প্রকাশ : ০৭ মার্চ ২০২৬, ১০:৫৫
পাতা ও আকাশ

দুই এক ফিটও উড়তে পারে না ‘একটি পাখি’। সে ব্যথা পেয়েছে। পা কেটে গেছে। সে এখন উড়বে কীভাবে? খাবার কীভাবে আহরণ করবে?
একদিন স্কুল থেকে ফেরার সময় চোখে পড়লো একটি হালকা সবুজ বর্ণের পাখি। হয়তো বাজরিগার তার প্রজাতি। সে ব্যথা পেয়েছে। উড়তে পারবে না। দেখে নিজেকে সামলাতে পারলাম না। বললাম, কিরে ছোট্ট পাখি, ব্যথা পেয়েছিস কী করে? ইশ, কত রক্ত! আয় আমার সাথে।
পাখিটি কিচির-মিচির শুরু করলো, হয়তো ভয় পেয়েছে। বললাম, না রে, ভয় পাস না। আমি তোর ক্ষতি করবো না। পাখিটিকে নিয়ে আসলাম বাসায়। মা দেখে বললো, কিরে!? পাখিটিকে কোথায় পেলি? পরে আমি কিছু বলার আগেই মা বললো, “আগে দে, পাখিটিকে ব্যান্ডেজ করে দিই।”
মাকে পাখিটি দিয়ে চলে গেলাম কাপড় বদলে হাত-মুখ ধুতে। হাত-মুখ ধুয়ে এসে দেখলাম পাখিটি এখন আগের থেকে ভালো আছে। দেখে খুব ভালো লাগলো। কিন্তু পাখিটিকে দেখে মনে হলো, পাখিটি ক্ষুধার্ত। সমস্যা ছিলো একটাÑআমি তো জানি না পাখিরা কী খায়! তবু চিন্তাটা পরে কমলো, কারণ এই যুগে কত অ্যাপ আছে, অও আছেÑতাদের জিজ্ঞেস করলেই তো পাওয়া যায় বাজরিগার প্রজাতির পাখিরা কী খায়।
দেরি না করে চ্যাটজিপিটিকে জিজ্ঞেস করলাম। কলমি শাক, পালং শাক, সজনে পাতা ইত্যাদি পাখিটির খাবার। বাসায় কলমি শাক ছিলো, তো আমি পাখিটিকে তাই খেতে দিলাম। পাখিটি খুব সুন্দর করে খেলো। আমিও দেখে খুশি হলাম।
পরেরদিন বাবা একটি খাঁচা এনে দিলো। এভাবেই দিন কাটে। পাখিটির সাথে আমি প্রত্যেকদিন সময় কাটাই, খেলা করি। আমার ছোটো বোনও খুব আনন্দ পেতো। আমার ছোটো বোন কবিতা বলতো, গান গাইতো এবং পাখিটি তা শুনে নাচতো। দেখে আমিও খুব আনন্দ পেতাম।
আস্তে আস্তে পাখিটি আমাদের পরিবারের একটি অংশ হয়ে উঠলো। হঠাৎ একদিন দেখলাম পাখিটি অসুস্থ। কিছুক্ষণ সার্চ করার পর জানলাম, পাখিটি যে প্রজাতির, সেটির বাঁচার জন্য একটি সঙ্গী দরকার। তারপর আর কী—পরেরদিন একটি নীল পাখি আনলাম। কয়েকদিনের মধ্যে পাখি দুটো ভালো বন্ধু হয়ে গেলো। মেয়ে পাখিটাও সুস্থ এখন!
পাখিগুলোর খাঁচাটার সাথে কয়েকটা ফুলের গাছ লাগালাম। প্রত্যেকদিন সকাল হতো আমার পাখির কিচির-মিচিরে। সকালের হালকা হাওয়া, মিষ্টি রোদ ও পাখিদের কিচির-মিচির আমার সকালটাকে মুগ্ধকর করে তুলতো।
সকালের মিষ্টি রোদটা যখন ফুলগুলোর ওপর পড়তো, তখন মনে হতো আল্লাহ আসলেই আমাদের জন্য জগৎটা যত্ন করে বানিয়েছেন। রাতে যখন পাখিগুলো ঘুমাতো, তখন দেখতাম পাখিগুলো দাঁড়িয়ে ঘুমাচ্ছে। তবুও মহান আল্লাহ তায়ালা তাদের নিচে পড়তে দিচ্ছেন না। তারা নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে। সারাদিন তারা খেলেছে, গল্প করেছে, গান করেছেÑএখন তারা শান্তিতে ঘুমাচ্ছে। মহান আল্লাহ তাদের সুরক্ষিত রেখেছেন।
সেখানে আমি তো আল্লাহর সৃষ্টির সেরা জীব “মানুষ”Ñআমি কেন এত চিন্তা করি? আল্লাহ তো আমাকে অনেক শখ করে বানিয়েছেন। পাখিগুলোকে দেখতাম আর এগুলো ভাবতাম। ভেবে শান্তি পেতাম। সারাদিনের ক্লান্তি দূর হয়ে যেতো। চিন্তা দূর হয়ে যেতো। আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করতাম।
পাখিগুলোর জন্য আমি প্রকৃতির সৌন্দর্য বুঝতে শিখেছিলাম, বুঝতে শিখি আমাদের জীবনের মানে। জীবন নিয়ে আর কোনো আক্ষেপ ছিলো না। পাতা মানে মেয়ে পাখিটা আর আকাশ মানে ছেলে পাখিটা। তাদের গায়ের রং অনুযায়ী নামগুলো রেখেছিলাম।
তাদের দেখে বুঝতে শিখেছিলামÑমানুষ ধোঁকাবাজ হলেও প্রাণীরা হয় না। তারা আমার জন্য একটি নিঃশব্দ বন্ধু হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তারা সবার হাতে কামড় দিলেও আমার হাতে দিতো না।
২৫/১২/২০২৫ আগের বছরের এই দিনটাতে সকালে উঠে আমি দেখেছিলাম, ছেলে পাখিটা অর্থাৎ আকাশ খাঁচার ভেতরে নেই। সে ডানা মেলে পাড়ি দিয়েছে কোনো এক গন্তব্যে। আমার সামনে খাঁচার বাইরে বসে ছিলো। আমি ধরতে গেলে সে উড়ে যায়। হয়তো সে আমাকে বিদায় জানানোর জন্যই বসে ছিল।
অতঃপর আমার চোখ গেলো মেয়ে পাখিটার দিকে। সে আকাশ মানে তার বন্ধুর যাওয়ার পথেই তাকিয়ে ছিলো। এগুলো দেখে কখন যে চোখ বেয়ে পানি পড়লো খেয়াল করিনি। সেদিন রাতটা কোনোমতে কাটালাম।
পরদিন সকালে উঠে দেখি পাতা মানে মেয়ে পাখিটা আর নেই। সে উড়তে পারতো না, ব্যথা পাওয়ার পর উড়া ভুলে গেছেÑতাই আমি নিশ্চিন্ত ছিলাম, হয়তো এটা উড়ে যাবে না। কিন্তু পরে দেখি, সে আকাশের মতো আমাকে ছেড়ে পৃথিবীর আকাশে উড়াল দেয়নিÑসে তো অনন্তকালের মতো চলে গিয়েছে।
“পাখিটা মারা গেছে।”
পাখিটিকে পেয়ে প্রথমদিন যেমন খুশি হয়েছিলাম, হারিয়ে ঠিক ততটাই কষ্ট হচ্ছে। যাওয়ার আগে তারা আমায় আরেকটি শিক্ষা দিলোÑ“কোনো কিছুই সারাজীবন থাকে না।”
তাদের থেকে অনেক কিছু শিখেছি আমিÑপ্রাকৃতিক সৌন্দর্য, আল্লাহর নেয়ামত ও আরো নানা কিছু। তারা হয়তো এই বিষয়গুলো বুঝতে শেখানোর জন্যই আমার জীবনে এসেছিলো। যখন আমি এগুলো বুঝতে পারি, তখন তারা বিদায় নেয়।
আমার জীবনের একটি সুন্দরতম অধ্যায় তারা!
সানজিদা আহমেদ লাইসা : ৮ম শ্রেণি, কেএফটি কলেজিয়েট স্কুল, মতলব দক্ষিণ, চাঁদপুর।








