প্রকাশ : ২০ মে ২০২৬, ১০:৩৯
কবিতাঙ্গন আবৃত্তি পরিষদের যে যেখানে আছে, সুনামে-সম্মানে আছে
----আইনুননাহার কাদরী

“শৈশব থেকে আবৃত্তিকে যাঁর কাছ থেকে আত্মিক উপলব্ধিতে পরিণত করেছি, তিনি আমার প্রয়াত বাবা আব্দুল কাদের। আবৃত্তিকে নিজের উপলব্ধিতে ধারণ এবং লালন করেছি দীর্ঘ সময়। আমাদের প্রজন্মের বাচিক উৎকর্ষ, শুদ্ধ উচ্চারণ, ভাষার শিল্প সৌকর্য, উপস্থাপনা সব কিছুর সহায়ক শেকড় হচ্ছে আবৃত্তি। কবিতাঙ্গন আবৃত্তি পরিষদের বাচিক শিল্পের উৎকর্ষতার জন্যে সাপ্তাহিক ক্লাসের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।” মতলবে আবৃত্তি, উপস্থাপনা এবং বিতর্ককে বাচিক শিল্পে রূপ দেওয়ার অনন্য নেপথ্য কারিগর মতলব সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক আইনুনাহার কাদরী বলেছেন উপরে উল্লেখিত কথাগুলো। চাঁদপুর কণ্ঠের পাক্ষিক আয়োজন ‘সংস্কৃতি অঙ্গনে’ প্রকাশের জন্যে তাঁর একটি সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন দৈনিক চাঁদপুর কণ্ঠের মতলব ব্যুরো ইনচার্জ ও সহ-সম্পাদক (অনলাইন) রেদওয়ান আহমেদ জাকির।
নিচে সেটি পত্রস্থ করা হলোÑ
সংস্কৃতি অঙ্গন : গান গাইতে পারেন না, নাচতে পারেন না, সেজন্যেই কি আবৃত্তিতে আকৃষ্ট হলেন, না অন্য কারণ?
আইনুননাহার কাদরী : গানের শিল্পী কিংবা নৃত্য শিল্পী হওয়ার তৃষা কখনো মনে জাগেনি আমার। ছোট বেলা হতে একটি শিল্প মাধ্যমকে হৃদয়ে ধারণ করেছি এবং লালন করেছি, সেটি হচ্ছে আবৃত্তি শিল্প, আবৃত্তি চর্চা, যা এখনও করে যাচ্ছি, করে যাবো স্মৃতি বিস্মৃত না হওয়া পর্যন্ত।
সংস্কৃতি অঙ্গন : আবৃত্তি শিখেছেন কখন কার কাছ থেকে? আবৃত্তিতে শিক্ষা জীবনে নিশ্চয়ই অনেক কৃতিত্ব অর্জন করেছেন। সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কী কী?
আইনুননাহার কাদরী : শৈশব থেকে আবৃত্তিকে যাঁর কাছ থেকে আত্মিক উপলব্ধিতে পরিণত করেছি, তিনি আমার প্রয়াত বাবা আব্দুল কাদের। তিনি মতলব জে. বি. পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের ইংরেজি শিক্ষক ছিলেন। শিক্ষা জীবন থেকে আবৃত্তি প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করার জন্যে অপেক্ষায় থাকতাম। উপেজলা, জেলা এবং বিভাগীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠত্বের সনদ পেয়ে জাতীয় পর্যায়ে অংশগ্রহণ করেছি বহুবার। তবে জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠত্বের সনদ অধরাই রয়ে গেছে।
সংস্কৃতি অঙ্গন : কবিতাঙ্গন আবৃত্তি পরিষদ গঠন করার তাগিদ কিসের থেকে অনুভব করলেন? যাত্রা থেকে অদ্যাবধি আপনাদের উল্লেখযোগ্য অর্জন সম্পর্কে যদি একটু বলতেন।
আইনুননাহার কাদরী : আবৃত্তিকে নিজের উপলব্ধিতে ধারণ এবং লালন করেছি দীর্ঘ সময়। আমাদের প্রজন্মের বাচিক উৎকর্ষ, শুদ্ধ উচ্চারণ, ভাষার শিল্প সৌকর্য, উপস্থাপনা সব কিছুর সহায়ক শেকড় হচ্ছে আবৃত্তি।
আবৃত্তির এই গতিপথকে ধারাবাহিক শিল্পচর্চায় পরিণত করতে ‘কবিতাঙ্গন আবৃত্তি পরিষদ’কে আগলে নিয়েছি। কবিতাঙ্গন আবৃত্তি পরিষদের যাত্রা থেকে অদ্যাবধি ধারাবাহিকভাবে সাপ্তাহিক ক্লাস, বিভিন্ন জাতীয় দিবসে সরকারি অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ, জাতীয় পর্যায়ে প্রশিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে মতলব উপজেলা ও পৌরসভার প্রাইমারী শিক্ষকদের উচ্চারণ, উপস্থাপনা বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদান, সংগঠনের আবৃত্তিকারকদের উচ্চারণ প্রশিক্ষণ প্রদান, জাতীয় পর্যায়ে উচ্চতর কর্মশালায় অংশগ্রহণ, জাতীয় আবৃত্তি উৎসবে অংশগ্রহণ, আঞ্চলিক আবৃত্তি উৎসব ও আবৃত্তি প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ চলছে। প্রতি বছর আমাদের ধারাবাহিক বাৎসরিক অনুষ্ঠানের মধ্যে ২৫ মার্চের অনুষ্ঠান, কবিতার স্বাধীনতা-স্বাধীনতার কবিতা সমাদৃত অনুষ্ঠান, ২০ ফেব্রুয়ারির আবৃত্তি অনুষ্ঠান বর্ণে বর্ণে সজ্জিত আমাদের সংগঠনের মর্মে গাঁথা অনুষ্ঠান।
কবিতাঙ্গন আবৃত্তি পরিষদের আবৃত্তিকারদের মধ্যে সারা বাংলাদেশে যে যেখানে আছে বাচিক শিল্পী হিসেবে বা আবৃত্তিকার হিসেবে, সুনামে-সম্মানে আছে।
কবিতাঙ্গনের ধারক এবং বাহক আমরা যারা আছি, সবচেয়ে বেশি সম্মানবোধ করি ‘চ্যানেল আই’-এর সিনিয়র ব্রডকাস্ট জার্নালিস্ট শরিফ হোসেন হৃদয়ের নাম আপনাদের জানাতে।
সংস্কৃতি অঙ্গন : আপনাদের একটি বেদনার স্মৃতি আছে। সেটি আপনাদের অনেক কাঁদায়। এতে আপনাদের সংগঠন কতোটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে? সে ক্ষতিটা কি কাটিয়ে উঠতে পেরেছেন?
আইনুননাহার কাদরী : কবিতাঙ্গন আবৃত্তি পরিষদের বেদনার স্মৃতি হাবিবুর রহমান কাকন। যে স্মৃতি আমাদের আজও কাঁদায়। কবিতাঙ্গন আবৃত্তি পরিষদের একেকজন আবৃত্তিকার এই পরিবারের নিবেদিতপ্রাণ সংগঠক। এদের কোনো একজনের মর্মাহত প্রয়াণ আমাদের জন্যে
শোকগাথা অধ্যায়। সংগঠনে শত-সহস্র যোগ্য আবৃত্তি শিল্পীর আগমন হলেও কাকন ফিরে আসবে না কখনও। সংগঠনের একজন সংগঠকের অকাল প্রয়াণের পর জনম-জনমে আরো সংগঠক প্রতিষ্ঠিত হবে। যিনি চলে গেলেন তাকে আর ফিরে পাবো না।
সংস্কৃতি অঙ্গন : চাঁদপুর জেলায় মতলব দক্ষিণ বাচিক শিল্পের উৎকর্ষতায় অনেক এগিয়ে--এটা সুধী পর্যবেক্ষকদের অভিমত। আপনি কী বলতে চান?
আইনুননাহার কাদরী : চাঁদপুর জেলায় ‘মতলব দক্ষিণ বাচিক উৎকর্ষতায় অনেক এগিয়ে’ সুধী পর্যবেক্ষকদের এমন অভিমতে মতলব দক্ষিণের একজন বাচিক শিল্পী হিসেবে আমি প্রণোদিত। আবৃত্তি, উপস্থাপনা, বিতর্কে মতলব দক্ষিণের বাচিক শিল্পীদের সফল পদচারণার কথা চাঁদপুরের সচেতন মহলের অজানা নয়। আবৃত্তি, উপস্থাপনা এবং বিতর্ককে বাচিক শিল্পে রূপ দেওয়ার নেপথ্য কারিগর এবং শৈল্পিক উপস্থাপনায় মতলব দক্ষিণের আন্তরিক এবং সরব উপস্থিতি চাঁদপুর জেলায় সবাইকে মুগ্ধ করে। সকলের ভালবাসায় মতলব দক্ষিণ বাচিক শিল্পে জাগ্রত থাকতে চায় নিরন্তর।
সংস্কৃতি অঙ্গন : আপনাদের সংগঠনে বাচিক শিল্পের উৎকর্ষতার জন্যে কী কী চর্চা বা প্রশিক্ষণ হয়? কোনটিতে শিক্ষার্থীদের বেশি আগ্রহ?
আইনুননাহার কাদরী : কবিতাঙ্গন আবৃত্তি পরিষদের বাচিক শিল্পের উৎকর্ষতার জন্যে সাপ্তাহিক ক্লাসের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। তাছাড়া শিক্ষার্থীদের জন্যে সুবিধামতো সময়ে জাতীয় প্রশিক্ষকদের দ্বারা প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। কারণ যে কোনো শিল্পীদের হোক, তিনি সঙ্গীত শিল্পী, নৃত্য শিল্পী, আবৃত্তি শিল্পী কিংবা বাচিক শিল্পী তাদের শিল্প রাজ্যে মনোন্নয়নের জন্যে প্রশিক্ষণের বিকল্প নেই।
বাচিক শিল্প অর্থাৎ আবৃত্তি, বিতর্ক, উপস্থিত বক্তৃতা এই অঙ্গনে শিক্ষার্থীদের আগ্রহের কারণ--এই শিল্পের সহজলভ্যতা আছে এবং নিবেদিতপ্রাণ সংগঠক আছে। অন্য মাধ্যমগুলোতে অর্থ সংশ্লিষ্টতা বেশি থাকায় শিক্ষার্থীদের আগ্রহ কম থাকে।
বাস্তব সত্য হলো, কারো সন্তান বাচিক শিল্পী হিসেবে কতোটা পারঙ্গম, অভিভাবক সে বিষয় বিবেচনা না করে তাদের সন্তানদের মঞ্চে পরিবেশনা করাতে অধীর হয়ে যান। বাচিক শিল্পে এই আগ্রহ অনেক সময় নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
সংস্কৃতি অঙ্গন : বয়স বাড়ছে আপনার। উত্তরসূরি নির্বাচনের তাগিদ অনুভব করছেন কি?
আইনুননাহার কাদরী : যে কোনো মুহূর্তে চলে যাবো পরপারে এই প্রস্তুতি নিয়ে এখনও গতিময় জীবনের সাথী হয়ে আছি। সংগঠনের মননশীল সংগঠক হিসেবে আষ্টেপৃষ্ঠে কাজ করছেন অনেকেই। তবে ওনাদের মধ্যে আন্তরিকতার স্বাক্ষর রাখছেন ললনাকুল। আমাদের সংগঠনে বাচিক শিল্পীদের মধ্যে নারীদের সংখ্যাধিক্য রয়েছে। শিশু হতে তরুণ-তরুণীদের মধ্যে বাচিক শিল্পীর সংখ্যায় নারী আসন মর্যাদাশীল রয়েছে। সাংগঠনিক নেতৃত্ব মূলত সংগঠনের প্রতি নিবেদিতপ্রাণ যিনি, তাকে বেছে নেওয়া সহজ। সেদিক থেকে আমাদের উত্তরসূরি প্রস্তুত আছে।
সংস্কৃতি অঙ্গন : কবিতাঙ্গন নিয়ে আপনার স্বপ্ন কী? কতোদূর এগিয়ে যেতে চান?
আইনুননাহার কাদরী : ‘আবৃত্তি ভাবনায় উজ্জীবিত হোক শুদ্ধতম সংস্কৃতি চর্চা’ এই শ্লোগানকে ধারণ করে কবিতাঙ্গনের স্বপ্নসারথীদের পথচলা, বাংলা ভাষা-সংস্কৃতি, আবৃত্তি, উপস্থাপনা, শুদ্ধ উচ্চারণ বিষয়ে প্রজন্মকে সচেতনভাবে নিরন্তর জাগ্রত করে যাওয়া কবিতাঙ্গনের স্বপ্ন। বর্তমানে তৈরি হওয়া বাচিক শিল্পীরা আগামী প্রজন্মের কাণ্ডারী--এই প্রত্যয়ে কবিতাঙ্গনের পথচলা।
সংস্কৃতি অঙ্গন : আপনার পেশার সাথে নেশার অনেক সাযুজ্য। মন্তব্য করুন।
আইনুননাহার কাদরী : সোনার হাতে সোনার কাঁকন কে কার অলঙ্কার। তেমন হতে পারিনি আমি। এতোটুকু বলতে পারি, অধ্যাপনা করছি ২০০৫ সাল হতে। আমার পেশা জীবনের সেরা প্রাপ্তি, আমার শিক্ষার্থীরা আমাকে পিনপতন নিরবতায় মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনে। এমন অনুভবের নেপথ্যে যদি বলেন ‘’আমার পেশার সাথে নেশার অনেক সাযুজ্য”--সে সম্মানবোধক সম্ভাষণ আমি বিনয়ের সাথে গ্রহণ করবো।
সংস্কৃতি অঙ্গন : মঞ্চে আবৃত্তিকার, উপস্থাপক, সঞ্চালক--কোনটিতে আপনার বেশি স্বাচ্ছন্দ্য? কেন এই স্বাচ্ছন্দ্য?
আইনুননাহার কাদরী : বাঙালি সংস্কৃতিতে আবৃত্তি, উপস্থাপনা, সঞ্চালনা তিনটি মাধ্যমই বাচিক শিল্পের অংশ। বাংলা বিভাগের অধ্যাপিকা হিসেবে ক্লাসে সঞ্চালক, উপস্থাপক, আবৃত্তিকারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হয় প্রতিদিন। বাংলায় অধ্যাপনা করতে গেলে একই বোধে বহুরূপ ধারণ করতে হয়। আমিও সেটা করি। প্রশ্নের সমাপ্তি টানতে যেয়ে বলবো, উপস্থাপনায় আমি বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি।
সংস্কৃতি অঙ্গন : আমাদের প্রশ্নের বাইরে পাঠকদের উদ্দেশ্যে বাড়তি কিছু বলুন।
আইনুননাহার কাদরী : চাঁদপুর কণ্ঠের ঐতিহ্যে, চাঁদপুর কণ্ঠের পাঠকদের সঙ্গে একটা সময় ধারাবাহিকভাবে ছিলাম। অনেকটা সময় পর অনুভব বিনিময় হচ্ছে ওনাদের সঙ্গে।
আপনাদের কাছে একটাই মিনতি, পৃথিবীর সকল বন্ধুত্বের ঊর্ধ্বে সন্তানের সাথে বন্ধুত্ব করুন। আপনার পর সন্তানকে বইয়ের সাথে বন্ধুত্ব করিয়ে দিন। কারণ, কবি ওমর খৈয়াম বলেছেন, ‘রুটি মদ ফুরিয়ে যাবে, প্রিয়ার কালো চোখ ঘোলাটে হয়ে যাবে, বই হবে অনন্ত যৌবনা’।
সন্তান বাচিক শিল্পী হোক বা আঞ্চলিকতার রূপকার হোক, আমাদের প্রয়োজন সন্তানের আত্মিক উপলব্ধিতে শুদ্ধতা আনয়ন করা। আমাদের অনন্ত তৃষা এইটুকু হোক। আমরা বেঁচে থাকবো আমাদের প্রজন্মের শুভ্রতার মননশীলতায়।








