প্রকাশ : ০১ আগস্ট ২০২৬, ০০:৩৪
রত্নগর্ভা মায়ের স্মৃতিতে ১৮ বছর
সংগ্রাম, মমতা ও ভালোবাসার এক অনন্য আলোকবর্তিকার গল্প

রত্নগর্ভা মায়ের স্মৃতিতে ১৮ বছর
|আরো খবর
সংগ্রাম, মমতা ও ভালোবাসার এক অনন্য আলোকবর্তিকার গল্প
মূল স্মৃতিচারণ : অ্যাডভোকেট ইকবাল বিন বাশার (কালা বাশার)। সম্পাদনা ও উপস্থাপনা : অধ্যাপক মো. জাকির হোসেন, সিনিয়র সাব-এডিটর, দৈনিক চাঁদপুর কণ্ঠ চাঁদপুর।
কিছু মানুষ পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেও তাঁদের ভালোবাসা, আদর্শ ও কর্মের আলো থেকে যায় অনন্তকাল। তাঁরা বেঁচে থাকেন সন্তানদের স্মৃতিতে, তাঁদের নৈতিকতায়, তাঁদের জীবনযাপনের প্রতিটি অধ্যায়ে। এমনই একজন মানুষ ছিলেন রত্নগর্ভা মা জাহানারা বেগম—যাঁর জীবনের গল্প কেবল একটি পরিবারের ইতিহাস নয়, বরং সংগ্রাম, ত্যাগ ও অপরিসীম মমতার এক অনন্য দলিল।
২০০৮ সালের ১ আগস্ট। চাঁদপুর সদর হাসপাতালের একটি নীরব কক্ষে পরিবারের সদস্যদের চোখের সামনে থেমে যায় তাঁর জীবনযাত্রা। যে মায়ের স্নেহের ছায়ায় বড় হয়েছে একটি বিশাল পরিবার, যাঁর অক্লান্ত পরিশ্রমে গড়ে উঠেছে নয়টি সন্তান—সেই মা চলে যান না ফেরার দেশে। পরদিন শ্রীপুর গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে স্বামী আবুল বাশার সাহেবের পাশে তাঁকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়।
আজ ১৮ বছর পরও তাঁর সন্তানদের কাছে সেই দিনটি যেন গতকালের ঘটনা। মায়ের স্মৃতি তাঁদের হৃদয়ে এখনো জীবন্ত। কারণ মা শুধু জন্মদাত্রী ছিলেন না; তিনি ছিলেন তাঁদের জীবনের প্রথম শিক্ষক, পথপ্রদর্শক এবং সবচেয়ে বড় আশ্রয়।
অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী থেকে সংগ্রামী জীবনসঙ্গী
খুব অল্প বয়সেই তাঁর জীবনের মোড় পরিবর্তন হয়। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় তিনি সেনা কর্মকর্তা আবুল বাশার সাহেবের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। বিয়ের পর শুরু হয় নতুন জীবন। চাঁদপুর শহরের আলিম পাড়ায় পিত্রালয়ে থেকে তিনি সংসার শুরু করেন। স্বামী চাকরির প্রয়োজনে বাইরে থাকতেন। ফলে সংসারের বড় অংশের দায়িত্ব এসে পড়ে তাঁর কাঁধে। কিন্তু তিনি ছিলেন দৃঢ়চেতা। সংসারের দায়িত্ব পালন করেও নিজের শিক্ষার প্রতি আগ্রহ হারাননি। কঠোর পরিশ্রম করে তিনি মেট্রিক পাস করেন এবং শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত হন। চাঁদপুরের ঐতিহ্যবাহী লেডি প্রতিমা মিত্র বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে তাঁর কর্মজীবনের সূচনা হয়।
একজন মা, একজন শিক্ষক, একজন যোদ্ধা
আজকের দিনে যে সুযোগ-সুবিধাকে আমরা স্বাভাবিক বলে মনে করি, কয়েক দশক আগে তা ছিলো অনেকের কাছে স্বপ্নের মতো। বিদ্যুৎ নেই, গ্যাস নেই, পর্যাপ্ত পানির সুবিধা নেই—এমন বাস্তবতার মধ্যেই তিনি সন্তানদের মানুষ করেছেন। একটি সাধারণ টিনের ঘরে বসবাস করে তিনি একদিকে সন্তানদের লালন-পালন করেছেন, অন্যদিকে শিক্ষকতার দায়িত্ব পালন করেছেন। ভোরে ঘুম থেকে ওঠা, নামাজ আদায় করা, সন্তানদের খাবার তৈরি করা, স্কুলে পাঠানো, নিজের কর্মস্থলে যাওয়া—দিনের প্রতিটি মুহূর্ত ছিল তাঁর সংগ্রামের অংশ। তবুও তাঁর মুখে ছিল হাসি। সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে তিনি কখনো ক্লান্তিকে গুরুত্ব দেননি। সন্তানদের শিক্ষাই ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় স্বপ্ন। এই মায়ের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন ছিল সন্তানদের শিক্ষিত করে গড়ে তোলা। তিনি বিশ্বাস করতেন, শিক্ষা মানুষকে সম্মানজনক জীবন দেয়। নিজে শিক্ষকতা করার পাশাপাশি তিনি নিজের পড়াশোনাও চালিয়ে যান। বড় ছেলে লে. কর্নেল (অব.) খাইরুল বাশার বাবুল যখন চাঁদপুর কলেজে উচ্চ মাধ্যমিকে পড়াশোনা করছিলেন, তখন তাঁর বই পড়ে মা নিজেও পরীক্ষার প্রস্তুতি নেন। একসময় বড় ছেলের সঙ্গে একই সময়ে প্রাইভেট পরীক্ষায় অংশ নিয়ে তিনি আই. এ. (উচ্চ মাধ্যমিক) পাস করেন। সন্তানের সঙ্গে মায়ের একই শিক্ষাযাত্রার এই ঘটনা শুধু পরিবারের জন্যে নয়, যে কোনো মানুষের জন্যে অনুপ্রেরণার। পরবর্তীতে তিনি বি.এ., বি.এড এবং এম.এ. ডিগ্রি অর্জন করেন। নয় সন্তানের জননী হয়ে, সংসার সামলে, শিক্ষকতা করে এবং নিজের উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করা—এ এক বিরল উদাহরণ।
মুক্তিযুদ্ধের সময় মায়ের হৃদয়ের আর্তনাদ
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল সময়ে বড় ছেলে পাকিস্তানে অবস্থান করছিলেন। অন্যদিকে ছোট ছেলে দেশমাতৃকার মুক্তির জন্যে যুদ্ধে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। সেই সময় একজন মায়ের হৃদয়ের গভীর ভয় ও ভালোবাসা তাঁকে থামিয়ে দেয়। মায়ের কাছে সন্তানই ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সম্পদ। পরিবারের ভবিষ্যৎ চিন্তা করে তিনি সন্তানের কাছে আকুতি জানিয়েছিলেন। একজন মায়ের সেই ভালোবাসা ও উদ্বেগ আজও পরিবারের কাছে এক আবেগময় স্মৃতি।
সন্তান হারানোর বেদনা নিয়েও দায়িত্বে অবিচল
জীবনে বহু কঠিন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে তাঁকে। ছোট দু কন্যাসন্তান আইরিন ও ফাতেমাকে অল্প বয়সে হারানোর বেদনা তাঁকে সহ্য করতে হয়েছে। একজন মা হিসেবে সেই কষ্ট ছিল অসহনীয়। কিন্তু তিনি ভেঙে পড়েননি। নিজ হাতে সন্তানদের শেষ বিদায়ের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেও তিনি অন্য সন্তানদের জন্য শক্ত থেকেছেন। ১৯৯১ সালে স্বামীকে হারানোর পরও তিনি সন্তানদের আগলে রেখেছেন বটবৃক্ষের মতো।
নৈতিকতার পাঠ দিয়েছিলেন যে মা
সন্তানদের কাছে, সে মায়ের সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল তাঁর সততা ও নীতি। তিনি শিখিয়েছেন—অন্যায়ের সঙ্গে আপস করা যাবে না, কারও অধিকার নষ্ট করা যাবে না, অসৎ পথে জীবনে সফলতা আসে না। আজ তাঁর সন্তানরা গর্বের সঙ্গে বলেন, মায়ের সেই শিক্ষা তাঁরা জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ হিসেবে ধারণ করে চলেছেন।
সময় চলে যায়, মায়ের স্মৃতি থেকে যায়
সময় তার নিজস্ব নিয়মে এগিয়ে চলে। পরিবারে এসেছে অনেক শূন্যতা। মেজ ছেলে জিয়াউল বাশার বাদল ইতালিতে মৃত্যুবরণ করেছেন। ছোট ছেলে ইবনুল বাশার খোকন করোনাকালে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। বড় ছেলে অসুস্থ। অ্যাডভোকেট ইকবাল বিন বাশারও শারীরিক সমস্যার মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছেন। পরিবারের অন্য সদস্যরাও নানা বাস্তবতার মুখোমুখি। তবুও তাঁদের জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি—মায়ের শিক্ষা, ভালোবাসা ও দোয়া।
মায়ের জন্য দোয়ার আহ্বান
১ আগস্ট ২০২৬, শনিবার বাদ আসর শ্রীপুর গ্রামের বাড়ির জামে মসজিদে মরহুমার রুহের মাগফিরাত কামনায় দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে। পরিবারের পক্ষ থেকে আত্মীয়-স্বজন, শুভাকাঙ্ক্ষী ও পরিচিত সকলের কাছে মরহুমার জন্যে দোয়া কামনা করা হয়েছে।
মা পৃথিবীর সবচেয়ে মধুর শব্দ। মায়ের ভালোবাসার ঋণ কখনো শোধ করা যায় না। সন্তানদের কাছে তিনি আজও সেই আগের মতোই জীবন্ত—স্মৃতিতে, ভালোবাসায় এবং প্রার্থনায়। আল্লাহ তাআলা এই রত্নগর্ভা মাকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন।
সম্পাদকীয় নোট : এই ফিচারটি অ্যাডভোকেট ইকবাল বিন বাশার (কালা বাশার)-এর ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ অবলম্বনে সম্পাদিত ও পত্রিকার পাঠকদের জন্যে উপস্থাপন করা হয়েছে। ডিসিকে /এমজেডএইচ







