সোমবার, ২২ জুন, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ২২ জুন ২০২৬, ১২:২৬

সাইকোলজিকাল থ্রিলার ছায়া শিকারি

মিজানুর রহমান রানা
সাইকোলজিকাল থ্রিলার ছায়া শিকারি

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

তিন.

হাজার কামান যাকে শেষ করতে পারে না, কিন্তু সম্মিলিত কিছু মানুষের মুখের শব্দ ও প্রতিবাদ তারচেয়ে বেশি ধ্বংস ডেকে আনতে পারে। শাসকগোষ্ঠী তাই দেশের মানুষের কণ্ঠনালী চেপে রেখেছে, যাতে তারা দিনের পর দিন মানুষকে বোকা বানিয়ে শাসন ও শোষণ করে যেতে পারে নিশ্চিন্তে।

শব্দ প্রতিরোধী পুলিশ সারাদেশে আধুনিক যন্ত্রপাতি নিয়ে দিন-রাত চব্বিশ ঘণ্টা পাহারা দেয়, কেউ শব্দ করলো কি-না?

এদিকে সেই টেপটি নিয়ে কাজ করছিলো ইরফান ও তার দল। তারা শুনতে পায় এটি যেনো শুধু আরাধের কণ্ঠ নয়, এক সংকেতও ছিলো, যার ফ্রিকোয়েন্সি শহরের মানচিত্রে একটি জায়গাকে নির্দেশ করেছিলো।

নির্জন এক পাতাঝরা পার্কের শেষ প্রান্তে, ধ্বনি-পুলিশের রাডারের বাইরে থাকা পুরানো পাতাল ট্রেনের টানেল।

দ্রুত ইরফান আর বৃষ্টি সেখানে পৌঁছায়, আর নিচে নেমে দেখে দেয়ালে আঁকা একটি চিহ্ন: ∴ শূন্যস্বরে শপথ ∴ অভ্যন্তরে অপেক্ষা করছিলো তিনজন মুখোশপরা মানুষ। কারও মুখ দেখা যায় না, কিন্তু তাদের কণ্ঠহীন ইশারা স্পষ্ট, “শব্দ নয়, সঙ্কেত দিয়েই আমরা বেঁচে থাকি। আমরা সেইসব মানুষ, যাদের কণ্ঠ হারিয়েছে নীতির নামে।”

তারা নিজেদের পরিচয় দেয় ‘ধ্বনি-গুহা’ নামে। তাদের মতে, শব্দ একসময় মানুষের অস্তিত্বের কেন্দ্র ছিলো, কিন্তু ক্ষমতার ভয়েই তা নিষিদ্ধ করা হয়।

এক সদস্য ইরফানকে একটি পুরনো খাতা দেয়, আরাধের হাতে লেখা ডায়েরি। তার ভেতর লেখা: “শব্দ মানে শুধু উচ্চারণ নয়, শব্দ মানে অতীতের স্মৃতি, ভবিষ্যতের সম্ভাবনা। এই শহরে সেই সম্ভাবনাকেই মুছে দেওয়া হচ্ছে।”

রুবিনা ভাবে, তাসফিয়ার বুক চিরে নিঃশ্বাস বের হয়ে যায়। তখনই তাদের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, একটি নতুন ‘নিঃশব্দ বিপ্লব’ হবে, যেখানে শব্দ থাকবে না, কিন্তু প্রতিধ্বনি হবে। ছবি, স্পর্শ, চিহ্ন, ছায়া--এইসব দিয়ে প্রতিরোধ তৈরি হবে। শব্দহীন শব্দ, এটাই হবে অস্ত্র।

গুহার শেষ প্রান্তে এক নারীর ছায়া এগিয়ে আসে। চোখে শান্ত আঁধার, হাতে একটা বক্স। তিনি নিজেই পরিচয় দেন, “আমি নাহার। আমার কণ্ঠ কউ কখনো শোনেনি, কিন্তু আমি শব্দ শুনি ত্বকে, প্রাচীন গান, হারানো প্রার্থনা, রুদ্ধ হাহাকার।”

ইরফান বিস্মিত। সে শান্তভাবে নাহারের কাছে এগিয়ে যায়, মুখের মাস্কটা খুলে ফেলে। নাহার তখন বক্স খুলে এক যন্ত্র দেখায়, একটি অদ্ভুত পেনড্রাইভ, যার নাম ‘স্পন্দনচিত্র’।

ইরফান এবার বুঝতে পারে, এটি মূলত ছুঁয়ে দেখা যায় এমন সংগীত। কেবল বধির নয়, নিঃশব্দ জীবনে বাস করা প্রত্যেক মানুষের অনুভবের মানচিত্র।

“আমরা গান গাই না, আমরা কাঁপন আঁকি। এই পেনড্রাইভে রয়েছে অতীতের সেই প্রতিধ্বনি, যেগুলো প্রশাসনের রেকর্ড রুম থেকে চুরি করে এনেছিলো আরাধ। এই আমাদের অস্ত্র।” নাহার স্পষ্ট করে, ‘ধ্বনি-গুহা এখন আর শুধু আশ্রয় নয়, এটি হবে পরিকল্পনার কেন্দ্র। শহরের বিভিন্ন ‘মৃত চিহ্ন’-পুরনো ফোন বুথ, বন্ধ লাইব্রেরি, তালাবদ্ধ মন্দির-গির্জা--এগুলো হবে নিঃশব্দ বিপ্লবের স্নায়ু।

একটি শেষ কথা বলে সে, “ইরফান, তুমি মেডিকেলের ছাত্র হলেও মূলত একজন বিপ্লবী কবি। এখন তোমার কণ্ঠ নয়, তোমার সৃষ্টিই আমাদের নতুন ভাষা হবে।”

রাতের শহরে এখনো যান্ত্রিক নিঃশব্দতা, কিন্তু পাতাল টানেলের ভেতরে একটি নতুন ভাষা জন্ম নিচ্ছে। ইরফান নাহারের দেওয়া ‘স্পন্দনচিত্র’ পেনড্রাইভ খুলে বসে। সেটির ভিতর একেকটি স্পন্দন যেন হারানো সুরের পাথর, তাতে হাত রাখলে তার মস্তিষ্কে ফুটে ওঠে শব্দহীন একেকটি কবিতা।

সে সেগুলো লিখে নেয়। না, কাগজে নয়, পাথরের ওপর, গায়ে ছোপ দেওয়া প্রাচীন মসজিদের দেয়ালে, পরিত্যক্ত বাসস্ট্যান্ডের সিঁড়িতে, একলা দাঁড়িয়ে থাকা ল্যাম্পপোস্টের গায়ে।

প্রথম কবিতাটি লেখা হলো এক পুরনো লাইব্রেরির দরজায়, যেখানে ধূলোমাখা বইয়ের স্তূপের নিচে একটা বার্তা ছিলো : “আমরা যারা কথা বলি না, তার মানে এই নয় যে আমরা শুনি না। আমাদের চুপ থাকাও একধরনের চিৎকার।”

সেই রাতে শহরের তিন জায়গায় গুজব ছড়ায়, এক মা তার বধির সন্তানের মুখে অঝোর অশ্রু দেখে, এক বৃদ্ধা বন্ধ রেডিওর পাশে বসে হঠাৎ কেঁদে ফেলেন, এক নিরাপত্তারক্ষী শুনতে পান নিজের বুকের স্পন্দন বহু বছর পর।

‘ধ্বনি-পুলিশ’ ব্যাপারটা বুঝতে পারে না। তারা শব্দ খোঁজে, আওয়াজের ট্রেসিং করে, কিন্তু এ যে নিঃশব্দ প্রতিধ্বনি-- তাদের যন্ত্রপাতির বাইরে।

নাহার একদিন ইরফানকে বলে, “যখন তুমি শব্দহীন সুর লেখ, তখন শহর একটু একটু করে ফিরে পায় তার হারানো কান্না। এটাই শুরু, কবি... এটাই বিপ্লবের শুরু।”

তাসফিয়াও পাশে ছিলো, সে ইরফানকে বলে, ‘ইরফান তুমি শব্দহীনতার জন্যেই প্রথমে একটি কবিতা লিখো, আমি সেই কবিতাকে বিপ্লবের সুর হিসেবে ফুটিয়ে তুলবো।’

ধীরে ধীরে ইরফান খাতাটি হাতে নেয়, তারপর লিখতে থাকে, ‘আমি লিখি না, আমি ছুঁয়ে দিই চোখের পাতায় জমে থাকা এক বিন্দু কাঁপন। যেখানে শব্দ নেই, সেখানে জন্ম নেয় একটি ভাষা, ছায়ার মতো, নিঃশ্বাসের মতো, অথবা হারিয়ে যাওয়া কারও নামের মতো নরম। আমি বলি না, আমি জ্বালাই একটি নিঃশব্দ প্রদীপ, যার আলো পড়ে মৃত ফোনবুথের গায়ে, আর জেগে ওঠে পুরানো কথোপকথন। আমার কবিতা কাগজে নয়, সে হাঁটে, বাসস্ট্যান্ডের সিঁড়ি বেয়ে, একলা দাঁড়িয়ে থাকা ল্যাম্পপোস্টের গায়ে, ধূলোমাখা লাইব্রেরির দরজায়। আমি গান গাই না, আমি কাঁপন আঁকি ত্বকে, হাড়ে, ভাঙা দেয়ালের ফাঁকে ফাঁকে। আমরা যারা কথা বলি না, তারা শুনি, তোমার চুপ থাকা, তোমার চোখের ভাষা, তোমার বুকের স্পন্দন। এটাই আমাদের বিপ্লব, নিঃশব্দ, কিন্তু অনিবার্য। একটি প্রতিধ্বনি, যা কোনো যন্ত্রে ধরা পড়ে না, কিন্তু হৃদয়ে বাজে, অন্তহীন এক সুর হয়ে।’

ইরফানের কবিতা পড়ে নাহারের ভেতরে আগুন জ্বলে উঠে আর তাসফিয়ার বুকের স্পন্দনে একটা গভীর অনুরাগের জন্ম নেয়। সে ইরফানকে কানে কানে বলে, ‘তোমার কবিতা জ্বালিয়ে দেবে দেশ, শহরময়। আর আমার জীবনের অন্ধকারে আলোর সূচনা। আমি জানি না তোমাকে কীভাবে বলবো, তোমাকে আমি পরম মমতায় কথা শেখাতে পারি, কিন্তু তোমার লেখা তো জ্বলন্ত আগুন, যা আমার শেখানো কথার চাইতেও ধারালো ও জোরালো হবে। তুমি কি এই দেশকে ছাড়া আর কিছুই ভাবতে পারে না?’

ইরফান তাসফিয়ার কথা শোনে। তারপর খাতায় লিখতে থাকে, ‘আমার জন্মই হয়েছে এই দেশটাকে, সাধারণ মানুষগুলোকে নিঃশব্দতার আড়াল থেকে মুক্ত করে তাদের সাহস, শক্তি আর মনোবল ফিরিয়ে দেওয়ার জন্যে, তোমরা কি আমার পাশে থাকবে নির্ভয়ে?’

তাসফিয়া ইরফানের খাতায় লেখা মর্মবাণী বুঝতে পারে, তারপর ইরফানের হাতে হাত রেখে বলে, ‘যদি জীবনের সব সিদ্ধান্ত তোমাকে ঘিরেই নিতে হয় তাহলেও আমি তা করবো, আর যদি তোমার মুখে ভাষার বিচ্ছুরণ ঘটাতে হয় তাও আমি করবো, আমার ভালোবাসাই তোমাকে খাতায় লেখা ছেড়ে কথা বলতে শেখাবে। তুমি একদিন কথা বলবে, আর সেই আওয়াজে সারাদেশের সমস্ত ঘুমন্ত মানুষ জেগে উঠবে আর শাসকদল তোমার আওয়াজে তাদের জীবনের কঠিন আচ্ছাদনে পড়ে যাবে।’

রাতে আবারও বের হয় জামশেদ। সাথে তার বাহিনী। মেডিকেল কলেজের হোস্টেলে তারা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। হোস্টেলের পেছনে আরেকটা লাশ পাওয়া যায়। টর্চের আলোতে দেখা যায় এই কলেজেরই ছাত্র--সেলিম। আবারও জামশেদ সবাইকে জড়ো করে জিজ্ঞাসা করে, ‘একে খুন করেছে কে?’

সবাই একে অপরের মুখের দিকে তাকায়। ইরফান ভাবে, এগুলো অন্দর মহলের কাজ নয়। এগুলো নিশ্চয় রাষ্ট্রীয় বাহিনীর কাজ, যারা তাদেরকে ভয় দেখাচ্ছে বিপ্লবের পথ থেকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য।

জামশেদ চিৎকার করে সবাইর উদ্দেশ্যে বলে, ‘এখানে অন্য কেউ আসেনি। এগুলো তোমাদেরই কাজ। আর যদি একটা খুন হয়, তাহলে তোমাদের সবাইকেই জেলে যেতে হবে।’ (চলবে)

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়