রবিবার, ৩০ আগস্ট, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ৩০ আগস্ট ২০২৬, ০৮:৪৫

জনবল সঙ্কটে চাঁদপুর সদর মডেল মসজিদ, মাইক ছাড়াই আজান হচ্ছে কয়েক মাস

তাইয়্যেব
জনবল সঙ্কটে চাঁদপুর সদর মডেল মসজিদ, মাইক ছাড়াই আজান হচ্ছে কয়েক মাস

বিশাল পরিসর এবং নানান কারুকার্যে চমৎকার সৌন্দর্যে নির্মিত চাঁদপুর সদর মডেল মসজিদটি জনবল সঙ্কটের মধ্যে খুব একটা ভালো ব্যবস্থাপনায় চলছে না। মসজিদটি সরকারিভাবে পরিচালনা এবং দেখাশোনার দায়িত্বে থাকায় কোনো কিছু নষ্ট হলে তাৎক্ষণিক বা দ্রুত সময়ের মধ্যে মেরামত কিংবা নতুন ক্রয় করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। কারণ সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাজ, কোনো কিছু করতে হলে নিয়ম রক্ষা করে করতে সময় লাগে। অনেকটা সরকারি অফিসের ফাইল চালাচালি দীর্ঘসূত্রিতায় পড়ে যায়। এমনই একটি সমস্যায় কয়েক মাস যাবত ভুগছে চাঁদপুর সদর মডেল মসজিদ। মসজিদের মাইক নষ্ট হয়ে আছে কয়েক মাস। মেরামত করা কিংবা নতুন ক্রয় করা কোনোটাই হচ্ছে না। সরকারি প্রতিষ্ঠান বলে মুসল্লি বা স্থানীয় দানশীলরাও এখানে দান অনুদান দিতে আগ্রহী না। ফলে মডেল মসজিদে মাইক ছাড়াই আজান হচ্ছে কয়েক মাস।

দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের আজান না শোনা, নামাজ শেষে দ্রুত মসজিদের গেট ও ওয়াশরুম বন্ধ করে দেয়া এবং মসজিদ প্রাঙ্গণে অপরিষ্কার-অপরিচ্ছন্নতার অভিযোগও রয়েছে মুসল্লিদের।

চাঁদপুর গাছতলা ব্রিজের পাশে মনোরম পরিবেশে ২০২৩ সালে উদ্বোধন করা হয় সদর মডেল মসজিদটি। তবে উদ্বোধনের প্রায় তিনবছর পরও মসজিদের ব্যবস্থাপনা, পরিচ্ছন্নতা, মাইক, নিরাপত্তা ও জনবল নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে স্থানীয় মুসল্লিদের।

স্থানীয় কয়েকজন মুসল্লির অভিযোগ, কয়েক মাস ধরে মডেল মসজিদের আজানের শব্দ শোনা যায় না। অথচ মডেল মসজিদের আজানের সুমধুর ধ্বনিতে আশপাশের এলাকা মুখরিত হবে এবং মানুষ নামাজের জন্যে মসজিদের দিকে ছুটে আসবে, এমন প্রত্যাশা ছিলো। কিন্তু বর্তমানে আজানের শব্দ আশপাশের অনেক মানুষের কানে পৌঁছায় না বলে তাদের অভিযোগ। পার্শ্ববর্তী গুচ্ছগ্রামের কয়েকজনকে জিজ্ঞাসা করলে তারা বলেন, এ কয়েক মাসেই মডেল মসজিদের আজান শোনা যায় না।

গত ২০ আগস্ট ২০২৬ (বৃহস্পতিবার) রাজরাজেশ্বর চর এলাকা থেকে সদর মডেল মসজিদ দেখতে ও নামাজ আদায় করতে আসেন জহিরুল ইসলাম। তার অভিযোগ, তিনি নামাজরত অবস্থায় তাকে দ্রুত নামাজ শেষ করে বের হয়ে যেতে বলা হয়। একপর্যায়ে তিনি তাড়াহুড়ো করে নামাজ শেষ করে মসজিদ থেকে বের হয়ে আসেন বলে জানান।

এদিকে সরজমিনে মসজিদে গিয়ে দেখা যায়, মসজিদে প্রবেশের সিঁড়ির সামনের অংশে দীর্ঘদিনের ঘাস জমে প্রায় হাঁটুসমান হয়ে গেছে। সিঁড়ির পাশে ও প্রবেশপথের বিভিন্ন অংশেও অপরিচ্ছন্ন বালু জমে আছে। দীর্ঘ ঘাসের কারণে ওই অংশটি অনেকটা অনাদরেই পড়ে আছে বলে মনে হয়েছে।

মসজিদের মূল দরজা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে দ্বিতীয় তলায় ওঠার সিঁড়ির পাশেও একটি বটগাছের চারা জন্মে প্রায় তিন থেকে চার ফুট পর্যন্ত বড় হয়েছে। সামনের সিঁড়ির বিভিন্ন অংশে বালু জমে দাগ পড়েছে। সিঁড়ির শুরুর অংশেও ঘাস জন্মে প্রায় হাঁটুসমান হয়ে রয়েছে।

মসজিদে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হলেও তা বর্তমানে মনিটরে চালু নেই বলে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে। এছাড়া দুজন খাদেম থাকার কথা থাকলেও শুরু থেকেই একজন খাদেম রয়েছেন। মুসল্লি ও কর্তৃপক্ষ বলেন, জনবল সংকটের কারণে মসজিদের বিশাল স্থাপনা নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা যাচ্ছে না।

এসব বিষয়ে সদর মডেল মসজিদের সেক্রেটারি ও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের চাঁদপুর সদর সুপারভাইজার জুলফিকার মুরাদকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, মডেল মসজিদের নিরাপত্তার জন্যে সিসি ক্যামেরার বিষয়টি গণপূর্ত বিভাগ থেকে তাদের বুঝিয়ে দেয়া হয়নি। মসজিদের বিভিন্ন জিনিসপত্র গণপূর্ত বিভাগ থেকে কর্তৃপক্ষকে বুঝিয়ে দেয়া হয়নি, এর মধ্যে সিসি ক্যামেরাও রয়েছে বলে জানান তিনি। এ অবস্থায়ই মসজিদ উদ্বোধন হয়ে চালু হয়ে গেছে।

কয়েক মাস ধরে মাইক বন্ধ থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে জুলফিকার মুরাদ বলেন, তিনি বিষয়টি মসজিদ কমিটির সভাপতি সদর ইউএনওকে জানিয়েছেন। ইউএনও মহোদয় সম্ভবত গণপূর্ত বিভাগকে বিষয়টি জানিয়েছেন। মাইকের বিষয়ে তিনি আরও বলেন, এখানে যে মেশিন দেয়া হয়েছে, তার সঙ্গে কমপক্ষে ছয়টি হর্ন প্রয়োজন। কিন্তু হর্ন দেয়া হয়েছে চারটি। ফলে মাইকের কয়েল কেটে যায়।

মসজিদের গেইটের পাশে বটগাছের চারা জন্মানোর বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিষয়টি তার নজরে পড়েনি। তিনি অফিসের দরজা দিয়ে এবং মুসল্লিদের প্রবেশের দরজা দিয়ে যাতায়াত করেন, তাই বিষয়টি তার নজরে আসেনি বলে জানান।

খাদেমের বিষয়ে জুলফিকার মুরাদ বলেন, বর্তমানে একজন খাদেম রয়েছেন। তার মেরুদণ্ডে সমস্যা। আরও একজন খাদেম নিয়োগের জন্য তিনি ছয় থেকে সাত মাস আগে ইউএনও মহোদয়কে জানিয়েছেন। এমনকি সাক্ষাৎকারের জন্য তারিখও নির্ধারণ করা হয়েছিল। সহসা হয়তো আরেকজন খাদেম নিয়োগ হতে পারে।

নামাজশেষে মসজিদের গেট বন্ধ করে দেয়ার বিষয়ে জুলফিকার মুরাদ বলেন, জামাতে নামাজ শেষ হওয়ার পর মসজিদের ভেতরের অংশের দরজা বন্ধ করে দেয়া হয়, সামনের অংশ উন্মুক্ত থাকে। বিভিন্ন সময় মসজিদের কল, মিটারের তারসহ বিভিন্ন জিনিস চুরি হয়েছে বলেও জানান তিনি। এ কারণে নিরাপত্তার জন্য মূল মসজিদের অংশ বন্ধ রাখা হয় এবং বাইরের খোলা অডিটোরিয়াম অংশে মানুষ নামাজ পড়তে পারেন বলে জানান তিনি।

নামাজের পর ওয়াশরুম ও অজুর স্থান থেকে মুসল্লিদের দ্রুত বের করে দেয়ার অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, আগে এমন করা হতো, তবে এখন আর এমন হয় না। নিরাপত্তার বিষয়টি এখানে রয়েছে বলেও জানান তিনি।

মাইকের বিষয়ে আবার জানতে চাইলে জুলফিকার মুরাদ বলেন, তিনি গণপূর্ত বিভাগের মাধ্যমে মাইকটি ঠিক করাতে চান। এ বিষয়ে ইউএনও মহোদয়ের সঙ্গে কথা বলে আবার চিঠি দেবেন। মসজিদের জন্য তাদের আলাদা বাজেট দেয়া হয় না বলেও জানান তিনি। গণপূর্ত বিভাগ থেকে ফ্রিজ, ফটোকপি মেশিন, ব্লেন্ডার, প্রজেক্টরসহ আরও অনেক কিছু বুঝিয়ে দেয়া হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।

সিসি ক্যামেরার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করে জানাতে পারবেন। বর্তমানে সিসি ক্যামেরার বিষয়ে তিনি নিশ্চিতভাবে কিছু বলতে পারছেন না বলেও জানান।

এসব বিষয়ে ইমাম সাহেব বলেন, মডেল মসজিদে জনবল সংকট রয়েছে। মডেল মসজিদ স্থাপনের সময় ১৩জন জনবল থাকার কথা ছিল। কিন্তু বাংলাদেশের বিভিন্ন মডেল মসজিদে বর্তমানে চারজন করে জনবল রয়েছে বলে তিনি জানান। এখানে খাদেমের দুটি পদ থাকলেও বর্তমানে একজন খাদেম রয়েছেন। ওই খাদেমের বেতন ৭ হাজার ৫০০ টাকা। এতো বড় কমপ্লেক্সে একজন খাদেমের পক্ষে পুরো মসজিদ কমপ্লেক্স পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা কঠিন হয়ে যায় বলে জানান তিনি। মাইকের বিষয়ে তিনি বলেন, কয়েকবার মেকানিক দিয়ে মাইক মেরামতের চেষ্টা করা হয়েছে। এরপরও ভালো ফল পাওয়া যায়নি। মাইক ঠিক করতে অনেক টাকা প্রয়োজন বলেও জানান তিনি।

নামাজ শেষে গেট বন্ধ করার বিষয়ে ইমাম সাহেব বলেন, মসজিদের সরকারি সম্পত্তি বেশ কয়েকবার চুরি হয়েছে। একেকটি কলের দাম প্রায় ১ হাজার ৪০০ টাকা এবং লাইটসহ বিভিন্ন দামি জিনিস চুরি হয়েছে বলে জানান তিনি।

নিরাপত্তাকর্মীর বিষয়ে জানতে চাইলে ইমাম সাহেব বলেন, আগে একজন নিরাপত্তার বিষয়টি দেখতেন। তিনি ইসলামিক ফাউন্ডেশনের কর্মী ছিলেন, যিনি বর্তমানে বদলি হয়ে গেছেন।

সিসি ক্যামেরার বিষয়ে ইফার একজন কর্মকর্তা বলেন, প্রিপেইড মিটার থাকাকালে সিসি ক্যামেরা চালু ছিল। বর্তমানে কী কারণে এটি চালু করা হচ্ছে না, তা তিনি জানেন না। মসজিদ কমিটি রয়েছে এবং বিষয়টি মসজিদ কমিটিই দেখবে বলে জানান তিনি।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়