প্রকাশ : ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৪৩
ও মোর ময়না গো

অনেক সাধের ময়না আমার বাঁধন কেটে যায়
মিছে তারে শিকল দিলাম, রাঙ্গা দুটি পায়ে
বসির আহমেদের গলায় নায়করাজ রাজ্জাকের ঠোঁটে গাওয়া তুমুল জনপ্রিয় গান একটি। পুরানো গানগুলো আজও আমাদেরকে আবেগতাড়িত করে ভীষণভাবে।
আজ সকালে কলা, পাউরুটির অতি আবশ্যকতা নেই। থাকলে ভালো, না থাকলে নয়। সকাল হলে বেশির ভাগ দিনই পাউরুটি আর কলা ছিলো সকালের নাস্তা। অবশ্য ময়না আমাদের সাথে সবকিছুই খেতো। পোলাউর চালের ভাত, আলু সিদ্ধ, ডিম সিদ্ধ, ওয়ান মিনিটের ঘি আর কাঁচা মরিচ দিয়ে মেখে ফেনা ভাত খেতে আমার বাচ্চারাও খুব পছন্দ করে। ময়নাও পছন্দ করে। নুডলস খুব পছন্দ। ভাত মাছ, ডাল তো খুব ভালো খায়। মোটামুটি আমরা যা খাই, ও সবই খায়। তবে রুটি, মাংস ওকে খেতে দেখিনি।
অবশেষে ২২-৯-২০২৬ তারিখ সন্ধ্যা ছয়টা থেকে সাড়ে ছয়টার মধ্যে আমাদের ছেড়ে চলে গেলো ময়না। দুইদিন বাসায় ছিলাম না। এসে টের পেলাম ও খুব হাঁচি দিচ্ছে। বুঝতে পারলাম এসি চলেছে। ওকে ঢেকে দেওয়া হয়নি। ঠাণ্ডা লেগেছে। ওর শরীরটা বেশ কয়েক দিন আগ থেকেই খারাপ। রাতে ওকে খোলা বারান্দায় রেখে দিলাম। আগে প্রতিদিন স্নান করাতাম। শীতে ব্যতিক্রম হতো। কিন্তু ইদানীং স্নানটা কম করাতাম। সেদিন ভাবলাম করাবো। কিন্তু কাজের চাপে আর হয়ে উঠেনি। খাওয়াও খাচ্ছে না কথাও বলছে না। মুড়ি ধুয়ে চিনি দিয়ে খেতে দিলাম। পেট খারাপ হলে এ ধরনের খাবার দিতাম। ও খেয়েও নেয়। আজ খেলো না। পানির পাত্রটা ধুয়ে পানি দিলাম। বড়ো ছেলেকে বললাম, স্যালাইন দাও। ও পাখির ভিটামিন পানিতে মিশিয়ে দিলো। দেখলাম ভালোই খাচ্ছে।
চাঁদপুরসহ অন্যান্য অনেক মানুষ ফেসবুকের কল্যাণে জানে আমার একটা ময়না পাখি আছে। যে ময়নাটা অনেক সুন্দর করে কথা বলে। প্রথম দিন থেকেই ছোট ছেলের নাম ধরে ডাকে। সে ডাকটা ছিলো বিভিন্ন ধরনের। যখনই কেউ কলিংবেল বাজাতো তখন সে বলতো, ও সৌহার্দ্য... ও সৌহার্দ্য। ২/৩ বার একটু কঠিন স্বরে ডাকতো। আর যখন এমনি এমনি ডাকতো তখন সে আদুরে গলায় সুর করে সৌ-হা-র্দ্য বলে ডাকতো।
তোমার নাম কী? বললে বলতো, ‘ম-য়-না’। আর সে নিজেই জিজ্ঞেস করতো ‘তোমার নাম কী?’
আরেকটা কথা সে প্রায়শ বলতো ‘যাবি কবে?’
এটা নিয়ে একটা মজার ব্যাপার হয়েছিলো। আমাকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছিলো। বিদেশ থেকে আমার এক আত্মীয় এসেছে। আমার পিশতুতো ভাই, সঙ্গে তার স্ত্রী আর দুই ছেলেমেয়ে। ভাইটি আমার দেশেই থাকে। আমার থেকে একটু বড়। আমি তাকে নাম ধরেই ডাকি। ভাই তো আগে পরে অনেক এসেছে আমার বাড়িতে। কিন্তু বৌ, ছেলে, মেয়ে— এই প্রথম এলো। ছেলেমেয়ে ভালোই বড়।
দুপুরে এলো। আমি যথারীতি রান্না ঘরে। রান্না প্রায় শেষ পর্যায়ে। ময়না বারিন্দায়। আমার ছোট ছেলে দরজা খুলে দিয়েছে।
ওরা ৫/৬ দিন থাকার পর যখন আমাদের আন্তরিক একটা পরিবেশ তৈরি হয়েছে। যখন দেখলো আমরা সত্যিই ভালো। তখন ভাই বলছে, জানিস কী হয়েছিলো? আমি অবাক হয়ে তাকালাম। কী আবার হলো? ভাই বলে, প্রথম যেদিন নিচের থেকে লাগেজ নিয়ে উপরে উঠি, সবাই বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলাম তখন ময়না নাকি বলেছে, ‘যাবি কবে’? ছেলে অভি তো বলে, বাবা এটা কোথায় আনলে? ময়না কী বলে তুমি শুনলে না? ভাই তো লাগেজ তুলতেই ব্যস্ত। ছেলে অভি বলে পাখি বলে, ‘যাবি কবে?’ ভাই তার ছেলেকে পাত্তা না দিয়ে বলে, ধূর পাগল! তুই ভুল বুঝেছিস। কিন্তু ছেলের সন্দেহ রয়েই গেলো। ও ভেবেছে আমরা শিখিয়ে দিয়েছি। আমি তো হাসি আর চাপে রাখতে পারলাম না। লজ্জিতও হলাম।
ময়নাকে আমরা বলে কিছু শিখাতে পারিনি। ও প্রথম থেকেই নিজের খুশি মতোই কথা বলে। ‘ভালো আছি’ ‘কবে যাবি’ এগুলো সে প্রথম থেকেই বলে। শেষে যেটা শিখেছে সেটা হলো আমার নাম ধরে ডাকা। আমরা অবাক! আমাকে নাম ধরে সাধারণত কেউ ডাকে না। ও কোথা থেকে শিখলো? যাই হোক, ময়না আমাদের পরিবারের একজন সদস্য হয়ে উঠেছিলো।
যদিও ময়না আনার পিছনে আমার ছোট ছেলের আগ্রহ বেশি ছিলো। কিন্তু বর্তমান পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ময়নার প্রতি খুব বেশি টান আমার বড়ো ছেলের। ওকে রাত্রে বাহিরে রাখা যাবে না। ঘরে রাখতে হবে। এভাবেই চলছিলো আমাদের দিন। আশির দশকের লতাজীর সেই গান—
‘ময়না বলো তুমি কৃষ্ণ রাধে
তাকে মন দিতে যে চাই, কেমন বাঁধে
হো সয়না সয়না সয়না ওগো
সয়না এত জ্বালা সয়না
ঘরেতে আমার এ মন রয়না কেন রয়না রয়না।’
ময়নাকে নিয়ে কতো গান। কিন্তু একটি ময়না আমাদের সাথে সতের বছরের জীবন কাটালো। একান্তই আমাদের পরিবারের একজন হয়ে। কিন্তু সেই ময়নাকে ভালোবেসে অন্য কোন নাম দেইনি। ময়না নামেই ডেকেছি। আমরা কেউ অনুভব করিনি ওর একটি কাব্যিক নাম দরকার। কিন্তু তব্ওু তার মৃত্যু আমাদের জন্য বেশ কষ্টদায়ক। জীবন থেমে যায় না। জীবন বড়ো বিচিত্র। চারিদিকে কতো ঘটনা ঘটছে। কোনটি স্বাভাবিক, কোনটি বর্বরোচিত, অমানবিক। তবুও মানুষ ছুটছে। খাচ্ছে দাচ্ছে, ঘুমাচ্ছে। সেগুলো ভেবে মনে হয় স্বাভাবিক মৃত্যু বড়ো শান্তির বড়ো সুখের।
শেষ বিকেল। পাঁচটায় ওকে মাছভাত দিলাম। আমার নিজের হাতেই দিলাম। তখনও ও লাঠির উপর দাঁড়িয়ে ছিলো। আমি বললাম, ‘মাছ’ মাছ খাও। ও বুঝতো এবং খেয়েছে। আমাদের দুপুরের খাওয়া খেতে দেরি হয়ে গিয়েছিলো। ওর শরীর খারাপ। তখনও আমি বুঝনি এটাই ওর শেষ খাওয়া। সন্ধ্যায় সাড়ে ছয়টায় বারিন্দায় ধুপ দিতে গিয়ে দেখলাম ওর দেহটা লুটিয়ে পড়েছে খাঁচার ভিতর। চিৎকার করে উঠলাম।
খাঁচা থেকে বের করে আনলাম। একদম তাকিয়ে আছে আগের মতই। তার মানে কিছুক্ষণ আগেই ওর প্রানটা বের হয়েছে।পানি খাওয়াতে চেষ্টা করলাম, আমার ছেলেরা ময়নার বুকে পিঠে চাপ দিচ্ছে। না, ওর কোন সাড়া নেই। বড় ছেলে ডুকরে কেঁদে উঠলো। কিছুটা সময় স্তব্ধতা।
বড়ো ছেলেকে নিয়ে ‘বেস্ট বাই’ তে গেলাম। না, মাপ মতো গাছের টব পেলাম না। চলে গেলাম নার্সারিতে। টব, ফুলের গাছ, মাটি কিনতে হবে। ফুলের চয়েজ ছিলো স্থলপদ্ম। এতো স্নিগ্ধ ফুল! আজকাল খুব কম দেখা মেলে। খোঁজ করলাম একটি স্থলপদ্ম ফুল গাছ। নাহ্, পেলাম না। শেষমেশ একটি কলিসহ থাই জবা, বড় টব আর মাটি নিয়ে এলাম। তারপর ওকে মাটিতেই শুইয়ে দিয়েছি। গাছ স্থাপন করেছি। ওর শেষকৃত্য বারিন্দাতেই করেছি।
ঝর ঝর ঝর দু নয়নে ঝর ঝর ঝরায়ে
কেন থাক বিষাদে মন ভরায়ে
যা কিছু হারায়ে গেল যাকনা
নীল আকাশে মেলে পাখনা
ও মোর ময়না গো
লতার এই হৃদয় ছোঁয়া গান প্রত্যেকটি বাঙালির হৃদয় ছুয়ে গেছে।
আমাদের বড়ো মনে পড়ছে ময়না পাখির কথা। সবাই বলেছে ওকে কেন খাঁচায় বন্দী করে রেখেছি। কেন ছেড়ে দিই না। মুক্ত আকাশে ও ঘুরে বেড়াবে। কিন্তু কেউ তো বুঝেনি ও কতোটা উড়তে পারে। আমি ছেড়ে দিলে অন্য কারো হাতে পড়তো। হয়তো সতেরো বছরের জীবন হতো, বাকি সাতদিনের। বা কোন কুকুর বেড়ালের পেটে চলে যেতো। ময়না আমাদের সাথে সতেরো বছর ছিলো। আমরা ভালো ছিলাম। দূরে কোথাও বেড়াতে গেলে ওকে ঢাকায় নিয়ে যেতাম। দিদি বা দাদার বাসায় রেখে আমি বেড়াতে যেতাম। আজ আর কোন বন্ধন নেই। আমার মা বলতো, নাড়ি ছেড়া সন্তান মারা যাওয়ার পর চার দিনের দিন মা মুখে খাবার তোলে—কথাটা অনেক সত্যি। তাই জীবন বহমান।
তৃপ্তি সাহা : লাইব্রেরি উন্নয়ন কর্মকর্তা (প্রাক্তন), মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর, বাংলাদেশ ঢাকা।








