রবিবার, ০১ মার্চ, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ
  •   ১৬-২৫ মার্চ নদীতে বালুবাহী বাল্কহেড চলাচল বন্ধ থাকবে : নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়

প্রকাশ : ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:১৮

কৃষ্ণচূড়ার ডায়েরি

ডি. এম. ফয়সাল
কৃষ্ণচূড়ার ডায়েরি

“একুশ মানেই রক্তে ভেজা, নিকষ কালো দিন

একুশ মানেই সবার মনে, বাজছে খুশির বীণ”

“মাগো! ওরা বলে মুখের ভাষা কেড়ে নেবে! তোমার কোলে শুয়ে গল্প শুনতে দেবে না। বলো মা, তা কি কখনো হয়!

এ লাইনগুলো আজও বাঙালির মনে-প্রাণে আবেগের শিহরণ তৈরি করে।

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি! মায়ের ভাষা, প্রাণের ভাষা, হৃদয়ের ভাষা, বাংলা ভাষাকে রক্ষা করার জন্য রঞ্জিত হয়েছিলো সেদিন ঢাকার রাজপথ।

“রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই, মায়ের ভাষায় বলতে চাই” এই স্লোগানে মুখরিত হয়েছিল ঢাকার আকাশ বাতাস।

কিন্তু স্বৈরাচার পাকিস্তানি বাহিনীর নির্মমগুলিতে ঝাজরা হয়েছে বাংলার দামাল ছেলেদের বুক। মাতৃভাষার মর্যাদা সমুন্নত রাখতে গিয়ে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছেন বাংলার বিপ্লবী সূর্যসন্তানরা। নাম তাদের, “সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার”।

পৃথিবীর ইতিহাসে মাতৃভাষার জন্য রাজপথে বুকের রক্ত ঢেলে দেয়ার নজির এটাই প্রথম। সেদিন তাদের রক্তের বিনিময়ে ভেসেছিল দুঃখিনী বর্ণমালা ও মায়ের ভাষা। হৃদয়ের সবটুকু আবেগ ঢেলে দিয়ে সবার কণ্ঠে বেজে উঠে একুশের অমর সংগীত, ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলতে পারি’।

১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ, ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানের শাসক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ পরিস্কারভাবে ঘোষণা করেন, ‘উর্দু! উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’।

এ কথা শুনে সমাবেশ স্থলেই ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন ছাত্র ও জনতা। ভাষা আন্দোলনের দ্বিতীয় পর্যায় সূচনা হয় ১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি খাজা নাজিমুদ্দিনের ভাষণের মাধ্যমে। এদিন পল্টন ময়দানে একজনÑ

সভায় তিনি জিন্নাহের কথার পুনরাবৃত্তি করে বলেন, ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে একমাত্র উর্দু’।

নাজিমুদ্দিনের বক্তৃতার প্রতিবাদে ৩০ জানুয়ারি ঢাকার ছাত্ররা ধর্মঘট পালন করে। পরদিন ৩১ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বার লাইব্রেরি হলে ২১ ফেব্রুয়ারি হরতাল, সমাবেশ ও মিছিলের পরিকল্পনা করা হয়।

বেশ চাপে পড়ে যায় পাকিস্তান সরকার, ঢাকায় ১৪৪ ধারা জারি করে মিছিল-মিটিং নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভঙ্গের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। একুশে ফেব্রুয়ারি পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্ররা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে জড়ো হতে শুরু করে এবং ১৪৪ ধারার বিপক্ষে স্লোগান দিতে থাকে ‘রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই, ১৪৪ ধারা মানি না মানবো না’। পুলিশ তাদের উপর শুরু করে লাঠিচার্জ। ছাত্ররা পুলিশকে লক্ষ করে ইটপাটকেল ছোঁড়া শুরু করলে পুলিশ কাঁদুনে গ্যাস ছাত্রদের লক্ষ্য করে ছুঁড়ে মারে।

বিক্ষুব্ধ ছাত্রদের ঠেকাতে ব্যর্থ হয়ে গণপরিষদ ভবনের দিকে অগ্রসমান মিছিলের উপর নির্বিচারে নির্মমভাবে গুলি চালায় পাকবাহিনী। গুলিতে ঝাঁজড়া হয়ে যায় রফিকদের তাজা প্রাণ। মাটিতে লুটিয়ে পড়ে থাকে নিথর দেহ। ছাত্র হত্যার খবর ছড়িয়ে পড়লে জনতার ক্ষোভে পরে তড়িঘড়ি করে ২২ ফেব্রুয়ারি নুরুল আমিন সরকার, আইন পরিষদে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার একটি প্রস্তাব গ্রহণ করে এবং সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়ে যায়। তখন সবার মুখে উচ্চারিত হয়, ‘মোদের গরব মোদের আশা, আ মরি বাংলা ভাষা’।

১৯৫৬ সালে ২৬ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান জাতীয় সংসদে উর্দুর পাশাপাশি বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে সংবিধান পাস করে। সেদিনের সেই তরুণ যুবাদের রক্তক্ষয়ী বিপ্লবের ফলে বাঙালি ফিরে পায় মায়ের ভাষা, হৃদয়ের ভাষা, বাংলা ভাষা। আজ শুধু বাংলাদেশের নয়। এটি বিশ্বের কাছে এক গৌরব উজ্জ্বল ইতিহাস পরিচিত ভাষা।

১৯৭৪ সালের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে বাংলায় বক্তব্য দিলে বিশ্ববাসী জানতে পারে বাংলা ভাষার রহস্য। ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হিসেবে বাংলা ভাষাকে ইউনেস্কোর স্বীকৃতি বিশ্বদরবারে এনে দেয় সুবিশাল খ্যাতি। জাতিসংঘের ৫৬তম অধিবেশনে সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয় যে একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে উদ্যাপিত হবে এবং সে থেকে তা উদ্যাপিত হয়ে আসছে।

বাংলা শুধু বাংলাদেশের মানুষের মাতৃভাষা নয়। এর বাইরেও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরার বিস্তৃত এলাকায় মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলে। মাতৃভাষার সংখ্যার দিক থেকে বাংলার স্থান পঞ্চম অর্থাৎ চীনা, স্প্যানিশ, ইংলিশ ও হিন্দির পরেই বাংলার অবস্থান।

বিশ্বের প্রায় ৩০টি দেশে ১০০টিরও বেশি ইউনিভার্সিটিতে চালু রয়েছে বাংলা বিভাগ। সেখানে প্রতি বছর হাজার হাজার অ-বাঙালিরা বাংলা ভাষা শিক্ষা ও গবেষণার কাজ করছে। বাংলা ভাষার সাহিত্য, ইতিহাস ও সংস্কৃতি নিয়ে বহির্বিশ্বে ভারত ও বাংলাদেশের পর ব্রিটেন এবং আমেরিকায় সবচেয়ে বেশি চর্চা হয়ে থাকে।

বিশ্ব ৬টি দেশের রাষ্ট্রীয় বেতারে বাংলা ভাষার আলাদা চ্যানেল রয়েছে। ১০টি দেশে রেডিওতে বাংলা ভাষার আলাদা অনুষ্ঠান সম্প্রচার করা হয়। বৃটেনে ৬টি ও আমেরিকাতে ১০টি বাংলাদেশি মালিকানাধীন এবং বাংলা ভাষার টেলিভিশন রয়েছে। ইউরোপ ইতালিতে বর্তমানে পাঁচটি বাংলা ভাষার দৈনিক পত্রিকা এবং রোম ভেনিস শহরের থেকে ৩টি রেডিও স্টেশন পরিচালিত হচ্ছে। একুশে ফেব্রুয়ারি উদযাপিত হচ্ছে সারা পৃথিবীতে আমাদের মননের বাতিঘর হিসেবে।

২১ যখন সারা বিশ্বের ভাষা। কিন্তু হঠাৎ করে ভাষানী প্রসাদ মজুমদারের কবিতার লাইন মনে পড়ে, ‘জানেন দাদা! আমার বাংলাটা ঠিক আসে না’।

শুনে তখন মনে হয় বাংলার হৃদয়ে রক্তক্ষরণ শুরু হয়েছে। বর্তমান সময়ে ইংরেজি মাধ্যম স্কুল কলেজ ইউনিভার্সিটি গুলোর শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকদের ইংরেজির প্রীতি দেখে মনে হয় বাংলা ভাষার আকাশে যেন কালো মেঘের ঘন ছাড়া ভেসে উঠে। এখন আবার নতুন করে বাংলা ভাষা নিয়ে ভাবার সময় এসেছে। নতুবা বাংলা হারাবে তার পুরানো ইতিহাস ঐতিহ্য ও গৌরব।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়