্রমবর্ধমান পরিবেশগত সংকট, যার কথা এখনো সাধারণ মানুষের আলোচনায় যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি।
মানুষের পানীয় জলের ওপর সরাসরি কিংবা পরোক্ষভাবে চাপ সৃষ্টি করছে এআই-নির্ভর বিশাল ডেটা সেন্টারগুলো। এআই মডেল প্রশিক্ষণ, তথ্য সংরক্ষণ এবং কোটি কোটি মানুষের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য যে বিপুল কম্পিউটিং শক্তির প্রয়োজন হয়, তা সরবরাহ করতে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন প্রসেসর, সার্ভার এবং বিদ্যুৎ অবকাঠামো সার্বক্ষণিক চালু রাখতে হয়। এসব যন্ত্র প্রচুর তাপ উৎপন্ন করে। ফলে এগুলো ঠাণ্ডা রাখার জন্য বিপুল পরিমাণ পানি ব্যবহৃত হয়।
বিভিন্ন গবেষণা ও শিল্প খাতের হিসাব অনুযায়ী, বৃহৎ ডেটা সেন্টার ও এআই অবকাঠামোর পানি ব্যবহারের পরিমাণ দ্রুত বাড়ছে। কিছু হিসাব বলছে, এআই-সম্পর্কিত প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ পানি ব্যবহারের সম্মিলিত পরিমাণ প্রতিদিন শত কোটি লিটার (প্রতিদিন প্রায় ২০০ কোটি লিটার), যা দিয়ে অনায়াসে এক কোটি মানুষের তৃষ্ণা মেটানো সম্ভব। এই পানি অনেক ক্ষেত্রে নদী, ভূগর্ভস্থ উৎস কিংবা পৌরসভার সরবরাহব্যবস্থা থেকে সংগ্রহ করা হয়। ফলে যে পানি মানুষের পানীয়, কৃষি ও দৈনন্দিন জীবনের জন্য অপরিহার্য, তা প্রযুক্তির অদৃশ্য চাহিদার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পড়ছে।
এআই ডেটা সেন্টারে পানি ব্যবহারের প্রধান কারণ হলো সার্ভার ঠাণ্ডা রাখা। সাধারণ কম্পিউটারের তুলনায় এআই প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত জিপিইউ বা গ্রাফিকস প্রসেসিং ইউনিট অত্যন্ত শক্তিশালী এবং একই সময়ে হাজার হাজার গণনা সম্পন্ন করে। এসব প্রসেসর দীর্ঘ সময় কাজ করার সময় বিপুল তাপ উৎপন্ন করে। তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা না হলে প্রসেসর ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, কর্মক্ষমতা কমে যেতে পারে এবং পুরো সার্ভার ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। এ জন্য অনেক ডেটা সেন্টারে কুলিং টাওয়ার, চিলার এবং বাষ্পীভবনভিত্তিক শীতলীকরণ ব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়।
এই ব্যবস্থায় পানি গরম হওয়ার পর বাষ্পে পরিণত হয় এবং তাপকে পরিবেশে ছেড়ে দেয়। পানি বাষ্পীভূত হওয়ার ফলে সার্ভারের তাপমাত্রা কমে আসে। অর্থাৎ একটি অংশের পানি পুনরায় ব্যবহারযোগ্য অবস্থায় ফিরে আসে না, তা বায়ুমণ্ডলে জলীয়বাষ্প হিসেবে চলে যায়। কিছু আধুনিক ডেটা সেন্টারে বন্ধ চক্রের পানি ব্যবস্থাপনা থাকলেও সব প্রতিষ্ঠানে তা নেই। বিশেষ করে গরম ও শুষ্ক অঞ্চলে স্থাপিত ডেটা সেন্টারগুলোতে পানিনির্ভর কুলিং ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা বেশি হতে পারে। এ কারণে একটি ডেটা সেন্টারের প্রযুক্তিগত কার্যক্রম সরাসরি স্থানীয় পানিসম্পদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। আরো উদ্বেগের বিষয় হলো, এআইয়ের পানি ব্যবহার শুধু সার্ভার ঠাণ্ডা রাখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, প্রয়োজন হয় বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ। সেই বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রেও পানি ব্যবহৃত হয়, বিশেষ করে কয়লা, গ্যাস ও পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের শীতলীকরণ প্রক্রিয়ায়। বিদ্যুৎকেন্দ্রে টারবাইন চালানোর পর উৎপন্ন তাপ কমাতে বিপুল পরিমাণ পানি প্রয়োজন হয়। আরো একটি বিষয় হলো, ডেটা সেন্টারে কখনো কখনো কুলিং ব্যবস্থায় ব্যাকটেরিয়া নিয়ন্ত্রণের জন্য উচ্চমানের পরিশোধিত পানি প্রয়োজন হয়।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ডেটা সেন্টার স্থাপনের জন্য এমন অঞ্চল বেছে নেওয়া হচ্ছে, যেখানে বিদ্যুৎ সহজলভ্য, ইন্টারনেট অবকাঠামো উন্নত এবং জমির মূল্য তুলনামূলক কম। কিন্তু অনেক সময় পানি সংকটপূর্ণ এলাকায়ও বৃহৎ ডেটা সেন্টার নির্মাণ করা হচ্ছে। এতে স্থানীয় জনগোষ্ঠী, কৃষক এবং পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। এই সংকট থেকে বাঁচার জন্য গবেষক ও বড় প্রযুক্তি কম্পানিগুলো বেশ কিছু কার্যকরী উপায় নিয়ে কাজ করছে : ১. ক্লোজড-লুপ লিকুইড কুলিং : ঐতিহ্যবাহী কুলিং সিস্টেমে পানি বাষ্প হয়ে উড়ে যায়, যার ফলে পানির ব্যাপক অপচয় হয়। এর পরিবর্তে ক্লোজড-লুপ বা চিপের ভেতরে সরাসরি তরল প্রবাহিত করার প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। যেমন—এনভিডিয়া-এর নতুন ডিএসএক্স সিস্টেমের মতো বন্ধ লুপ কুলিং প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে কিছু ডেটা সেন্টারে পানির ব্যবহার প্রায় শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা সম্ভব। ২. বিকল্প পানির উৎস ব্যবহার : খাওয়ার উপযোগী বিশুদ্ধ পানির পরিবর্তে ডেটা সেন্টারে রিসাইকল করা বা পরিশোধিত বর্জ্য পানি এবং বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে তা ব্যবহার করা যেতে পারে। এতে স্থানীয় জনবসতির সুপেয় পানির ওপর কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়ে না। ৩. শীতল ভৌগোলিক অঞ্চলে ডেটা সেন্টার স্থাপন : পৃথিবীর প্রাকৃতিকভাবে ঠাণ্ডা অঞ্চলে (যেমন স্ক্যান্ডিনেভিয়ান বা নরডিক দেশগুলো) ডেটা সেন্টার স্থাপন করলে বাইরের ঠাণ্ডা বাতাস ব্যবহার করে সার্ভার ঠাণ্ডা রাখা যায়। যেমন—ফিনল্যান্ডে গুগলের একটি ডেটা সেন্টারে সমুদ্রের পানি ব্যবহার করে কুলিং করা হয়। ৪. ওয়াটার-পজিটিভ উদ্যোগ ও সরকারি নীতিমালা : বড় বড় টেক জায়ান্টরা এখন পানির অপচয় কমাতে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। পাশাপাশি এআই কম্পানিগুলোর পানির ব্যবহারের সঠিক হিসাব বাধ্যতামূলকভাবে প্রকাশ করার জন্য কঠোর সরকারি নীতিমালা তৈরি করা প্রয়োজন। ৫. দক্ষ এআই মডেল ও চিপ তৈরি : কম্পিউটেশনাল ক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি এমন এআই মডেল ও প্রসেসর তৈরি করা হচ্ছে, যা কম বিদ্যুৎ খরচ করে। বিদ্যুৎ সাশ্রয় হলে চিপ কম গরম হবে এবং তা ঠাণ্ডা করতে পানির প্রয়োজনও কমে যাবে। ৬. ব্যবহারকারীদের সচেতনতা : প্রয়োজন ছাড়া এআই দিয়ে বারবার ছবি বা ভিডিও জেনারেট করার মতো ভারী কাজ এড়িয়ে চলা উচিত। কারণ প্রতিটি প্রম্পট প্রসেস করতে পরোক্ষভাবে সার্ভারে পানির অপচয় হয়।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অনিয়ন্ত্রিত ও দ্রুত অগ্রগতি মানবসভ্যতার জন্য যেমন অভাবনীয় সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে, তেমনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অনিয়ন্ত্রিত অগ্রগতি মানবজাতি বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়ার মতো গুরুতর অস্তিত্ব সংকটও তৈরি করেছে। কিন্তু সেই অগ্রগতি যদি মানুষের মৌলিক জীবনধারণের অধিকার বিশুদ্ধ পানিকে হুমকির মুখে ফেলে, তাহলে উন্নয়নের সংজ্ঞাকেই নতুন করে ভাবতে হবে। কারণ প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ হতে হবে শুধু বুদ্ধিমান নয়, একই সঙ্গে সাশ্রয়ী, পরিবেশবান্ধব এবং মানবিক।
ড. এম. মেসবাহউদ্দিন সরকার : অধ্যাপক ও আইটি গবেষক, আইআইটি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।







