প্রকাশ : ০৭ মার্চ ২০২৬, ১০:৫২
বড়বেলার স্কুলজীবন: সময়ের আনন্দ ও বিষাদ-গাথা

জীবন অনেক সুন্দর। মৃত্যুর মতো রোমাঞ্চকর সুন্দর। লেখাটা হঠাৎ থমকে যাওয়ার মতো; মনে হবে কী পড়লাম! লেখা তখনই পূর্ণতা পায়, যখন পড়ার পর মনে হাহাকার জেগে ওঠে। বই পড়ার শুরু ছোটবেলা থেকে, সেবা প্রকাশনীর বই দিয়ে। এরপর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বয়সভিত্তিক বই পড়তে গিয়ে পড়াটা প্রাত্যহিক জীবনের মোহনীয়তার আরেকটা কারণ হয়ে রইলো।
আমার পড়ার খারাপ-ভালো দিক যেটাই বলি না কেন, সেটা হলোÑআমি যখন যা পড়ি, তার মাঝে আমার বসবাস শুরু হয়। যার জন্য বইয়ের প্রভাব আমার জীবনে অনেক বেশি। বইয়ের মতো আমি মুভি দেখতে গিয়েও তাতে ডুবে যাই। অহরহ কান্নাকাটি করার বাতিক আছে; বই পড়ে আকুল হয়ে কেঁদেছি দুইবার। বিখ্যাত লেখক হারুকি মুরাকামির লেখা ‘নরওয়েজিয়ান উড’ পড়ে নিজেকে ধরে রাখতে পারিনি। বই যে শেষ, এটা বুঝতে বুঝতে চোখের জল আকুল হয়ে নেমে এসেছিল।
টানা তিন দিন কিছু সময় বাদ দিয়ে পড়া শেষ করলাম ‘বড়বেলার স্কুলজীবন’। এটা ঠিক আত্মজীবনী না, আবার ঠিক ভ্রমণকাহিনীও নয়; কিছু সময়ের সমষ্টি, যে সময় আনন্দ এবং বিষাদকে একসাথে টেনে নিয়ে গিয়েছে। খুব পছন্দের বিষয় রয়েছে বর্ণনায়, পড়তে গিয়ে আরাম বোধ হবে। সাবলীল এবং সহজ কথায় প্রকাশ। মনে হচ্ছিল আমি নিজেই এই সময়টুকু অতিক্রম করেছি।
বই যখন পাঠককে আঁকড়ে ধরে, তখন বই পড়ার বিষয়টি আলাদা মাত্রা পায়। আজকাল চারপাশের হাজারো শব্দের আয়োজন, ভিড়, চলমান মুহূর্তের দ্রুততাÑসব মিলিয়ে সময়ের অস্থিরতায় ভোরের হাওয়ার স্পর্শে কোমলতা তুলে আনে বই। বই নিমিষেই মনোযোগ ধারণ করে মানুষকে এক বিন্দুতে নিয়ে আসে। খুব আয়োজন করে সকালের রোদে, গরম চায়ের উষ্ণতায় মিশিয়ে পড়া হয়ে গেল মারুফা সুলতানা হীরামনির লেখা বইটি।
আমি এর আগে হারুকি মুরাকামির ‘নরওয়েজিয়ান উড’ পড়েছিলাম। ওটার পর দীর্ঘদিন আমি কিছু পড়তে পারছিলাম না। মাঝে কিছু ছোট ছোট লেখা পড়লেও বড় কোনো লেখা পড়া হয়ে ওঠেনি। ‘বড়বেলার স্কুলজীবন’ পড়ার অনেকগুলো কারণ ছিল। প্রথমত বইয়ের নাম। স্কুলজীবন বলতে আমরা সাধারণত শৈশবকেই বুঝি। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা জীবন থেকে অনেক বেশি অন্য এক অনুভব মিশে থাকে তখন, যখন মানুষ নিজে থেকে বুঝতে পারে শিক্ষা কতটা জরুরি। তখন সেই শিক্ষায় আনন্দ ছুঁয়ে যায়। মানুষ তখন শুধু পড়ার জন্য শেখে না, সেই শিক্ষায় সে নিজের সমস্ত সত্তাকে আবৃত করে নেয়। তখন সেটা প্রথম প্রহরকে অতিক্রম করে যায়।
দ্বিতীয় ভালো লাগার কারণ বইয়ের প্রচ্ছদ ও পৃষ্ঠা। বইটি লেখকের দক্ষিণ কোরিয়ার ‘কউও ঝপযড়ড়ষ ড়ভ চঁনষরপ চড়ষরপু ধহফ গধহধমবসবহঃ’-এ পড়াশোনাকালের প্রতিচ্ছবি, যা রূপকথা হয়ে বর্ণিত হয়েছে। প্রায় ১ বছর ৪ মাস পরিবার থেকে দূরে, কিন্তু নিজের সত্তার একান্ত কাছে থাকা কোরিয়ান জীবন, অসম্ভব মায়াময় প্রকৃতি, আধুনিকতার সাথে প্রকৃতির প্রেমÑযে প্রেমে আধুনিকতা বাধা নয় বরং হয়ে উঠেছে আগলহীন, আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকা হিরন্ময় সাথী।
লেখক কোরিয়ায় থাকাকালীন পড়াশোনার পাশাপাশি প্রচুর বই পড়েছেন; সংখ্যাটা হাজারের কাছাকাছি। এটি একটি বিশাল বিষয়। বই নিয়ে তাঁর অনুভবটুকু দেখেন কী অদ্ভুতÑ’একেকটা বই একেকটা প্রেমের মতো। অনেক অভিজ্ঞতা দিয়ে যায়। সুখের অভিজ্ঞতা আবার দুঃখের অভিজ্ঞতা। প্রতিটি অভিজ্ঞতাই আনন্দদায়ক।’ আসলে বই যে কী অসাধারণ জিনিস, তিনি তা খুব সহজে তুলে এনেছেন।
বইটিতে প্রতিদিনের কথোপকথনের পাশাপাশি এসেছে তাঁর শৈশবের ছোট ছোট ঘটনা। যেখানে মোহনগঞ্জের নানার বাড়ির উঠোনে বসে শীতের সময় শিমের তরকারি, খেত থেকে তুলে আনা মুলো আর কাঁচামরিচ দিয়ে ভাত খাওয়ার আয়েশ দেখতে পাওয়া যায়।
এই বইটির আরও একটা ভালো লাগার দিক হচ্ছে, কিছু জায়গায় তিনি প্রাসঙ্গিক ভাবে নিজের মতামত তুলে ধরেছেন। সময়ের প্রয়োজনে এটা খুব মজার এবং শিক্ষণীয়। বইটি পড়তে গিয়ে অবসাদ ছুঁয়ে যাবে না। সহজ ও সাবলীল ভাষার প্রয়োগ এটিকে প্রাণবন্ত করেছে। একটি নতুন দেশ, নানাবিধ লাইব্রেরির বর্ণনা, প্রকৃতি আর জীবনের গল্প বইটিকে একটি কথোপকথনের রূপ দিয়েছে। ফলে এটি প্রাণ পেয়েছে।
হাতে নিয়ে বই পড়ার মজাই আলাদা। এটি ছুঁয়ে থাকে করতলে, চোখে, মনে আর মগজে। পৃষ্ঠার মসৃণতা, কোমল হলুদ আভা আর প্রচ্ছদ মুহূর্তেই মনে স্থান করে নেয়। ওহ, বইয়ের শেষ অংশে আমি কান্না ধরে রাখতে পারিনি; কারণ মনে হচ্ছিল আমিও লেখিকার সাথেই নিজ দেশে ফিরছিলাম...।
প্রকাশনী: মায়ান প্রকাশনী
প্রচ্ছদ: পাভেল
পৃষ্ঠা: ২৮৭
মূল্য: ৬৭৫
প্রকাশকাল: ২০২৫








