প্রকাশ : ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:২২
প্রাথমিক শিক্ষায় দ্বীনি শিক্ষা হোক

শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড, আর নৈতিকতা শিক্ষার প্রাণ। শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য কেবল ভালো ফলাফল অর্জন, উচ্চতর ডিগ্রি লাভ কিংবা অর্থ উপার্জনের যোগ্যতা অর্জন নয়; বরং একজন মানুষকে সৎ, আদর্শবান, নৈতিকতাসম্পন্ন ও মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা। এ ক্ষেত্রে দ্বীনি শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। বিশেষ করে শিশুর জীবনের প্রাথমিক পর্যায়, অর্থাৎ পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত সময়টি তার জীবন গঠনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এ সময়েই শিশুর মনে বিশ্বাস, নৈতিকতা, শিষ্টাচার ও ভালো-মন্দের পার্থক্য সম্পর্কে ধারণা তৈরি হয়।
তাই প্রত্যেক ছাত্র-ছাত্রীর জন্য প্রাথমিক পর্যায়ে পবিত্র কুরআন শিক্ষা, নামাজ, প্রয়োজনীয় দোয়া, মৌলিক দ্বীনি জ্ঞান, নৈতিকতা, আদর্শ চরিত্র ও ধর্মীয় মূল্যবোধ শিক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। প্রাথমিক স্তরে দ্বীনি শিক্ষার ভিত্তি মজবুত হলে পরবর্তী সময়ে একজন শিক্ষার্থী মাদরাসা কিংবা সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—যেখানেই পড়াশোনা করুক না কেন, সে নিজের ধর্মীয় পরিচয় ও নৈতিক আদর্শ ধরে রাখতে পারবে।
দ্বীনি শিক্ষা অর্জনের গুরুত্ব : ইসলাম মানুষকে জ্ঞান অর্জনের প্রতি বিশেষভাবে উৎসাহিত করেছে। দ্বীনি জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে মানুষ আল্লাহ তাআলাকে চিনতে শেখে, ইবাদতের নিয়মকানুন জানতে পারে এবং জীবনের সঠিক পথ সম্পর্কে ধারণা লাভ করে।
আল্লাহ তাআলা বলেন- অর্থ: “হে আমার রব! আমার জ্ঞান বৃদ্ধি করে দিন।” —সুরা ত্ব-হা, আয়াত: ১১৪।
এই আয়াত থেকে জ্ঞান বৃদ্ধির জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করার শিক্ষা পাওয়া যায়। একজন শিশুর শিক্ষাজীবনের সূচনালগ্ন থেকেই তার মধ্যে জ্ঞান অর্জনের আগ্রহ সৃষ্টি করা উচিত। পাশাপাশি তাকে এমন জ্ঞান দিতে হবে, যা তার বিশ্বাস, ইবাদত, চরিত্র ও দৈনন্দিন জীবনকে সুন্দর করে তুলবে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— অর্থ: “প্রত্যেক মুসলিমের ওপর জ্ঞান অর্জন করা ফরজ।” —সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ২২৪। তবে দ্বীনের অপরিহার্য জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলিমের দায়িত্ব-এ বিষয়টি ইসলামে সুপ্রতিষ্ঠিত। একজন শিশুর জন্য নিজের ঈমান-আকিদা, পবিত্রতা, নামাজ ও দৈনন্দিন জীবনে প্রয়োজনীয় দ্বীনি বিধান সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রাথমিক পর্যায়েই দ্বীনি শিক্ষার ভিত্তি গড়ে তুলতে হবে: শিশুরা অনুকরণপ্রিয়। তারা পরিবার, শিক্ষক ও চারপাশের পরিবেশ থেকে যা দেখে, তা-ই শেখার চেষ্টা করে। শৈশবে শেখা ভালো অভ্যাস ও নৈতিক শিক্ষা পরবর্তী জীবনেও গভীর প্রভাব ফেলে। তাই প্রাথমিক শিক্ষার সঙ্গে দ্বীনি শিক্ষা সমন্বয় করা সময়ের গুরুত্বপূর্ণ দাবি। পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জন্য বয়স ও সামর্থ্য অনুযায়ী নিম্নলিখিত বিষয়গুলো শেখার ব্যবস্থা থাকা উচিত—
১. বিশুদ্ধভাবে পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত শেখা।
২. ঈমান-আকিদা ও ইসলামের মৌলিক বিষয়গুলো জানা।
৩. নামাজের নিয়মকানুন ও প্রয়োজনীয় মাসআলা শেখা।
৪. অজু, গোসল, পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতার বিধান জানা।
৫. দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় দোয়া ও হাদিস মুখস্থ করা।
৬. পিতা-মাতা, শিক্ষক ও বড়দের সম্মান করতে শেখা।
৭. সত্যবাদিতা, আমানতদারি, ধৈর্য, ক্ষমা ও সহানুভূতির চর্চা করা।
৮. মিথ্যা, প্রতারণা, গালিগালাজ, হিংসা ও অন্যায় কাজ থেকে বিরত থাকতে শেখা।
৯. প্রতিবেশী, সহপাঠী ও অসহায় মানুষের প্রতি সদাচরণ করা।
১০. দেশ, সমাজ ও মানুষের কল্যাণে কাজ করার মানসিকতা গড়ে তোলা। এভাবে প্রাথমিক পর্যায়েই শিক্ষার্থীদের মধ্যে দ্বীনি জ্ঞান ও নৈতিকতার সমন্বয় ঘটানো সম্ভব।
সন্তানদের দ্বীনি শিক্ষা দেওয়া অভিভাবকদের দায়িত্ব : সন্তানের শিক্ষা ও চরিত্র গঠনে পরিবারের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যালয় শিশুকে জ্ঞান দেয়, কিন্তু পরিবারের পরিবেশ তার আচরণ ও অভ্যাস গঠনে গভীর প্রভাব ফেলে। তাই সন্তানকে শুধু স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিলেই অভিভাবকের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। তার ধর্মীয় শিক্ষা, নৈতিকতা ও চরিত্র গঠনের প্রতিও যত্নবান হতে হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন- অর্থ: “হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে আগুন থেকে রক্ষা করো।” -সুরা আত-তাহরিম, আয়াত: ৬। এই আয়াতের শিক্ষা হলো, নিজেদের পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদেরও আল্লাহর নির্দেশনা অনুযায়ী জীবন পরিচালনায় সহায়তা করতে হবে। সন্তানকে কুরআন শিক্ষা দেওয়া, নামাজের অভ্যাস গড়ে তোলা এবং ভালো-মন্দের পার্থক্য শেখানো এই দায়িত্ব পালনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন- অর্থ: “তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল, আর তোমাদের প্রত্যেককে তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।”-সহিহ বুখারি, হাদিস: ৮৯৩; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৮২৯। সুতরাং অভিভাবকদের উচিত সন্তানদের প্রাথমিক শিক্ষা থেকেই দ্বীনি শিক্ষার প্রতি গুরুত্ব দেওয়া এবং নিজেদের আচরণের মাধ্যমে তাদের সামনে উত্তম আদর্শ উপস্থাপন করা।
নামাজ শিক্ষা ও অনুশীলনের গুরুত্ব : নামাজ ইসলামের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। শৈশব থেকেই নামাজের শিক্ষা ও অভ্যাস গড়ে তোলা হলে পরবর্তী জীবনে তা ধরে রাখা সহজ হয়। তবে নামাজ শেখানোর ক্ষেত্রে বয়সোপযোগী পদ্ধতি, ভালোবাসা, ধৈর্য ও উৎসাহকে গুরুত্ব দিতে হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন- অর্থ: “তোমরা তোমাদের সন্তানদের সাত বছর বয়সে নামাজের নির্দেশ দাও।” -সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৯৫।
এই হাদিস শিশুদের শৈশব থেকেই নামাজের প্রশিক্ষণ দেওয়ার গুরুত্ব তুলে ধরে। তাই প্রাথমিক পর্যায়ে নামাজের পদ্ধতি, নামাজের দোয়া, সূরা, তাশাহুদ ও প্রয়োজনীয় মাসআলা শেখানোর ব্যবস্থা থাকা দরকার।
নৈতিকতা ও আদর্শ চরিত্র গঠনে দ্বীনি শিক্ষার ভূমিকা : শিক্ষিত হওয়া আর নৈতিকতাসম্পন্ন হওয়া এক বিষয় নয়। একজন শিক্ষার্থী অনেক জ্ঞান অর্জন করেও যদি মিথ্যা বলে, অন্যের অধিকার নষ্ট করে, দূর্বলকে অপমান করে কিংবা অন্যায় কাজে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে তার শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়। ইসলাম জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি উত্তম চরিত্র গঠনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন- অর্থ: “নিশ্চয়ই আমি উত্তম চরিত্রের পূর্ণতা সাধনের জন্য প্রেরিত হয়েছি।” -মুসনাদ আহমাদ।
এই হাদিসের শিক্ষা অনুসারে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সত্যবাদিতা, শালীনতা, দয়া, ক্ষমাশীলতা, ন্যায়পরায়ণতা ও মানুষের প্রতি সম্মানবোধ গড়ে তোলা জরুরি। কুরআন-হাদিসের শিক্ষা বাস্তব জীবনে প্রয়োগের মাধ্যমে শিশুরা বুঝতে শিখবে - সৎ হওয়া কেন জরুরি, অন্যের অধিকার রক্ষা করা কেন কর্তব্য এবং অন্যায় থেকে দূরে থাকা কেন প্রয়োজন।
মাদরাসা ও সাধারণ শিক্ষার সমন্বয় : প্রাথমিক পর্যায়ে দ্বীনি শিক্ষার ভিত্তি গড়ে তোলার অর্থ এই নয় যে, প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে পরবর্তী সময়ে অবশ্যই মাদরাসায় পড়তে হবে। বরং প্রত্যেক মুসলিম শিশুর জন্য মৌলিক দ্বীনি শিক্ষা নিশ্চিত করাই মূল লক্ষ্য। কেউ মাধ্যমিক পর্যায়ে মাদরাসায় পড়বে, কেউ সাধারণ স্কুল-কলেজে পড়বে, আবার কেউ উচ্চশিক্ষা অর্জন করে চিকিৎসক, প্রকৌশলী, শিক্ষক, গবেষক কিংবা অন্য কোনো পেশায় যুক্ত হবে। যে পথেই সে এগিয়ে যাক না কেন, তার মধ্যে কুরআন-সুন্নাহর মৌলিক শিক্ষা, নৈতিকতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধ থাকা জরুরি। একজন চিকিৎসক যদি দক্ষতার পাশাপাশি সৎ ও মানবিক হন, একজন শিক্ষক যদি জ্ঞানের পাশাপাশি আদর্শবান হন, একজন ব্যবসায়ী যদি লাভের পাশাপাশি সততা বজায় রাখেন এবং একজন সরকারি কর্মকর্তা যদি ক্ষমতার পাশাপাশি ন্যায়পরায়ণ হন, তাহলে সমাজ উপকৃত হবে। অতএব, দ্বীনি শিক্ষা ও সাধারণ শিক্ষাকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে না দেখে, সুশিক্ষিত ও আদর্শ মানুষ গঠনের পরিপূরক হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। পরিশেষে বলব, শিশুরাই আগামী দিনের জাতির ভবিষ্যৎ। তাদের হাতে আগামী দিনের পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব অর্পিত হবে। তাই তাদের শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান দিয়ে গড়ে তুললেই চলবে না; পাশাপাশি ঈমান, ইবাদত, নৈতিকতা, মানবিকতা ও আদর্শ চরিত্রের শিক্ষাও দিতে হবে। প্রাথমিক পর্যায় তথা পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জন্য বয়সোপযোগী দ্বীনি শিক্ষার কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা সময়ের অপরিহার্য দাবি। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ, মক্তব ও সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগে এ শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত-প্রত্যেক শিশু কুরআন পড়তে শিখবে, নামাজের শিক্ষা গ্রহণ করবে, দ্বীনের মৌলিক বিধান জানবে, নৈতিকতা ও আদর্শ চরিত্রে গড়ে উঠবে এবং পরবর্তী জীবনে যে শিক্ষাধারাতেই অধ্যয়ন করুক না কেন, একজন সৎ, দক্ষ ও দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করবে। মনে রাখতে হবে, প্রাথমিক পর্যায়ে দ্বীনি শিক্ষার বীজ বপন করা গেলে ভবিষ্যৎ জীবনে তার সুফল পাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়। তাই আসুন, শিশুদের হাতে বই তুলে দেওয়ার পাশাপাশি তাদের হৃদয়ে ঈমান, জীবনে আমল এবং চরিত্রে নৈতিকতার আলো জ্বালিয়ে দিই। তাহলেই গড়ে উঠবে আদর্শ প্রজন্ম, সমৃদ্ধ সমাজ এবং নৈতিকতা সম্পন্ন জাতি।
লেখক : ইমাম ও খতিব, বিষ্ণুপুর মনোহরখাদী মদিনা বাজার বাইতুল আমিন জামে মসজিদ, প্রধান শিক্ষক : দারুসসুন্নাত বিসমিল্লাহ মডেল মাদরাসা। চাঁদপুর সদর, চাঁদপুর।






