মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:০৭

স্মৃতিভ্রংশকে বার্ধক্যের দোষ বলে এড়িয়ে যাবেন না

হাসান আলী
স্মৃতিভ্রংশকে বার্ধক্যের দোষ বলে এড়িয়ে যাবেন না

ডিমেনশিয়া শনাক্তকরণে পরিবার থেকে রাষ্ট্র—সবার দায়িত্ব। একই কথা বারবার বলা, কিছুক্ষণ আগের ঘটনা মনে না থাকা, পরিচিত মানুষের নাম ভুলে যাওয়া কিংবা হঠাৎ আচরণে পরিবর্তন—এসব দেখলেই আমরা অনেক সময় বলি, ‘বয়স হয়েছে, তাই এমন হচ্ছে।’ কিন্তু সব ভুলে যাওয়া স্বাভাবিক বার্ধক্যের লক্ষণ নয়। এর আড়ালে লুকিয়ে থাকতে পারে ডিমেনশিয়া। আর যত দেরিতে বিষয়টি বোঝা যাবে, রোগী ও পরিবারের জন্য পরিস্থিতি তত কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

২১ সেপ্টেম্বর বিশ্ব আলঝেইমার্স দিবস। ডিমেনশিয়া ও আলঝেইমার্স সম্পর্কে সচেতনতা তৈরির জন্য বিশ্বজুড়ে দিনটি পালিত হয়। ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্যের মূল বার্তা হলো—‘যত আগে জানবেন, তত বেশি পারবেন—ডিমেনশিয়ার রোগ নির্ণয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’ এই বার্তাটি আমাদের দেশের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ডিমেনশিয়ার লক্ষণ দেখা দেওয়ার পরও অনেক পরিবার রোগটিকে বয়সজনিত স্বাভাবিক সমস্যা মনে করে চিকিৎসকের কাছে যেতে দেরি করে।

ডিমেনশিয়া শুধু স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়ার নাম নয়। এটি ধীরে ধীরে মানুষের স্মরণশক্তি, চিন্তাভাবনা, বিচার-বিবেচনা, ভাষা, আচরণ, অনুভূতি এবং দৈনন্দিন কাজ করার সক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলে। রোগী অনেক সময় নিজের পরিবর্তন বুঝতে পারেন না। আবার পরিবারের সদস্যরাও তার আচরণকে ইচ্ছাকৃত বা বয়সের স্বাভাবিক পরিবর্তন বলে মনে করতে পারেন। ফলে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও সহায়তা পেতে দেরি হয়।

ডিমেনশিয়ার বিভিন্ন ধরন রয়েছে। আলঝেইমার্স রোগ, ভাসকুলার ডিমেনশিয়া, লিউই বডি ডিমেনশিয়া এবং ফ্রন্টোটেম্পোরাল ডিমেনশিয়া এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য। রোগের ধরন অনুযায়ী লক্ষণ ও অগ্রগতির ধরন ভিন্ন হতে পারে। তাই কোনো লক্ষণ দেখা দিলে নিজে নিজে সিদ্ধান্ত না নিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

প্রাথমিক পর্যায়ে রোগীর গুছিয়ে কথা বলতে অসুবিধা হতে পারে। সাম্প্রতিক ঘটনা মনে রাখতে না পারা, একই কথা বারবার বলা, সময়-স্থান নিয়ে বিভ্রান্ত হওয়া কিংবা পরিচিত কাজেও ভুল করা দেখা দিতে পারে। সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার আগ্রহ কমে যেতে পারে। দীর্ঘদিনের প্রিয় শখ বা পছন্দের কাজেও আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে পারেন। এসব পরিবর্তনকে শুধু ‘বয়সের সমস্যা’ বলে এড়িয়ে যাওয়া ঠিক নয়।

মধ্যবর্তী পর্যায়ে সমস্যা আরও প্রকট হয়। রান্না করা, কাপড় ধোয়া, গোসল করা, হিসাব-নিকাশ করা কিংবা প্রতিদিনের পরিচিত কাজগুলো করতে রোগীর অসুবিধা হতে পারে। জিনিসপত্র কোথায় রেখেছেন তা খুঁজে না পাওয়া, পরিচিত মানুষের নাম বা চেহারা চিনতে সমস্যা হওয়া এবং আচরণে পরিবর্তন আসতে পারে।

শেষ পর্যায়ে রোগী নিজের দৈনন্দিন প্রয়োজনও ঠিকভাবে প্রকাশ করতে পারেন না। খাবার চিবানো বা গিলতে সমস্যা হতে পারে। স্বামী-স্ত্রী, সন্তান, আত্মীয়স্বজন কিংবা দীর্ঘদিনের বন্ধুকেও চিনতে না-ও পারেন। মলমূত্রের নিয়ন্ত্রণ হারাতে পারেন। শরীরের কোথাও ব্যথা বা অসুবিধা হলেও তা ঠিকভাবে জানাতে পারেন না। তখন প্রায় সার্বক্ষণিক পরিচর্যার প্রয়োজন হয়।

ডিমেনশিয়া শনাক্ত করার ক্ষেত্রে পরিবারের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পরিবারের সদস্যরা-ই রোগীর দৈনন্দিন আচরণ ও স্মৃতির পরিবর্তন সবচেয়ে আগে দেখতে পান। তাই অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে রোগীকে বকা, অপমান বা উপহাস না করে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতে হবে। দ্রুত রোগ নির্ণয় হলে রোগী ও পরিবার ভবিষ্যতের জন্য প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা করার সুযোগ পান।

তবে দায়িত্ব শুধু পরিবারের নয়। চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ডিমেনশিয়ার প্রাথমিক লক্ষণ শনাক্ত করার বিষয়ে আরও প্রশিক্ষিত হতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবায় প্রয়োজনীয় মূল্যায়ন, পরামর্শ ও রেফারেলের সুযোগ বাড়াতে হবে।

সরকারেরও রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। ডিমেনশিয়াকে শুধু চিকিৎসার বিষয় হিসেবে না দেখে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য ও সামাজিক সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। প্রশিক্ষিত কেয়ারগিভার তৈরি, পরিবারকে পরামর্শ দেওয়া, কম খরচে পরিচর্যা-সহায়তা এবং সরকারি হাসপাতালে প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, প্রবীণ সংগঠন ও স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানগুলো এলাকায় সচেতনতা তৈরিতে এগিয়ে আসতে পারে। পাড়া-মহল্লায় সভা, সচেতনতামূলক প্রচার এবং পরিচর্যাকারীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। গণমাধ্যমও ডিমেনশিয়া সম্পর্কে প্রচলিত ভুল ধারণা দূর করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

সবচেয়ে বড় কথা, ডিমেনশিয়ার রোগীকে বোঝা নয়, মানুষ হিসেবে দেখতে হবে। স্মৃতি দুর্বল হয়ে গেলেও তার অনুভূতি, ভালোবাসা ও সম্মানের প্রয়োজন শেষ হয়ে যায় না। ধৈর্য, ভালোবাসা, নিরাপদ পরিবেশ এবং সম্মানজনক আচরণ একজন রোগীর জীবনকে অনেকটাই সহজ করে দিতে পারে।

ডিমেনশিয়া পুরোপুরি নিরাময়যোগ্য না হলেও আগে শনাক্ত করা মানে আগে প্রস্তুত হওয়া। এতে রোগী, পরিবার ও সমাজ—সবাই প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ পায়। তাই স্মৃতিভ্রংশকে বয়সের দোষ বলে এড়িয়ে যাবেন না। পরিবর্তন দেখলে সচেতন হোন, চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

আজকের সামান্য সচেতনতা আগামী দিনের একটি পরিবারকে বড় সংকট থেকে রক্ষা করতে পারে। মনে রাখুন—যত আগে জানবেন, তত বেশি পারবেন।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়