প্রকাশ : ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:০৯
বিশ্বমানবতার মুক্তির দিশারী মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা:)

কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে সংক্ষিপ্ত জীবনী:
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম-
সমস্ত প্রশংসা মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের জন্য। দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক আমাদের প্রিয় নবী, সর্বশেষ রাসুল, বিশ্বমানবতার পথপ্রদর্শক হযরত মুহাম্মদ (সা:) -এর প্রতি এবং তাঁর পরিবার-পরিজন ও সাহাবায়ে কেরামের প্রতি।
ভূমিকা: ইসলাম-পূর্ব আরব সমাজে শিরক, কুসংস্কার, গোত্রীয় হিংসা-বিদ্বেষ, অন্যায়, সুদ, মদ্যপান, জুয়া, নারী নির্যাতন ও নানা সামাজিক অনাচার ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল। এমন এক অন্ধকার সময়ে মহান আল্লাহ মানবজাতির হিদায়াতের জন্য তাঁর সর্বশেষ নবী ও রাসুল হযরত মুহাম্মদ (সা:)-কে প্রেরণ করেন।
আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন— “আমি আপনাকে সমগ্র বিশ্বজগতের জন্য রহমতস্বরূপই প্রেরণ করেছি।” — সূরা আল-আম্বিয়া: ১০৭
অর্থাৎ রাসুলুল্লাহ (সা:) শুধু কোনো একটি জাতি, ভূখণ্ড বা যুগের জন্য নন; তাঁর রিসালাত মানবজাতির জন্য এক মহান রহমত।
জন্ম ও শৈশব: মহানবী হযরত মুহাম্মদ মক্কার সম্মানিত কুরাইশ গোত্রের বনি হাশিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন আবদুল্লাহ ইবনে আবদুল মুত্তালিব এবং মাতা আমিনা বিনতে ওহাব।
তাঁর জন্মের নির্দিষ্ট তারিখ নিয়ে ঐতিহাসিক মতভেদ রয়েছে। তবে সহিহ হাদিসে প্রমাণিত যে তিনি সোমবার জন্মগ্রহণ করেন। (৫৭০ খ্রিস্টাব্দ) শৈশবেই তিনি পিতা ও পরে মাকে হারান। এরপর তাঁর দাদা আবদুল মুত্তালিব এবং দাদার ইন্তেকালের পর চাচা আবু তালিব তাঁর লালন-পালনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
শৈশবের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় তিনি হালিমা সাদিয়া (রা.)-এর কাছে লালিত-পালিত হন। তাঁর জীবন শুরু থেকেই ছিল আল্লাহর বিশেষ হেফাজত ও পরীক্ষার মধ্য দিয়ে।
সততা ও বিশ্বস্ততার অনন্য দৃষ্টান্ত:
যৌবনে মহানবী (সা:) ছিলেন অসাধারণ সত্যবাদী, আমানতদার ও উত্তম চরিত্রের অধিকারী। মক্কার মানুষ তাঁকে ‘আল আমিন’—বিশ্বস্ত এবং ‘আস-সাদিক’—সত্যবাদী বলে জানতো।
তাঁর চরিত্রের সর্বোচ্চ স্বীকৃতি এসেছে স্বয়ং আল্লাহর কাছ থেকে—“নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রের অধিকারী।” — সূরা আল-কলম: ৪
আর রাসুলুল্লাহ (সা:)-এর জীবন সম্পর্কে আল্লাহ বলেন— “নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসুলের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ।”
— সূরা আল-আহযাব: ২১
হযরত খাদিজা (রা.)-এর সঙ্গে বিবাহ: ২৫ বছর বয়সে মহানবী (সা:) সম্মানিত ও সম্ভ্রান্ত ব্যবসায়ী হযরত খাদিজা (রা.)-কে বিবাহ করেন। তাঁদের দাম্পত্য জীবন ছিল ভালোবাসা, বিশ্বস্ততা ও পারস্পরিক সহযোগিতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। হযরত খাদিজা (রা.) ছিলেন নবুওয়াতের প্রথম যুগের অন্যতম প্রধান সহায়ক এবং সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণকারী।
খাদিজা (রা.) জীবিত থাকা পর্যন্ত রাসুলুল্লাহ (সা:) আর কোনো বিবাহ করেননি। পরবর্তীকালে তাঁর অন্যান্য বিবাহগুলো বিভিন্ন সামাজিক, পারিবারিক ও দাওয়াতি প্রজ্ঞার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল।
নবুওয়াত ও প্রথম ওহি: চল্লিশ বছর বয়সে মহানবী (সা:) মক্কার নিকটবর্তী হেরা গুহায় নির্জনে ইবাদত ও চিন্তায় সময় কাটাতেন। সহিহ বুখারির বর্ণনায়, তাঁর কাছে প্রথম ওহি আসার পূর্বে সত্য স্বপ্নের মাধ্যমে ওহির সূচনা হয়েছিল। এরপর হেরা গুহায় ফেরেশতা জিবরাইল (আ.) এসে তাঁকে আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রথম ওহি পৌঁছে দেন। প্রথম ওহির সূচনা হয়—“পড়ুন আপনার প্রতিপালকের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন।” — সূরা আল-আলাক: ১
প্রথম পাঁচ আয়াতে জ্ঞান, সৃষ্টি ও আল্লাহর শিক্ষা সম্পর্কে মানবজাতিকে গভীর বার্তা দেওয়া হয়েছে। এরপর ওহি অব্যাহত থাকে এবং মহানবী (সা:) আল্লাহর পক্ষ থেকে মানবজাতির হিদায়াতের জন্য সর্বশেষ ওহি তথা আল-কুরআন মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে থাকেন। প্রথম ওহির ঘটনা সহিহ বুখারিতে বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে।
ইসলামের দাওয়াত: প্রথমে তিনি নিকটজন ও বিশ্বস্ত ব্যক্তিদের মধ্যে ইসলামের দাওয়াত দেন। সর্বপ্রথম হযরত খাদিজা (রা.) ঈমান গ্রহণ করেন। পুরুষদের মধ্যে হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.), কিশোরদের মধ্যে হযরত আলী (রা.) এবং মুক্তিপ্রাপ্ত দাসদের মধ্যে হযরত যায়েদ ইবনে হারিসা (রা.) প্রথমদিকের ঈমানদারদের অন্তর্ভুক্ত।
প্রায় তিন বছর সীমিত পরিসরে দাওয়াত দেওয়ার পর মহানবী (সা:) প্রকাশ্যে ইসলামের দাওয়াত শুরু করেন। তিনি মানুষকে আহ্বান জানান— এক আল্লাহর ইবাদত করো, শিরক বর্জন করো, সত্যবাদী হও, আমানত রক্ষা করো, ন্যায় প্রতিষ্ঠা করো এবং মানুষের অধিকার আদায় করো।
নির্যাতন, ধৈর্য ও তায়েফে গমন: ইসলামের দাওয়াত ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে মক্কার মুশরিকরা মুসলমানদের ওপর নির্যাতন শুরু করে। হযরত বিলাল (রা.), আম্মার ইবনে ইয়াসির (রা.), তাঁর পিতা ইয়াসির (রা.) ও মাতা সুমাইয়া (রা.)সহ বহু সাহাবি কঠিন নির্যাতন সহ্য করেন। হযরত সুমাইয়া (রা.) ইসলামের প্রথম যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শহিদ।চাচা আবু তালিব ও প্রিয়তমা স্ত্রী খাদিজা (রা.)-এর ইন্তেকালের পর মহানবী (সা:) -এর ওপর বিপদ আরও বেড়ে যায়। তিনি তায়েফে দাওয়াতের উদ্দেশ্যে গমন করেন; কিন্তু সেখানেও তাঁকে কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করা হয় এবং পাথর নিক্ষেপ করে আহত করা হয়। তবুও তিনি প্রতিশোধের পথ বেছে নেননি। তাঁর জীবন আমাদের শেখায়—বিপদের মধ্যেও ধৈর্য, দয়া ও আল্লাহর ওপর ভরসা রাখতে হয়।
ইসরা ও মিরাজ: আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় নবী (সা:)-কে এক বিশেষ মু‘জিযার মাধ্যমে সম্মানিত করেন। কুরআনে বলা হয়েছে—
“পবিত্র ও মহান তিনি, যিনি তাঁর বান্দাকে রাতে ভ্রমণ করিয়েছেন...” — সূরা আল-ইসরা: ১।
ইসরা-মিরাজ ছিল মহানবী-এর জীবনের এক অনন্য অলৌকিক ঘটনা। এ সফরের সঙ্গে সালাতের বিধানের সম্পর্ক রয়েছে; সহিহ হাদিসে এ বিষয়ে বিভিন্ন বর্ণনা রয়েছে। তাই ২৭ রজবকে মিরাজের নিশ্চিত তারিখ হিসেবে উল্লেখ না করে আমরা বলতে পারি—মিরাজ নবুওয়াতের মক্কি জীবনের এক বিশেষ সম্মানিত ঘটনা।
হিজরত ও মদিনার জীবন:
মক্কার কুরাইশরা মহানবী (সা:)-কে হত্যার ষড়যন্ত্র করলে আল্লাহর নির্দেশে তিনি হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-কে সঙ্গে নিয়ে মদিনার উদ্দেশ্যে হিজরত করেন। তাঁরা সওর গুহায় কিছু সময় অবস্থান করেন। হিজরত ছিল ইসলামের ইতিহাসের এক যুগান্তকারী ঘটনা। মদিনায় পৌঁছে মহানবী (সা:) প্রথমে মসজিদে কুবা প্রতিষ্ঠা করেন। পরে মসজিদে নববী নির্মাণ করেন এবং মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি মদিনায় এমন একটি সমাজ প্রতিষ্ঠা করেন যেখানে ঈমান, ন্যায়বিচার, পারস্পরিক অধিকার, শান্তি ও সামাজিক দায়িত্ব ছিল রাষ্ট্র ও সমাজজীবনের ভিত্তি।
মক্কা বিজয় ও ক্ষমার মহান দৃষ্টান্ত: হুদায়বিয়ার সন্ধির পর কুরাইশপক্ষের মিত্ররা চুক্তি ভঙ্গ করলে মহানবী (সা:) মক্কার দিকে অগ্রসর হন। হিজরি অষ্টম সালে মুসলমানরা মক্কা বিজয় করেন। মহানবী (সা:) বিজয়ী হয়ে মক্কায় প্রবেশ করলেও তাঁর অন্তরে প্রতিহিংসা ছিল না। তিনি সাধারণ ক্ষমার মহান দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
তিনি কাবাঘর থেকে মূর্তিগুলো অপসারণ করেন এবং আল্লাহর বাণী পাঠ করেন— “বলুন, সত্য এসেছে এবং মিথ্যা বিলুপ্ত হয়েছে।”—সূরা আল-ইসরা: ৮১ মক্কা বিজয় প্রমাণ করে—সত্যিকারের বিজয় প্রতিশোধে নয়; ন্যায়, ক্ষমা ও আল্লাহর আনুগত্যে।
বিদায় হজ ও ঐতিহাসিক ভাষণ: হিজরি দশম বছরে মহানবী (সা:) বিদায় হজ পালন করেন এবং আরাফার ময়দানে ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদান করেন। তিনি মানুষের জীবন, সম্পদ ও সম্মানের মর্যাদা, নারীর অধিকার, আমানতদারি, সুদ বর্জন এবং মুসলিম ভ্রাতৃত্বসহ বহু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নির্দেশনা দেন। এই সময় আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন— “আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম...”— সূরা আল-মায়িদাহ: ৩
ওফাত: বিদায় হজের পর মহানবী (সা:) অসুস্থ হয়ে পড়েন। অসুস্থতার সময়ও তিনি সালাত ও উম্মতের বিষয়ে গভীরভাবে চিন্তিত ছিলেন। অবশেষে হিজরি ১১ সালের রবিউল আউয়াল মাসে, সোমবার, ৬৩ বছর বয়সে তিনি মহান আল্লাহর সান্নিধ্যে প্রত্যাবর্তন করেন। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। তাঁর ইন্তেকালে সাহাবায়ে কেরাম গভীরভাবে শোকাহত হন। কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া কুরআন, সুন্নাহ ও মহান আদর্শ আজও মানবজাতির জন্য আলোর পথ।
মহানবী (সা:)-এর জীবন থেকে আমাদের শিক্ষা: মহানবী (সা:)-এর জীবনী শুধু ইতিহাসের একটি অধ্যায় নয়; এটি আমাদের জীবনের পথনির্দেশ।
আমরা তাঁর জীবন থেকে শিখবো: সত্যবাদিতা ও আমানতদারি, আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আনুগত্য, নামাজ ও ইবাদতের গুরুত্ব, মাতা-পিতার প্রতি সম্মান, নারী ও দুর্বল মানুষের অধিকার, প্রতিবেশীর হক, ক্ষমা ও সহনশীলতা, ন্যায়বিচার ও মানবিকতা, বিপদে ধৈর্য, এবং সকল মানুষের প্রতি দয়া ও সদাচরণ। কারণ আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন—“নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসুলের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ।”— সূরা আল-আহযাব: ২১ আর মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয় নবী (সা:)-এর চরিত্র সম্পর্কে বলেছেন—“নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রের অধিকারী।”— সূরা আল-কলম: ৪
উপসংহার : সুতরাং ঈদে মিলাদুন্নবী উপলক্ষে শুধু আলোচনা, সভা বা দরুদ পাঠ করাই যথেষ্ট নয়; মহানবী (সা:)-কে সত্যিকারভাবে ভালোবাসার প্রমাণ হলো তাঁর সুন্নাহ ও আদর্শকে আমাদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে বাস্তবায়ন করা।
আসুন, আমরা তাঁর শিক্ষা অনুসরণ করে সত্য, ন্যায়, শান্তি, মানবতা ও আল্লাহর আনুগত্যের সমাজ গড়ে তোলার চেষ্টা করি। আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদ ওয়া আলা আলে মুহাম্মাদ।
হে আল্লাহ! আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা:)-এর সুন্নাহ অনুসরণ করার তাওফিক দিন, তাঁর প্রতি সত্যিকারের ভালোবাসা দান করুন এবং কিয়ামতের দিন তাঁর শাফায়াত নসিব করুন। আমিন, ইয়া রাব্বাল আলামিন।
*লেখক পরিচিতি : আলহাজ্ব মোঃ নুর ইসলাম খান অসি
সাবেক পরিচালক (অপারেশন), ঘূর্ণিঝড় পরিস্থিতি কর্মসূচি (সিপিপি), দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার। মোবাইল : ০১৭১১৫৮৫৮৭৫।








