মঙ্গলবার, ০৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:১৮

মোবাইলের যুগে বই পড়ার অভ্যাস

মাহমুদ হাসান সজীব
মোবাইলের যুগে বই পড়ার অভ্যাস

প্রযুক্তির এই দ্রুত পরিবর্তনের যুগে মানুষের জীবনযাত্রা যেমন বদলেছে, তেমনি বদলেছে জ্ঞান অর্জনের পথও। একসময় বই ছিল অবসর, শিক্ষা ও চিন্তার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সঙ্গী। স্কুল-কলেজের লাইব্রেরি, পাড়ার পাঠাগার কিংবা বইমেলার স্টলে নতুন বইয়ের গন্ধ ছিল এক অন্যরকম অনুভূতি। কিন্তু স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং ডিজিটাল বিনোদনের বিস্তারের পর অনেকেই মনে করছেন, বই পড়ার অভ্যাস ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। প্রশ্ন হলো, সত্যিই কি বই পড়া কমে যাচ্ছে, নাকি পড়ার মাধ্যম ও ধরন বদলে যাচ্ছে?

আজকের পৃথিবীতে একটি স্মার্টফোন হাতে থাকলেই জ্ঞানের বিশাল ভান্ডারে প্রবেশ করা সম্ভব। ই-বুক, অডিওবুক, অনলাইন লাইব্রেরি এবং বিভিন্ন শিক্ষামূলক প্ল্যাটফর্ম বইকে আগের চেয়ে অনেক বেশি সহজলভ্য করে তুলেছে। আগে যে বই সংগ্রহ করতে সময় ও অর্থ ব্যয় হতো, এখন তার অনেকটাই কয়েকটি স্পর্শেই পাওয়া যায়। ফলে বলা যায়, বইয়ের অস্তিত্ব হারায়নি; বরং প্রযুক্তির হাত ধরে নতুন রূপে মানুষের কাছে পৌঁছেছে। তবে বাস্তবতার আরেকটি দিকও রয়েছে। বর্তমানে মানুষের অবসরের বড় অংশ দখল করে নিয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। কয়েক সেকেন্ডের ভিডিও, অবিরাম নোটিফিকেশন এবং দ্রুত বিনোদনের সংস্কৃতি আমাদের মনোযোগকে খণ্ডিত করে দিচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধরে একটি বই পড়ে বিষয়কে গভীরভাবে বোঝার যে অভ্যাস, তা অনেকের মধ্যেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। আমরা তথ্যের ভিড়ে থাকলেও প্রায়ই জ্ঞানের গভীরে পৌঁছাতে পারছি না।

বই পড়া শুধু তথ্য সংগ্রহের বিষয় নয়। একটি ভালো বই মানুষকে ভাবতে শেখায়, প্রশ্ন করতে শেখায় এবং নিজের অবস্থান নিয়ে আত্মসমালোচনা করতে শেখায়। সাহিত্য মানুষের অনুভূতিকে সমৃদ্ধ করে, ইতিহাস অতীত থেকে শিক্ষা নিতে সাহায্য করে, আর দর্শন ও বিজ্ঞান যুক্তিবাদী চিন্তার ভিত্তি গড়ে তোলে। তাই বই পড়ার অভ্যাস কমে যাওয়া মানে শুধু একটি শখ হারানো নয়; বরং চিন্তার পরিসর সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হওয়া।

তরুণ সমাজের ক্ষেত্রে এই বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান প্রজন্ম প্রযুক্তিতে দক্ষ, তথ্য সংগ্রহে দ্রুত এবং বিশ্ব সম্পর্কে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি সংযুক্ত। কিন্তু একই সঙ্গে ধৈর্য, মনোযোগ এবং গভীর পাঠের অভ্যাস ধরে রাখাও জরুরি। কারণ একজন দক্ষ পেশাজীবী হওয়ার পাশাপাশি একজন সচেতন নাগরিক এবং মানবিক মানুষ হয়ে ওঠার জন্য বইয়ের বিকল্প নেই। পাঠ্যবই পরীক্ষায় ভালো ফল এনে দিতে পারে, কিন্তু জীবনকে বুঝতে শেখায় বিভিন্ন ধরনের বই।

পরিবারও বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। শিশুরা বড়দের দেখে শেখে। যদি পরিবারের সদস্যরা নিয়মিত বই পড়েন, বই নিয়ে আলোচনা করেন এবং উপহার হিসেবে বই দেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তোলেন, তাহলে নতুন প্রজন্মও স্বাভাবিকভাবেই বইয়ের প্রতি আগ্রহী হবে। একইভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠাগারকে আরও প্রাণবন্ত করা, পাঠচক্রের আয়োজন করা এবং বইভিত্তিক সৃজনশীল কার্যক্রম বাড়ানো সময়ের দাবি।

প্রযুক্তিকে দোষারোপ করাও সমাধান নয়। বরং প্রযুক্তিকে বই পড়ার সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। যারা ব্যস্ততার কারণে মুদ্রিত বই পড়তে পারেন না, তারা ই-বুক বা অডিওবুকের মাধ্যমে পাঠচর্চা চালিয়ে যেতে পারেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ভালো বইয়ের আলোচনা, বই পর্যালোচনা এবং পাঠাভ্যাস নিয়ে ইতিবাচক উদ্যোগ তরুণদের উৎসাহিত করতে পারে। প্রযুক্তি তখনই কল্যাণকর, যখন আমরা তাকে সঠিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করি।

একটি বই কখনো শুধু কয়েকটি মলাটবন্দী পৃষ্ঠা নয়; এটি একটি সময়ের অভিজ্ঞতা, একজন লেখকের ভাবনা এবং অসংখ্য মানুষের জীবন থেকে আহরিত উপলব্ধির সংকলন। একটি ভালো বই একজন মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিতে পারে, তাকে আরও সহনশীল, যুক্তিবাদী এবং মানবিক করে তুলতে পারে। তাই বই পড়া কোনো বিলাসিতা নয়, এটি ব্যক্তিগত ও সামাজিক উন্নয়নের অপরিহার্য অনুশীলন।

সবশেষে বলা যায়, মোবাইলের যুগে বই পড়ার অভ্যাস পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি; বরং এটি একটি নতুন রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এখন আমাদের দায়িত্ব প্রযুক্তির সুবিধা গ্রহণের পাশাপাশি গভীর পাঠের ঐতিহ্যকে ধরে রাখা। প্রতিদিন যদি আমরা কিছু সময় বইয়ের জন্য বরাদ্দ করি, তবে জ্ঞানের আলো, সৃজনশীলতা এবং মানবিক মূল্যবোধ কখনোই ম্লান হবে না। কারণ প্রযুক্তি আমাদের তথ্য দিতে পারে, কিন্তু একটি ভালো বই আমাদের মানুষ হতে শেখায়।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়