সোমবার, ০৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:১৫

সাক্ষাৎকার : অধ্যাপক ডা. মো. মোরশেদ আলম তালুকদার

রোগীকে মা-বাবা, ভাই-বোনের মতো মনে করে চিকিৎসা করতে হবে

অনলাইন ডেস্ক
রোগীকে মা-বাবা, ভাই-বোনের মতো মনে করে চিকিৎসা করতে হবে

অধ্যাপক ডা. মো. মোরশেদ আলম তালুকদার। ঢাকা ডেন্টাল কলেজ ও হাসপাতালের অধ্যাপক ও ইউনিট হেড। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি মুখ ও চোয়ালের ক্যানসার, দুর্ঘটনায় চোয়াল ভেঙে যাওয়া, জন্মগত ঠেঁাট ও তালুকাটা এবং জটিল পুনর্গঠনমূলক অস্ত্রোপচারে চিকিৎসা করেছেন। হাজীগঞ্জের সাদ্রা গ্রামের কৃতীসন্তান মোরশেদ আলমের শৈশব ও কৈশোরের একটি বড় অংশ কেটেছে চঁাদপুর শহরে। শুক্রবার তিনি দৈনিক চঁাদপুর কণ্ঠের ‘চিকিৎসাঙ্গন’-এর মুখোমুখি হন। এ সময় তুলে ধরেন তঁার জীবনের অজানা নানা দিক। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন : আলআমিন হোসাইন। চঁাদপুরের হাজীগঞ্জে আপনার শৈশব কীভাবে কেটেছে? ছোটবেলায় কি কখনো ভেবেছিলেন চিকিৎসক হবেন? ডা. মো. মোরশেদ আলম তালুকদার : আমার গ্রামের বাড়ি হাজীগঞ্জের সাদ্রা। তবে আমার শৈশবের বড় একটা সময় কেটেছে খুলনায়। আমার বাবা পিডিবির পরিচালক ছিলেন। বাবার সরকারি চাকরির সূত্রে জন্মের পর থেকেই খুলনায় ছিলাম। সেখানে ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছি। এরপর বাবা চঁাদপুরে বদলি হয়ে আসেন। আমি প্রায় এক বছর বলাখাল যোগেন্দ্রনারায়ণ উচ্চবিদ্যালয়ে পড়েছি। পরে বাবা আমাকে চঁাদপুর হাসান স্কুলে ভর্তি করেন। নবম ও দশম শ্রেণিতে সেখানে পড়াশোনা করে ১৯৮২ সালে কৃষি বিজ্ঞান বিভাগ থেকে মেধাতালিকায় তৃতীয় স্থান অর্জন করি। ছয় বিষয়ে লেটার পেয়েছিলাম আমি। ১৯৮৪ সালে চট্টগ্রাম কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করি এবং ঢাকা ডেন্টাল কলেজ থেকে ১৯৯১ সালে বিডিএস পাস করি। মূলত ছোটবেলা থেকেই চিকিৎসক হওয়ার ইচ্ছা ছিল। আমার বাবা-মাও চাইতেন আমি চিকিৎসক হই। বিশেষ করে আমার মা আমাকে বলতেন, ‘তুমি ডাক্তার হবে’। ছাত্রজীবনে পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলার সঙ্গেও যুক্ত ছিলাম। বিশেষ করে ফুটবল ও ক্রিকেট খেলতাম। চিকিৎসা পেশায় আসার পেছনে প্রধান অনুপ্রেরণা কার কাছ থেকে পেয়েছিলেন? ডা. মো. মোরশেদ আলম তালুকদার : আমার মা-বাবাই সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা। তবে চিকিৎসক হিসেবে কয়েকজন মানুষও আমাকে অনুপ্রাণিত করেছেন। আমার নানিকে অনেক চিকিৎসকের কাছে দেখানো হয়েছিল। প্রায় ২০ থেকে ২৫ জন চিকিৎসক দেখানোর পরও তিনি ভালো হচ্ছিলেন না। পরে তঁাকে তৎকালীন পিজি হাসপাতালের পরিচালক (বর্তমান বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়) জাতীয় অধ্যাপক ডা. নুরুল ইসলামের কাছে নেওয়া হয়। তিনি মাত্র দুটি ওষুধ দিয়েছিলেন। অথচ আগের অনেক চিকিৎসায় কাজ হয়নি, তঁার দেওয়া ওষুধে নানি ভালো হয়ে গেলেন। বিষয়টি আমাকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল। তখন আমার মনে হয়েছিল, একজন দক্ষ চিকিৎসক মানুষের জীবনে কত বড় পরিবর্তন আনতে পারেন। এছাড়া চঁাদপুরের ডা. নুরুর রহমান ও ডা. এমএ গফুরের মতো চিকিৎসকরাও আমাদের সময়ের আদর্শ ছিলেন। ১৫তম বিসিএস দিয়ে সরকারি চাকরিতে যোগ দেওয়ার সেই সময়কার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল? ডা. মো. মোরশেদ আলম তালুকদার : ১৫তম বিসিএসে উত্তীর্ণ হয়ে সরকারি চাকরিতে যোগ দিই। আমার প্রথম পোস্টিং হয় শাহরাস্তি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। সেখানে প্রায় দুই বছর ডেন্টাল সার্জন হিসেবে দায়িত্ব পালন করি। ওরাল অ্যান্ড ম্যাক্সিলোফেসিয়াল সার্জারির মতো জটিল বিষয়কে বেছে নেওয়ার কারণ কী ছিল? ডা. মো. মোরশেদ আলম তালুকদার : আমি যখন ইন্টার্নশিপ ও পরবর্তী প্রশিক্ষণে ছিলাম, তখন প্রচুর ক্যানসারের রোগী দেখেছি। দুর্ঘটনায় চোয়াল ভাঙা রোগীও দেখেছি। পান, জর্দা ও তামাক ব্যবহারকারীদের মুখের ক্যানসারও অনেক দেখেছি। তখন বুঝতে পারি, এই রোগীদের জন্য বিশেষায়িত চিকিৎসার প্রয়োজন। ম্যাক্সিলোফেসিয়াল সার্জারি এই রোগগুলোর চিকিৎসার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। এই বিষয়ে উচ্চতর শিক্ষা নেওয়ার জন্য এমএস কোর্সে ভর্তি হই। এফসিপিএস ও জাপানের মনবুশো বৃত্তির সুযোগও পেয়েছিলাম। কিন্তু এমএস কোর্স চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। পঁাচ বছর পড়াশোনা শেষে ম্যাক্সিলোফেসিয়াল সার্জারিতে এমএস ডিগ্রি অর্জন করি। ওরাল ক্যানসারের ওপরও ফেলোশিপ করেছি। এই চিকিৎসায় এখন শুধু আক্রান্ত অংশ কেটে ফেলে দেওয়া হয় না। রোগীর শরীরের অন্য জায়গা থেকে হাড় ও মাংস নিয়ে হারানো অংশ পুনর্গঠন করা হয়। বুক, পা বা উরু থেকে প্রয়োজন অনুযায়ী হাড় ও মাংস নিয়ে মুখের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ পুনর্গঠন করা যায়। আগে মূল লক্ষ্য ছিল রোগীর জীবন বঁাচানো। এখন জীবন বঁাচানোর পাশাপাশি চেষ্টা করি হারানো চেহারাটাও যতটা সম্ভব আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দিতে। এটিই পুনর্গঠনমূলক সার্জারি। ঢাকা ডেন্টাল কলেজে অধ্যাপক ও ইউনিট হেড হিসেবে কাজ করার অনুভূতি কেমন? ডা. মো. মোরশেদ আলম তালুকদার : ঢাকা ডেন্টাল কলেজ হাসপাতাল দেশের অন্যতম বড় ম্যাক্সিলোফেসিয়াল সার্জারি কেন্দ্র। আমাদের হাসপাতালে ২০০টি শয্যা আছে। এর মধ্যে ১৫০টি ম্যাক্সিলোফেসিয়াল সার্জারির জন্য। সারা দেশ থেকে মুখের ক্যানসার, বড় টিউমার, চোয়াল ভাঙা, ঠেঁাট ও তালুকাটা, চোয়ালের সংক্রমণসহ বিভিন্ন জটিল রোগী এখানে আসেন। অনেক অস্ত্রোপচার দুই, তিন, চার এমনকি ছয় ঘণ্টা পর্যন্ত চলে। আমাদের আইসিইউ ও পোস্ট-অপারেটিভ সাপোর্ট আছে। এখানে এমএস ও এফসিপিএসের মতো পোস্টগ্র্যাজুয়েট কোর্সও চালু আছে। প্রতিবছর শিক্ষার্থীরা ভর্তি হচ্ছে। বিদেশি বিশেষজ্ঞ দলও নিয়মিত আসে। জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার চিকিৎসকদের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ হয়েছে। একজন শিক্ষক হিসেবে আমি মনে করি, এত বড় একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করার সুযোগ পাওয়া এবং একই সঙ্গে চিকিৎসা ও শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত থাকা বড় দায়িত্বের বিষয়। আপনার প্রতিষ্ঠানে কাজের পরিবেশ কেমন? ডা. মো. মোরশেদ আলম তালুকদার : আমাদের বিভাগটি বড়। এখানে অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক, সহকারী অধ্যাপক, লেকচারার, রেজিস্ট্রারসহ বিভিন্ন পর্যায়ের চিকিৎসক ও শিক্ষক রয়েছেন। পূর্ণাঙ্গ পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ড, আইসিইউ ও সেন্ট্রাল অক্সিজেন ব্যবস্থা আছে। বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সঙ্গেও নিয়মিত কাজ করার সুযোগ রয়েছে। ফলে চিকিৎসা, প্রশিক্ষণ ও গবেষণার জন্য ভালো পরিবেশ তৈরি হয়েছে। মুখ ও চোয়ালের সমস্যা নিয়ে মানুষ সাধারণত কী ধরনের ভুল বা দেরি করে থাকে? ডা. মো. মোরশেদ আলম তালুকদার : সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো অজ্ঞতা এবং দেরি করা। দঁাতের ক্ষয়কে আমরা অনেক সময় গুরুত্ব দিই না। দঁাতে গর্ত হওয়ার পরও চিকিৎসা না করিয়ে যখন নার্ভ পর্যন্ত পেঁৗছে যায়, তখন প্রচণ্ড ব্যথা হয়। এরপর দঁাত ফেলে দেওয়াকেই অনেকে সমাধান মনে করেন। আগে দঁাত তোলার প্রবণতা বেশি ছিল। এখন দঁাত সংরক্ষণের চিকিৎসা আছে। আরেকটি বড় সমস্যা হলো দঁাতের সংক্রমণ থেকে পুঁজ হওয়া। এই পুঁজ গাল, চোয়াল ও গলার দিকে ছড়িয়ে যেতে পারে। এমনকি শ্বাসনালিতে চাপ সৃষ্টি করে রোগীর জীবনও ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। অনেক সময় হাসপাতালে এসে সামান্য একটি ইনসিশন করে পুঁজ বের করে দিলেই রোগী দ্রুত স্বস্তি পান। কিন্তু দেরি করলে পরিস্থিতি জটিল হয়ে যায়। আমাদের সমাজে একটি কথা আছে, দঁাত থাকতে দঁাতের মর্যাদা বুঝি না। কথাটি সত্যি। দঁাতের যত্ন ও নিয়মিত চিকিৎসার ব্যাপারে সচেতনতা আরও বাড়াতে হবে। জন্মগতভাবে ঠেঁাট কাটা বা তালু কাটার সমস্যার চিকিৎসা এখন কতটা সহজ হয়েছে? গরিব রোগীরা কতটা সহায়তা পান? ডা. মো. মোরশেদ আলম তালুকদার : এখন এই চিকিৎসা অনেক সহজ হয়েছে এবং ব্যাপকভাবে করা হচ্ছে। একসময় ঠেঁাটকাটা ও তালুকাটা শিশুদের সামাজিকভাবে অনেক পিছিয়ে থাকতে হতো। পরিবারও নানা সমস্যার মুখোমুখি হতো। আমরা জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কাজ করে এসব রোগীর চিকিৎসা শুরু করি। গণমাধ্যমে প্রচার করে রোগীদের রেজিস্ট্রেশন করতাম। অনেক রোগীকে বিনা মূল্যে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। এখন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সহযোগিতায় দরিদ্র রোগীদের চিকিৎসা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। একজন শিক্ষক হিসেবে ছাত্রদের মধ্যে কোন দুর্বলতাটি বেশি দেখতে পান? ডা. মো. মোরশেদ আলম তালুকদার : আমাদের সময় শিক্ষার্থীরা বই কিনে পড়ত। এখন ডিজিটাল যুগে এসে অনেক শিক্ষার্থী ডিভাইসনির্ভর (এআই) হয়ে গেছে। তারা বইয়ের ভলিউম পড়ে না, লাইব্রেরিতে সময় দেয় না। গুগল বা বিভিন্ন ডিজিটাল মাধ্যম থেকে দ্রুত উত্তর পাওয়ার চেষ্টা করে। চিকিৎসক হওয়ার জন্য শুধু তথ্য জানা যথেষ্ট নয়। মৌলিক বই পড়তে হবে। অ্যানাটমি, ফিজিওলজি, মেডিসিনসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়ের ভিত্তি শক্ত করতে হবে। আরেকটি বিষয় হলো ক্লিনিক্যাল অ্যাটেনশন। রোগীর কাছ থেকে হাতে-কলমে শেখার সুযোগ যত বেশি হবে, একজন চিকিৎসক তত ভালোভাবে তৈরি হবেন। চঁাদপুর বা হাজীগঞ্জের মানুষ আপনার কাছে চিকিৎসা নিতে এলে বিশেষ কোনো সহযোগিতা করেন? ডা. মো. মোরশেদ আলম তালুকদার : গত ২৫ বছর ধরে চঁাদপুর, বিশেষ করে হাজীগঞ্জকে কেন্দ্র করে রোগীদের সেবা দিয়ে আসছি। চঁাদপুর, শাহরাস্তি, ফরিদগঞ্জ, লাকসাম, কচুয়া, এমনকি কুমিল্লা থেকেও রোগী আসে। আমি চেষ্টা করি আমার এলাকার মানুষ যেন চিকিৎসাসেবা সহজে পায়। অনেক সময় বিনা পয়সায় চিকিৎসা করেছি। বড় ও জটিল অস্ত্রোপচারও করেছি। দীর্ঘ কর্মজীবনে একজন সফল সার্জন ও শিক্ষক হিসেবে আপনার সবচেয়ে বড় তৃপ্তি বা প্রাপ্তি কোনটি? ডা. মো. মোরশেদ আলম তালুকদার : ছোটবেলা থেকে বাবা-মা চেয়েছিলেন আমি ডাক্তার হই। আমি ডাক্তার হতে পেরেছি। যে বিষয়ে ডাক্তার হতে চেয়েছিলাম, সেই বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করতে পেরেছি এবং ক্যানসার নিয়ে গবেষণা করার সুযোগ পেয়েছি। বিশেষ করে আমার মায়ের ক্যানসারে মৃত্যুর পর ক্যানসার চিকিৎসা ও গবেষণার প্রতি আমার যে আগ্রহ তৈরি হয়েছিল, সেটি বাস্তবে কাজে লাগাতে পেরেছি। ম্যাক্সিলোফেসিয়াল সার্জারি ও ওরাল ক্যানসার নিয়ে কাজ করতে পারছি এবং রোগীদের সেবা দিতে পারছি। এটিই আমার সবচেয়ে বড় তৃপ্তি। যে তরুণেরা ভবিষ্যতে চিকিৎসক বা সার্জন হতে চান, তঁাদের উদ্দেশ্যে কী বলবেন? ডা. মো. মোরশেদ আলম তালুকদার : তঁাদের পড়াশোনার দিকে আরও মনোযোগী হতে হবে। ভালো চিকিৎসক হতে হলে শুধু চিকিৎসাবিজ্ঞান জানলেই হবে না, মানবিকও হতে হবে। রোগীর সঙ্গে কখনো অমানবিক আচরণ করা যাবে না। রোগীকে নিজের মা, বোন বা ভাইয়ের মতো বিবেচনা করে সেবা দিতে হবে। রোগীকে সময় দিতে হবে, তঁার কথা শুনতে হবে। চিকিৎসক হিসেবে মানবিক গুণাবলি, জ্ঞান ও আন্তরিকতা নিয়ে কাজ করতে হবে। তাহলেই একজন চিকিৎসক সফল হতে পারবেন এবং মানুষের কাছে তঁার পরিচিতি ও গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হবে।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়