প্রকাশ : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:১৯
ধারাবাহিক স্মৃতিকথা
বড়বেলার স্কুলজীবন

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
দুপুর সাড়ে ১২ টা বাজে। আজ রাত ও সকাল মিলিয়ে প্রায় ৮ ঘন্টা ঘুমিয়েছি। অনেকদিন হলো এতো লম্বা সময় ধরে ঘুম হয় না। ঘুম থেকে উঠে আবার ঘুমাতে ইচ্ছে করছে। স্কুল বন্ধ, তাই নিয়ম করে ধরা বাঁধা কোনো কাজ নেই। তবে এই ছুটিতে বিভিন্ন সময়ে আমার লিখা কবিতাগুলো নানা জায়গা থেকে এনে একসাথে করছি। বিছানার সাথেই টেবিলে রাখা ছিলো একটি ডুনাট। হাত বাড়িয়ে ডুনাট নিয়ে প্যাকেটটা খুলে খেয়ে আবার ঘুম। এতো আরাম লাগছে ঘুমাতে। ঘড়ি দেখছি আর ঘুমাচ্ছি। ঘুমাতে ঘুমাতে সাড়ে তিনটা বেজে গেছে। ফোনে মেসেজ চেক করতে গিয়ে দেখলাম চার্চ থেকে এস্টার এসেছে ধর্মপ্রচারণা করার জন্য। খ্রিস্ট ধর্মের পক্ষ থেকে গড এর সুখবর মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়া। এস্টার মেয়েটা কোরিয়ান। অসম্ভব সুন্দরী, আচার ব্যবহার খুব ভালো, পিয়ানো বাজায় দারুণ সুন্দর করে। ওকে কল দিয়ে বললাম আমার ২০-২৫ মিনিট সময় লাগবে তোমার সাথে দেখা করতে। অপেক্ষা করতে পারবে আমার জন্য? সে হাসিমুখে বললো, অবশ্যই, এসো। আরও দেরি হলেও সমস্যা নেই। আমি ঘুম থেকে উঠে ফোনে আবার মেসেজ চেক করে শাওয়ার নিতে চলে গেলাম। দারুণ আরামের একটা হট শাওয়ার নিলাম। তড়িঘড়ি করে প্রস্তুত হলাম, গরম জামাকাপড় পরে নিলাম। জানালা দিয়ে বাইরে রোদ দেখা যাচ্ছে। তাই ওভারকোট নিই নি, নিই নি কোনো গ্লোভস ও মাস্ক। কিন্তু রাস্তায় নেমে মনে হলো ভুল করলাম। রাস্তা পার হচ্ছি আর নৃ -র কথা ভাবছি। কী আশ্চর্য! কী হয়েছে আমার! এগুলো ঠিক না একদম। আমার অন্যান্য কাজে মনোযোগ বাড়াতে হবে, কিন্তু একটা জিনিস মাথায় এভাবে গেঁথে যাওয়াটা খুব বিরক্তিকর। তবে এর একটা সমাধান আছে। যখন মন থেকে ঠিক করে নিবো, ঠিক আছে, আমার স্মৃতিশক্তি নষ্ট হয়ে যায় নি, একটা বিষয় বারবার মাথায় আসতে পারেই। আসুক, আমার কী! তাহলেই সব ঠিক। তবে আমি ভাবলাম, একটা কাজ করা যাক। লেখালেখির মধ্যে নিজেকে ব্যস্ত করে নেয়া যাক। কবিতা, গল্প এসব লেখা যেতে পারে। আমার এক বন্ধুকে ফোন করলাম। সে খুব ভালো লিখে। ওর মন মানসিকতা উদার প্রকৃতির। ওর সাথে আমি আমার জীবনের অনেক বিষয় শেয়ার করি। খুব ভালো বন্ধু আমার। ওর সাথে বিষয়টা শেয়ার করলাম। সে বললো, খুব ভালো চিন্তা, লিখো, যা ইচ্ছে লিখো। ব্রিটিশরা যেখানেই যেতো প্রতিদিনকার কাহিনি তারা লিখে রাখতো। সেই লেখাগুলো তাদের দেশে পাবলিশ করতো। জনগণ সেগুলো পড়তো। বিভিন্ন দেশ সম্পর্কে জানতো আর কোনো সমস্যা পেলে তার সমাধান করতো। এটা খুব ভালো হয়, তুমি কোরিয়ায় আছো, তোমার মনের অনুভূতিগুলো ভাষায় প্রকাশ করতে থাকো। আমি আশ্বস্ত হলাম। ভালো লাগলো ওর কথা শুনে।
স্কুলে একটা ওয়ার্কশপ শুরু হবে। দক্ষতা উন্নয়নের একটি ভালো উপায়। স্ট্যাটা, পাইথন ও আর শিখাবে। কিন্তু আমি কিছুটা কনফিউজড, তিন সপ্তাহের এই ওয়ার্কশপে যোগ দিবো কী না! এটা বাধ্যতামূলক কোনো কিছু না। প্রাক্তন কয়েকজন ছাত্রকে জিজ্ঞেস করলাম তাদের বেশিরভাগ আমাকে স্ট্যাটা নিতে বলছেন কারণ আগামী সেমিস্টারে আমি একটা কোর্স নিবো যেটায় স্ট্যাটা লাগবে। কিন্তু আমি স্ট্যাটা শিখবো কি না, এই কথা ভাবতে ভাবতে একটা ফোন কল এলো। বাংলাদেশ থেকে আমার এক প্রিয় মানুষ ফোন করেছেন। তিনি আমার খুবই প্রিয়, যদিও উনার সাথে আমার কখনো দেখা হয় নি এই জীবনে। দেখা হবে কী না তাও জানি না। আমাদের দুজনের এক কমন বন্ধুর মাধ্যমে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাঁর সাথে আমার পরিচয়। আমি যার কথা বলছি তাঁর নাম পান্না । তিনি ভীষণ সুন্দর করে কথা বলেন। তাঁর চিন্তাশক্তিও অনন্য ধাঁচের। তার সাথে কথা বলে একটা অন্য রকম ঘটনা শুনতে পেলাম। তাঁর পরিচিত একজন শিক্ষকের বাবার নামে একটি ধর্ষণ মামলা হয়েছিল। তাঁর বিরুদ্ধে এক কিশোরী মেয়েকে ধর্ষণর অভিযোগ। ধর্ষণের পরে ঐ কিশোরী গর্ভধারণ করেন এবং জন্ম নেয় একটি শিশু। শিক্ষকের বাবার ভাষ্যমতে এটি সাজানো মামলা। তিনি এই ধরনের কিছু করেন নি, ষড়যন্ত্র করে এই মামলা দেয়া হয় এবং নেগোসিয়েশন এর কথা বলে টাকা দাবি করা হয়। ঐ শিক্ষকের বাবা নেগোসিয়েশনে না যাওয়ায় তাকে জেলে যেতে হয়েছে। আদালত ডরমিটরি এসিস্ট্যান্ট নএ পরীক্ষা করার নির্দেশনা দিয়েছেন। তারা অপেক্ষা করছে ডরমিটরি এসিস্ট্যান্ট নএ পরীক্ষার রিপোর্টের জন্য। এর জন্য অপেক্ষা করতে হবে তিন মাস। তিনমাস শেষ হলো। রিপোর্ট এলো। রিপোর্টে এসেছে শিক্ষকের বাবার সাথে ঐ সন্তানের ডরমিটরি এসিস্ট্যান্ট নএ এর মিল নেই। তিনি বেখসুর খালাস পেয়েছেন। কিন্তু সব মিলে তার জীবন থেকে ৬ টি মাস কেড়ে নিয়েছে এই মিথ্যে মামলা। তবে এই ৬ মাসে অদ্ভুত এক ঘটনা ঘটেছে। শিক্ষকের বাবা একজন কুমোর, তিনি মাটি দিয়ে জিনিসপত্র বানান। অক্ষর জ্ঞান বলতে তিনি শুধু তার নাম লিখতে জানতেন। কিন্তু জেল থেকে বের হওয়ার পর তিনি লিখতে ও পড়তে পারছেন। জেলখানায় তার সাথে আরেকজন আসামী ছিলেন, তিনি তাকে লেখাপড়া শিখিয়েছেন। কী দারুণ অর্জন। ভীষণ ভালো লাগছে আমার।
ইসাডোরা, একজন কোরিয়ান নারী। উচ্চতা মঝারি ধরনের, গায়ের রঙ হলদেটে সাদা, যেমন কোরিয়ানদের হয়। তবে ইসাডরা ভীষণ চঞ্চল, স্বচ্ছ মনের অধিকারী। তার সাথে আমার পরিচয় তার স্বামীর মাধ্যমে। তার স্বামীর নাম সংসেইব গিল। যাকে আমরা স্কুলের প্রায় সবাই ব্রাদার গিল বলে ডাকি। আমাকে এক সন্ধ্যায় ডিনারের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন ব্রাদার গিল। সেই ডিনারে ইসাডোরা এসেছিলো তার দুই ছেলেকে নিয়ে। সুন্দর ও সুখী পরিবার। ইসাডোরার বড় ছেলে ইংরেজি শিখার জন্য কোরিয়া ছেড়ে ফিলিপাইনের ম্যানিলায় যাবে আগামী সপ্তাহে। কোরিয়ায় ইংরেজি শিখার খরচ অনেক বেশি ইসাডোরার ভাষ্যমতে। এবার আসা যাক ডিনারের বিষয়ে। ইসাডোরার স্বামী যেদিন আমাকে ডিনারের দাওয়াত দিলেন আমি সাথে সাথে সেই দাওয়াত কবুল করে নিলাম কিন্তু ঠিক ঐ সন্ধ্যায় যে আমি আরেকজনকে ডিনারের দাওয়াত দিয়েছি তা বেমালুম ভুলে গেছি। আমি যাকে দাওয়াত দিয়েছি সে আমার বন্ধু রবার্ট। তার দেশ ক্যামেরুন। সে ক্যামেরুনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অফিসার। সদ্য কেডিআই স্কুল গ্রাজুয়েট। আমার খুব ভালো বন্ধু। আমাকে নানা বিষয় নিয়ে সাহায্য করেছে। তার করা সাহায্যের লিস্ট অনেক লম্বা। তাই ভেবেছিলাম রবার্ট চলে যাওয়ার সময় তাকে নিয়ে একবার ডিনার করি। কিন্তু এবার গন্ডগোল পাকিয়ে ফেললাম দুই ডিনার নিয়ে। আমি ইসাডোরার স্বামীকে কল করলাম। শেয়ার করলাম আমার বন্ধুর সাথে ডিনার করার বিষয়টি। তিনি এই কথা শুনে নির্দ্বিধায় খুশিমনে আমন্ত্রণ জানালেন রবার্টকেও। রবার্ট আর আমাকে ইসাডোরার স্বামী কেডিআই ডরমিটরি থেকে গাড়ি করে রেস্টুরেন্টে নিয়ে গেলো। ইসাডোরার পছন্দের থাই রেস্টুরেন্ট। ইসাডোরা বারবার বলছিলো, রেস্টুরেন্ট দেখতে সুন্দর না কিন্তু খাবার অনেক সুস্বাদু। তার কথা পুরোপুরি ঠিক। ইসাডোরা আমাকে জিজ্ঞেস করছিলো কোন খাবার অর্ডার করা যায়, কিন্তু আমি পুরো দায়িত্ব তার উপর দিয়ে নির্ভার। আজই তার সাথে প্রথম দেখা কিন্তু ভীষণ আপন মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছিলো তাকে ভরসা করা যায়। ইসাডোরার বোনের ছেলেও আমন্ত্রিত এই ডিনারে। ইসাডোরা, তার স্বামী, দুই ছেলে, ইসাডোরার বোনের ছেলে, রবার্ট ও আমি, দারুণ একটা ডিনার পার্টি হলো। গল্প হলো, আড্ডা হলো। খাওয়া শেষ, বিল পরিশোধও শেষ। এবার রবার্ট বললো তার একটা খাবার ভীষণ ভালো লেগেছে সে এটা বাসায় নিয়ে যেতে চায়। আগে থেকে অর্ডার না করলে পাওয়া যাবে কী না জানতাম না, তবে আমি ঠিক করলাম একটা কিছু ব্যবস্থা করেই ফেলবো। কাউন্টারে গিয়ে ম্যানেজারকে বুঝিয়ে রবার্টের প্রিয় খাবার সাথে করে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করে ফেলেছি নিমিষেই। আমাদের হাতে সময় নেই, ফিরতে হবে তাড়াতাড়ি। রবার্টের জন্য খাবারটা নিতে পেরে আমি ভীষণ আনন্দিত। রবার্ট ফোন করে ঐ খাবারের জন্য আমাকে আবার ধন্যবাদ জানিয়েছে। আর এদিকে ডিনারে যাওয়ার সময় রাস্তায় গল্পসল্প, গান শোনা, খাবারের মেন্যু সব মিলে দারুণ একটা সময় পার করতে পারায় কৃতজ্ঞতা জানালাম ইসাডোরা ও তার পরিবারকে। ইসাডোরাকে কেন যেন অনেকটা আমার বড় বোন বা মায়ের মতো মনে হয়।
ফোনের গ্যালারি ছবিতে টইটম্বুর। স্টোরেজ ঘাটতির কারণে ছবি তুলতে পারছি না। এমনকি ঐদিন ন্যাশনাল অ্যাগ্রিকালচারাল মিউজিয়াম অব কোরিয়া তে আরও ছবি তুলতে ইচ্ছে করছিলো কিন্তু পারি নি স্টোরেজ পূর্ণ হয়ে যাওয়ায়। ছবি ডিলিট করা শুরু করলাম। প্রায় সব ছবি ডিলিট করে দিয়েছি।
আমার এক বন্ধু কল দিয়ে বললো, তোমার বক্তব্য দাও। এটা তার স্বভাব। প্রায়ই ফোন করে এই কথা বলে। আর আমিও মনে যা আসে তাই নিয়ে অনেকক্ষণ কথা বলি। বন্ধুর নামটা না বলি। তার ধারণা তার নামে আর দ্বিতীয় কোনো ব্যক্তি বাংলাদেশ কেন পুরো পৃথিবীতে নেই। তার নামের দ্বিতীয় আরেকজনকে বের করতে পারলে ঐ ব্যাক্তিকে ১ হাজার ডলার দিবে। আমি চাই না আমার বন্ধুর ১ হাজার ডলার শুধু শুধু জলে যাক। সে যাই হউক, আজ আমার বক্তব্যের বিষয় ছিলো প্রেম। তাকে বললাম, আমি প্রেমে পড়েছি। যদিও এটি খুব স্বাভাবিক ও জৈবিক একটি বিষয় তবুও প্রেমে পড়া ভালো। প্রেমে পড়লে রক্তসঞ্চালন বাড়ে। ফেইস মাস্ক বা কোনো ক্রিম ছাড়াই চেহারায় উজ্জ্বলতা আসে। মনে উড়ু উড়ু একটা ভাব এসে ভিড় করে। ভীষণ আনন্দ লাগে। তার ভাষ্যমতে মানুষ প্রেমে পড়ে শারীরিক সম্পর্ক করার জন্য। আমি এই কথার সাথে একমত আবার কিছুটা দ্বিমতও আছে। আমার কাছে মনে হয় প্রেমে পড়া উচিত নিজেকে সমৃদ্ধ করার জন্য। সেখানে শারীরিক সম্পর্ক থাকতেও পারে আবার নাও পারে। তবে মানসিক সম্পর্ক অপরিহার্য। আমি অনেকদিন ধরে এমন একটা সঙ্গ খুঁজে বেড়াচ্ছিলাম। মনে হলো, পেয়েছি। বেশ অনেকদিন আগে দুটো লাইন লিখেছিলাম—
“প্রেমের জন্ম হৃদয়ে, মৃত্যুর জন্ম জীবনে,
আর জীবন হলো হরমোনের খেলা।”
প্রেম, জীবন, মৃত্যু, হরমোন সব একাকার। এগুলো না চাইলেও জীবনে চলে আসে। জীবন জীবনের মতো, কী সুন্দর বয়ে যেতে থাকে। নদীতে পানি থাকলে স্রোত আসে, বয়ে যেতে থাকে কিন্তু আগাছা, ময়লা স্রোতকে থামিয়ে দিতে পারে। জীবনের কোনো থেমে যাওয়া নেই। অনন্ত সময় তাকে বয়ে নিয়ে যায়, কিছুতেই থামানো যায় না, একমাত্র মৃত্যু, মৃত্যু মহাপরাক্রমশালী হয়ে এসে জীবনকে থামাতে পারে। তবুও পরকালে বিশ্বাসীগণ নতুন জীবন পান, পুনর্জন্মের মাধ্যমে।
আজকাল খুব মনে হচ্ছে দেশে চলে যাই, কিন্তু সম্ভব না। এদিকে দক্ষিণ কোরিয়ায় এসেছি আজ ঠিক সাড়ে ৪ মাস পূর্ণ হলো। ২০ আগস্ট, ২০২৩ তারিখে এসে পৌঁছেছিলাম এখানে, সাড়ে ৪ মাস- অনেক সময়, কিভাবে কেটে গেলো বুঝতেই পারি নি। কোরিয়ায় আসার রাস্তাটা তৈরি করাটাও খুব সহজ ছিলো না। অনেক খাট খড় পুড়িয়ে আসতে হয়েছে। কোরিয়ায় এসেছি আরেকটা মাস্টার্স করতে। আরেকটা বলছি কারণ আমি বাংলাদেশে ব্যবহারিক শিল্পকলা বিষয় নিয়ে একটি মাস্টার্স বেশ কয়েক বছর আগেই সম্পন্ন করেছি।
হীরামনি : উপজেলা নির্বাহী অফিসার, বান্দরবান সদর উপজেলা, বান্দরবান।
(চলবে, পরের পর্ব আগামী সংখ্যায় প্রকাশিত হবে)








