রবিবার, ০১ মার্চ, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ
  •   ১৬-২৫ মার্চ নদীতে বালুবাহী বাল্কহেড চলাচল বন্ধ থাকবে : নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়

প্রকাশ : ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১১:৫০

চাঁদপুরে শ্রী শ্রী রামঠাকুর দোল উৎসব

রিপন কুমার সাহা
চাঁদপুরে শ্রী শ্রী রামঠাকুর দোল উৎসব

অশ্রু গঙ্গাজলে ক’রে দেব স্নান,

ভক্তির চন্দন করিব লেপন।

হৃদিপদ্ম ছিঁড়ি ভ’রে দিব ডালি,

রাজীব চরণ পূজিতে।।

হে প্রাণনাথ! তোমার চরণ পূজা করার শক্তি ও ভক্তি যদি তুমি কৃপা করে প্রদান না কর, তবে কে পূজিতে পারে তোমারে?

পরম শ্রদ্ধাভাজন গুরুভ্রাতা ও ঠাকুরের একান্ত পার্ষদ ঁরোহিনী কুমার মজুমদার মহাশয়ের চাঁদপুরস্থ নতুন বাজার মাতৃপীঠ বালিকা বিদ্যালয়ের স্টাফ কোয়ার্টারে (বর্তমানে গুয়াখোলা প্রাথমিক বিদ্যালয়) ১৩৪২ বাংলার ২৪ ফালগুন, রোববার অনুষ্ঠিত দোল উৎসবে শ্রী শ্রী রামঠাকুরের উপস্থিতিতে সমবেত সকল ভক্তের কণ্ঠে কোরাস আকারে নগর সংকীর্তনের উপরোক্ত আর্তিই ছিলো মূল প্রতিপাদ্য। সেদিনের সমবেত সকল ভক্তের ভক্তি ও আকুলতায় সাড়া দিয়ে শ্রী শ্রী ঠাকুর দোলপতি হয়ে দোল মঞ্চে আরোহন করে সকলকে বুঝিয়ে দিলেন, তিনিই ব্রজধামের অধিপতি। আমাদের উদ্ধারের জন্য নবরূপে নরলীলা করতে এসেছেন। নারায়ণ রাম ব্রহ্ম সনাতন

অগতির পতি পতিত পাবন

পাপী-তাপী তরে নররূপ ধরে

জনম নিয়েছ ধরাতে।

কয়েক বছর ঁরোহিনী কুমার মজুমদার তাঁর স্টাফ কোয়ার্টারে দোল উৎসব পালন করেন। তারপর তিনি নতুন কর্মস্থলে বদলিজনিত কারণে চাঁদপুর ছেড়ে চলে যাওয়ায় দোল উৎসব চলে যায় শ্রদ্ধেয় গুরুভ্রাতা ঁধীরেন সোম (বর্তমানে সাধনা প্লাজার পেছনে সেবা সিটি সেন্টারের ডান পাশে) ঁহরিপদ দত্ত

(বর্তমানে জেলা ইসকন মন্দির) মহাশয়ের বাড়িতে। তাঁরা নিজ নিজ বাড়িতে সকল ভক্তের সহযোগিতায় পালাক্রমে দোল উৎসব নির্ধারিত তিথিতে পালন করতেন।

চাঁদপুর শহরের মধ্যভাগ দিয়ে মেঘনার শাখা নদী ডাকাতিয়া প্রবাহিত হওয়ায় পূর্বপাড়ে নতুন বাজার এবং পশ্চিম পাড়ে পুরাণবাজার নামে পরিচিত। নতুন বাজারে ঁধীরেন সোম ও ঁহরিপদ দত্ত মহাশয়ের বাড়িতে দোল উৎসব অনুষ্ঠিত হলেও উৎসবের সকল উপকরণ, অর্থ এবং লোকবল যোগান দিতো পুরাণবাজারের রামভক্তরা। এ নিয়ে কর্তৃত্বের লড়াই চলতো বলে প্রবীণ গুরুভ্রাতাদের মুখে শোনা যায়।

১৩৫৬ বাংলায় পুরাণ বাজারের ব্যবসায়ী জগবন্ধু সাহা মহাশয় তাঁর স্ত্রী রেণুকাপ্রভা সাহাকে নিয়ে নোয়াখালী থেকে চাঁদপুরে আসার পর রামাশ্রিত হওয়ায় তিনিও নতুন বাজারস্থ দোল উৎসবে যোগদান করেন। তাঁর কর্মনিষ্ঠা ও ঠাকুরের সেবায় একান্ত আগ্রহ থাকায় ঁহরিপদ দত্ত মহাশয় স্বইচ্ছায় দোল উৎসব পুরাণ বাজারে করার প্রস্তাব করলে, জগবন্ধু সাহা মহাশয় তাঁর পুরাণ বাজারস্থ নিজ বাড়িতে ১৩৭৭ বাংলা সনে দোল উৎসব করেন। সেই হতে অদ্যাবধি দোল উৎসব পুরাণবাজারে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। জগবন্ধু সাহার পরলোকগমনের পর তাঁর বিধবা স্ত্রী শ্রীমতি

রেণুকাপ্রভা সাহা (বর্তমানে পরলোকগত) নিজ বাড়িটি মন্দির নির্মাণের জন্য দান করলে, শ্রী শ্রী কৈবল্যধামের চতুর্থ মোহন্ত মহারাজ শ্রীমৎ ভবতোষ বন্দ্যোপাধ্যায়- এর অনুমোদনক্রমে ২৬ কার্ত্তিক ১৪০৪ বাংলা, বুধবার শ্রী শ্রী সত্যনারায়ণের সেবা মন্দির ডিঙ্গামানিকের তৃতীয় মোহন্ত মহারাজ শ্রীমৎ সুনীল কুমার চক্রবর্তী (ঠাকুর বংশের প্রতিনিধি) শ্রী শ্রী রামঠাকুর দোল মন্দিরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন এবং সকল ভক্তের আর্থিক অনুদানে ১৫ ফালগুন ১৪০৫ বাংলায় পুনঃনির্মাণ করে মন্দিরের কলেবর বৃদ্ধি করা হয়। শ্রীমতি

রেণুকাপ্রভা সাহা দেহত্যাগের পূর্ব পর্যন্ত মন্দিরে প্রতিষ্ঠিত শ্রীপটের সেবার পাশাপাশি দেশ-বিদেশ হতে আগত ভক্তদের নিবেদিত প্রাণে সেবা করে গিয়েছেন।

ত্রিবেণী প্রণমে ঠাকুর দয়ালে

জনগণ ভজে রাম ভাই বলে

পাদ্য অর্ঘ্য নিয়ে ভক্ত চলে যায়

কৈবল্যনাথেরে দোলপতিরূপে পূজিতে।

পরেশ চন্দ্র পাল ও লক্ষ্মী সাহার (উভয়ে প্রয়াত) মহাশয়ের প্রচেষ্টায় ১৩৭৮ বাংলায় জগবন্ধু সাহা মহাশয়ের বাড়িতে দেশের বরেণ্য কীর্তনীয়াদের নামকীর্তন পরিবেশনে মুখরিত হয়ে উঠে দোল উৎসব। তারপরই শুরু হয় ১৯৭১- এর মুক্তিযুদ্ধ। যুদ্ধকালীন সময়ে প্রাণ বাঁচানোর জন্য জগবন্ধু সাহা মহাশয় সস্ত্রীক দেশ ত্যাগ করে ভারতে চলে যান। যুদ্ধশেষে দেশ স্বাধীন হবার পর পুনরায় জগবন্ধু সাহা মহাশয় সস্ত্রীক ফিরে এসে দেখেন, ঠাকুর ঘরের কোনো কিছুই রক্ষিত নেই, ঠাকুরের চিত্রপটসহ সবই লুণ্ঠিত হয়ে গেছে। যা দেখে উভয়েই ব্যথিত হলেন। চিন্তিত শ্রীমতি রেণুকাপ্রভা সাহা দয়াল ঠাকুরকে স্মরণ করতে করতে একদিন দ্বিপ্রহরে ঘুমিয়ে পড়েন। ঘুমন্ত অবস্থায় তিনি দেখতে পেলেন এক অদ্ভূত স্বপ্ন!

ন’দের নিমাই ব্রজের গোপাল

যুগাবতার রাম দীনদয়াল

কিশোরে ত্যাজিলে মায়ার সংসার

কেহ না পারিল রাখিতে।

শ্রী শ্রী ঠাকুর মৃদুমধুরভাবে হাঁটতে হাঁটতে ঠাকুর ঘরে দক্ষিণমুখী হয়ে বসলেন, সেই বসাস্থায় ঠাকুরকে তিনি পূজা করছেন। এমন সময় তাঁর ঘুম ভেঙ্গে গেলো। বিছানা ছেড়ে নেমে আসলেন এবং বিলম্ব না করে ঠাকুর ঘরে চলে এসে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ভাবছেন, ‘এ আমি কী দেখলাম’? শ্রীমতি রেণুকাপ্রভা সাহা তাঁর স্বপ্ন দর্শন অতি গোপনে স্বামী জগবন্ধু সাহা ও ধীরেন সোম মহাশয়ের নিকট ব্যক্ত করলে, ধীরেন সোম মহাশয় স্বপ্ন দর্শন অনুযায়ী সেই স্থানে নতুন একটি চিত্রপট স্থাপন করলেন। অদ্যাবধি সেই স্থানে সেইভাবেই চিত্রপট খানা রয়েছে এবং পূজিত হচ্ছে।

শ্রী শ্রী ঠাকুর নিজে কৃপা করে চাঁদপুরস্থ দোল মন্দিরে এসেছেন, তার বাস্তব প্রমাণ শ্রীমতি রেণুকাপ্রভা সাহার স্বপ্ন দর্শন এবং মন্দিরে প্রতিষ্ঠিত শ্রী শ্রী কৈবল্যনাথের চিত্রপটখানা প্রাপ্তির বিশ্লেষণ করলেই ভক্তগণ খুব সহজেই অনুধাবন করতে পারবেন।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে জগবন্ধু সাহা মহাশয়ের পরিবারের মন্দিরের ঠাকুরের সকল চিত্রপট বিনষ্ট হওয়ার কয়েক বছর পর তাঁর স্ত্রী রেণুকাপ্রভা সাহা কলিকাতার একজন বিখ্যাত চিত্রকরকে ঠাকুরের একটি চিত্রপট তৈরি করে দেবার জন্য অনুরোধ করেন, সেই অনুযায়ী একটি চিত্রপটও তৈরি করা হয়েছিল। কিন্ত ঠিকানা গরমিল করায় সেই চিত্রপট চলে যায় কুমিল্লাস্থ শ্রী শ্রীরাসস্থলী মন্দিরে। রাসস্থলী মন্দিরে সেই চিত্রপট স্থাপিত করার কয়েক মাস যেতে না যেতেই চিত্রপটের রং বিকৃত হয়ে সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে যায়। এ সংবাদ শ্রী শ্রী কৈবল্যধামের চতুর্থ মোহন্ত মহারাজ শ্রীমৎ ভবতোষ বন্দোপাধ্যায় জানতে পেরে নিজ উদ্যোগে কলিকাতার যাদবপুর থেকে বাংলাদেশে আসার সময়ে রাসস্থলী মন্দিরের জন্য একটি চিত্রপট সাথে করে নিয়ে আসেন, যা ছিল সম্পূর্ণরূপে প্যাকিংকৃত।

মহারাজজী দেশে ফিরে এসে কুমিল্লা থেকে শ্রদ্ধেয় গুরুভ্রাতা চন্দ্রদা’কে ডেকে পাঠান। চন্দ্রদা মোহন্ত মহারাজের নির্দেশানুযায়ী শ্রী শ্রী কৈবল্যধাম মন্দির হতে প্যাকিংকৃত চিত্রপট খানা রাসস্থলী মন্দিরের জন্য সাথে নিয়ে রওনা দিয়ে পথিমধ্যে ফেনীতে নেমে পড়েন এবং কৈবল্যধাম ট্রাস্টি বোর্ডের অন্যতম সদস্য সুবল সাহা মহাশয়ের সাথে দেখা করতে যান। সুবল সাহা নানা কথাবার্তার মাঝে প্যাকিংকৃত চিত্রপটটি দেখার আগ্রহ প্রকাশ করলে চন্দ্রদা প্যাকেটটি খুলে দেখতে পান, শ্রী শ্রী কৈবল্যনাথের একই রকম দুটি চিত্রপট। তখন সুবল সাহা চন্দ্রদার সাথে আলাপ করে শ্রীমতি রেণুকাপ্রভা সাহার ইচ্ছানুযায়ী একটি চিত্রপট চাঁদপুর মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করার জন্য পাঠিয়ে দেন। সেই থেকে কুমিল্লাস্থ শ্রী শ্রী রাসস্থলী মন্দিরে এবং চাঁদপুরস্থ দোল মন্দিরে একই রকম চিত্রপটে শ্রী শ্রী কৈবল্যনাথের সেবা ও পূজা করছেন ভক্তরা।

শিবরূপে তুমি শান্তির আধার

দয়ার সাগর প্রেম অবতার

উঁচু নিচু ভেদ নাহিক তোমার

কে পারে তেমারে চিনিতে?

উল্লেখ্য যে, রোহিনী কুমার মজুমদারের লিখিত গ্রন্থে দেখা যায়, ১৩৩৩ বাংলায় শ্রী শ্রী ঠাকুরের নির্দেশে তিনি চাঁদপুর মাতৃপীঠ বালিকা বিদ্যালয়ের সুপার পদে যোগদান করেন এবং ঐ বছর তাঁর স্টাফ কোয়ার্টারে শ্রী শ্রী ঠাকুর নিজে উপস্থিত থেকে একান্ত পার্ষদ শ্রদ্ধেয় উপেন্দ্র সাহার পৌরোহিত্যে প্রথম দোল উৎসবের সূচনা করেন।

বিঃ দ্রঃ শ্রীমতি রেণুকাপ্রভা সাহা, শ্রীযুক্ত অনিল সাহা, শ্রীযুক্ত সুনীল সাহা এবং শ্রীযুক্ত যাদব চন্দ্র সাহা প্রমুখ দোলমন্দিরের ইতিকথা লিখতে ও তথ্য সংগ্রহে আমাকে সহযোগিতা করেছেন। যেহেতু তাঁরা সকলেই কৈবল্য প্রাপ্ত হয়েছেন, আমি তাঁদের বিদেহী আত্মার চির শান্তি কামনা করছি।

আমার এ লেখাটি ২০০৩ খ্রিস্টাব্দে প্রস্তুত করে প্রিয় মাসিমা শ্রীমতি রেণুকাপ্রভা সাহাকে পড়ে শোনানোর পর তিনি আমায় পাঁজা করে ধরে পুত্রবৎ স্নেহে আশীর্বাদ করে বলেন, আমি মারা গেলে তুই আমার শ্রাদ্ধাদি করবি। সেদিন মাসিমা আমাকে পলান্ন ও ছানার রসা নিজ হাতে রান্না করে পরিবেশন করেছিলেন।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়