প্রকাশ : ০৮ মার্চ ২০২৬, ১০:৩৩
ঘুম ভাঙ্গানোর অভিশাপ

সময় নভেম্বর ১৯২২, প্রায় এক বছর ধরে চলছে মিশরীয় পিরামিডের রহস্য উন্মোচনে ব্রিটিশ প্রত্নতাত্ত্বিকদের খনন কাজ। মাঝে মাঝেই মরুভূমির মাটির নিচে ফারাও রাজাদের সমাধিস্থলগুলো থেকে বেরিয়ে আসছে মহাজাগতিক, রহস্যময়, অতিপ্রাকৃতিক জিনিসপত্র। মিশরীয় ফারাওদের এক একটি সমাধিস্থল যেন এক একটি গুপ্তধনের খনি। অনেকেই একসময় পিরামিডকে ফারাওদের কবর মনে করতো। পরবর্তী গবেষণায় জানা যায়, পিরামিড আসলে কোনো কবর নয়, সেটি সম্পূর্ণ আলাদা একটি আশ্চর্যময় স্থাপনা। যার মূল রহস্য আজো উন্মোচন করা সম্ভব হয়নি।
ব্রিটিশ প্রত্নতাত্ত্বিকদের অনেক দলই সেখানে প্রায় এক দশক ধরে গবেষণা ও খনন কাজ পরিচালনা করে চলেছে। তাদের মধ্যে একজন দক্ষ প্রত্নতাত্ত্বিক হাওয়ার্ড কার্টার। তার অধীনে একজন সাধারণ কর্মচারী শাবাব আল মিশরী। সারাদিন গাধা খাটুনি খেটে সন্ধ্যা হলে সামান্য কিছু পারিশ্রমিক নিয়ে বাড়ি ফিরে যায়। এক সন্ধ্যায় প্রতিদিনের মতোই হাড় ভাঙ্গা খাটুনি শেষে বাড়ি ফেরার উদ্দেশ্যে নিজের গাধার উপর চড়ে বসে শাবাব আল মিশরী। কিছুক্ষণ পথ চলার পর হঠাৎ করে সে তার গাধা সহ দেবে যায় বালুর নিচে। আশেপাশের লোকজন ছুটে আসে তাদের চিৎকার শুনে। আশ্চর্যের বিষয় হলো তারা একেবারেই দেবে যায় নি বালিতে। তারা যেখানে দেবে গেছিলো তার নিচেই ছিলো শক্ত পাথরের আস্তরণ। ততক্ষণে উপস্থিত লোকদের সকলেই বুঝে গিয়েছিলো, এটিও কোনো ফারাওয়ের সমাধিস্থল। কিন্তু অবাক করার বিষয় হলো, এটি ফারাও রাজবংশীর সমাধিস্থল থেকে একটু দূরে আলাদা অবস্থিত। পরদিনই শুরু হলো হাওয়ার্ড কার্টারের নেতৃত্বে খনন কাজ।
খনন কাজ শুরু করার পর তারা জানতে পারলেন এটি মিশরীয় ফারাওদের মধ্যে সবচেয়ে কম বয়সে রাজা হওয়া ‘কিং তুতেনখামেন’-এর সমাধিস্থল। সারা বিশ্বে হইচই পড়ে গেলো। সারা বিশ্ব থেকে বিখ্যাত প্রত্নতাত্ত্বিক ও দর্শনার্থীরা আসতে লাগলেন এই সংবাদ শুনে। খনন কাজের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন হাওয়ার্ড কার্টার। ফারাও রাজাদের এক একটি কবর ছিলো এক একটি প্রাসাদের মতন। কিং তুতেনখামের কবরও তেমনি। বলা যায়, তার চেয়েও বেশি কিছু।কেননা, ফারাওদের রাজবংশীয় সমাধিস্থল থেকে তার সমাধি একটু দূরত্বে হওয়ায়। এই সমাধি আগে কেউ উন্মোচন করার সুযোগ পায়নি। ফলে বাকি সমাধিস্থল গুলো যেখানে লুটপাটে শিকার তখন এই সমাধিটি একেবারেই অক্ষত ছিলো। এই সমাধির ভেতরের সকল প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন গুলোও অক্ষত ছিলো।
ফারাও রাজা কিং তুতেনখামেনের মৃত্যু হয়েছিলো প্রায় তিন হাজার বছর আগে। সে খুবই অল্প বয়সে রাজা হয়েছিলো, আর রাজা হওয়ার অল্প সময় পরেই হঠাৎ মৃত্যুবরণ করেছিলো। তার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ আজো জানা যায়নি। লাশ রাখার স্থানে যাওয়ার আগে প্রত্নতাত্ত্বিকরা দেখতে পেলেন বিশাল করিডোর আর বড়ো বড়ো অনেক রুমের। সেগুলোতে রাখা আছে প্রচুর ধনভাণ্ডার। সেখানে রাখা অধিকাংশ তৈজসপত্রই ছিলো স্বর্ণের তৈরি। তখনকার সময়ে কোনো ফারাও রাজা মারা গেলে তাকে তার সকল ধন সম্পদ সহ সমাধিস্থ করে দেয়া হতো। সাথে দেওয়া হতো প্রহরী ও নারী সঙ্গী। মূল কফিন রাখার রুমে যাওয়ার আগেই পাওয়া গেলো প্রায় পাঁচ হাজার তৈজসপত্র। সেগুলো সাবধানে উদ্ধার করতে লেগে গেলো প্রায় এক বছর।
কিং তুতেন খামেনের সমাধিস্থল উন্মোচন হওয়ার প্রায় এক বছর পর ১৯২৩-এর মাঝামাঝি সময়ে রাজা তুতেনখামেনের মূল কফিনের রুম খোলার সিদ্ধান্ত নেয়া হলো। কফিন রাখা রুমের দরজায় পাটের দড়িতে গেরো আর মাটির সমন্বয়ে একটি তালা তৈরি করে রুমটি সিলগালা করে দেয়া হয়েছিল। প্রত্নতত্ত্ববিদ হাওয়ার্ড কার্টার নিজ হাতে দরজাটি ভাঙলেন। ভেতরে ঢুকে তারা অবাক হয়ে গেলেন। লাশের কোনো বাক্সের কফিন নেই। কফিনের বদলে একটি গর্তে রাখা আছে স্বর্ণের মূর্তির মত কিছু একটা। কিং তুতেনখামেনের লাশটির ওপর তিন স্তরে স্বর্ণের মূর্তির মতো আবরণ তৈরি করা হয়েছে তার শরীরের আকৃতিতে। এরপর সেটাকে রেখে দেওয়া হয়েছে একটি গর্তের মতো স্থানে। পরবর্তীতে গবেষকরা দেখতে পান, তিনটি নয় মোট নয়টি আস্তরণ ছিলো কিং তুতেনখামেনের দেহের ওপর।
কিং তুতেনখামেনের কফিন উন্মোচন করার সেই সন্ধ্যায় হাওয়ার্ড কার্টার তার ব্যক্তিগত রুমে বসে পড়ছিলেন বইপত্র। তখনই হঠাৎ আওয়াজ শুনতে পান তার পাশের রুম থেকে, যেখানে রাখা ছিলো তার পোষা চড়ুই পাখিটি। তিনি গিয়ে দেখেন একটি কিং কোবরা সাপ খাঁচার ভেতরে রাখা তার শখের চড়ুই পাখিটিকে গিলে খাচ্ছে। এটি কোনো সাধারণ ঘটনা ছিলো না। কিং কোবরা ছিলো ফারাও রাজাদের প্রতীক।আর চড়ুই হলো দুর্বলতার প্রতীক। যেন তাকে বার্তা দেয়া হচ্ছিলো যে, তোমরা এতো দুর্বল হয়ে এমন ভয়ংকর জায়গায় হাত দিয়েছো যে, তোমাদেরকে গিলে খাওয়া এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।
মিশরীয় জনগণের মতে, ফারাও রাজাদের সমাধি কোনো সাধারণ কবর নয়, তাদের সমাধিস্থ করার সময় সেইখানে ফারাও রাজাদের সকল ধনসম্পদ দেওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন তন্ত্র মন্ত্র ব্যবহার করে কবরকে সিলগালা করা হতো, যাতে করে কেউ তাদের রাজাদের পরকালীন ঘুমের ব্যাঘাত না ঘটাতে পারে। কেউ যদি তাদের এই কবরে হাত দিতো তার ধ্বংস অনিবার্য হয়ে পড়তো ফারাও রাজাদের অভিশাপে। তারা বিশ্বাস করতো, তাদের রাজা আসমানের খোদার সাথে শান শওকতের সাথে দেখা করবে এবং তাদেরকে এই অবস্থায় বিরক্ত করা নিজেদের ধ্বংস ডেকে আনার নামান্তর।
কিং তুতেন খামেনের লাশ উন্মোচন করার দিনে উপস্থিত ছিলেন লর্ড কার্নিভন। এই লর্ড কার্নিভনই এ সকল খনন কাজের অর্থের যোগানদাতা ছিলেন। সেদিন লাশ উন্মোচন করার সময় তার গালে একটি ছোট মশা কামড় দিয়েছিলো। পরবর্তীতে তার গালে সেই মশার কামরের জায়গাটি লাল গুটিতে পরিণত হয়। পরে তিনি যখন বাসায় দাড়ি সেভ করছিলেন তখন তার রেজারের ব্লেড লেগে যায় সেই লাল গুটিতে।ক্ষতে পরিণত হয় সেই স্থান। কিছুক্ষণের মধ্যেই পচন শুরু হয় তার গাল। রক্তে বিষক্রিয়ার ফলে কয়েকদিনের মধ্যেই সে মারা যায়।
কিং তুতেন খামেনের কফিনের লাশ উন্মোচনের সময় উপস্থিত হয়েছিলেন আরেকজন বিখ্যাত ব্রিটিশ রেডিওলজিস্ট। সে সময় এক্স-রে করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখেছিলেন কিং তুতেন খামেনের কফিনটি। কিছুদিন পর তিনি হঠাৎ করেই মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়েন। তার রোগ নির্ণয় করা কখনোই সম্ভব হয়নি। রোগ নির্ণয় করার আগেই তিনি মর্মান্তিকভাবে মৃত্যুবরণ করেম। সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে এই মৃত্যু সংবাদগুলো। সবাই ভয়ে ভীত হয়ে উঠে। তিন হাজার বছর ধরে শান্তিতে ঘুমিয়ে থাকা ফারাও রাজার ঘুম ভাঙ্গানোই কি তাহলে এ সকল মৃত্যুর কারণ!
এমনিভাবে সে সময়ে হাওয়ার্ড কার্টারের দলে থাকা প্রায় সাতজন ব্রিটিশ নাগরিক কিং তুতেন খামেনের লাশ উন্মোচনের কাছাকাছি সময়ে রহস্যজনকভাবে মৃত্যুবরণ করেন। এমনকি সমাধিস্থল উন্মোচনের সময় উপস্থিত থাকা লোকেদের মধ্যে প্রায় ১৩ জন মানুষ বিভিন্ন সময়ে রহস্যজনক ভাবে মৃত্যুবরণ করেন। এই ঘটনা ইতিহাসে আজো কিং তুতেনখামেনের অভিশাপ বলে পরিচিত হয়ে আছে।




