প্রকাশ : ২৩ জুলাই ২০২৬, ১৩:১৯
প্রথমবার কুমিল্লায় এসে ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ টলিউড অভিনেতা দেবজিৎ ঘোষ

বাংলার আতিথেয়তায় মুগ্ধ কলকাতার জনপ্রিয় অভিনেতা; বিদায়ের ক্ষণে আবেগঘন কণ্ঠে বললেন— “আবারও ফিরে আসব এই বাংলায়, এই ভালোবাসার শহর কুমিল্লায়”
|আরো খবর
তাপস চন্দ্র সরকার, কুমিল্লা।
সীমান্তের কাঁটাতার দুটি রাষ্ট্রের ভূগোলকে আলাদা করতে পারে, কিন্তু একই ভাষা, একই সংস্কৃতি, একই ইতিহাস ও হৃদয়ের টানকে কখনো বিভক্ত করতে পারে না। যুগের পর যুগ ধরে দুই বাংলার মানুষের মধ্যে গড়ে ওঠা আত্মিক সম্পর্ক, সাংস্কৃতিক ঐক্য এবং ভালোবাসার বন্ধন আজও সমানভাবে অটুট। সেই চিরন্তন সম্পর্কের আরেকটি আবেগঘন অধ্যায়ের সাক্ষী হয়ে রইল ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতা থেকে আগত টলিউড চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় অভিনেতা দেবজিৎ ঘোষের প্রথম কুমিল্লা তথা বাংলাদেশ সফর।
বাংলাদেশে এই প্রথম পা রেখেই তিনি যেন খুঁজে পেলেন আপনজনের সান্নিধ্য। আর কুমিল্লার মাটিতে এসে অনুভব করলেন এক অদৃশ্য আত্মীয়তার বন্ধন। কয়েক দিনের এই সফর তাঁর কাছে কেবল একটি আনুষ্ঠানিক ভ্রমণ ছিল না; বরং এটি হয়ে উঠেছিল হৃদয়ে গেঁথে থাকা এক অনন্য স্মৃতি এবং দুই বাংলার সাংস্কৃতিক মিলনের এক উজ্জ্বল প্রতীক।
গত জুন মাসের শেষ দিকে কুমিল্লা বিদ্যাশিনী সাংস্কৃতিক একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক মিঠুন চক্রবর্তীর আন্তরিক আমন্ত্রণে কুমিল্লায় আগমন করেন দেবজিৎ ঘোষ। শহরে পৌঁছানোর পর থেকেই স্থানীয় শিল্পী, সাহিত্যিক, সংস্কৃতিকর্মী, সমাজসেবী এবং সাধারণ মানুষের উষ্ণ অভ্যর্থনায় তিনি অভিভূত হয়ে পড়েন। ফুলেল শুভেচ্ছা, আন্তরিক ভালোবাসা এবং হৃদয়ছোঁয়া আতিথেয়তায় তিনি বারবার অনুভব করেন—বাংলাদেশ তাঁর কাছে কোনো ভিনদেশ নয়; এটি যেন তাঁর নিজেরই আরেকটি ঠিকানা।
সফরের প্রতিটি দিন তিনি কুমিল্লার সমৃদ্ধ ইতিহাস, শতবর্ষের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, মানুষের সরল জীবনযাপন এবং আন্তরিক অতিথিপরায়ণতার সঙ্গে নিবিড়ভাবে পরিচিত হন। স্থানীয় শিল্পীদের মনোমুগ্ধকর পরিবেশনা, সঙ্গীত, আবৃত্তি, কবিতা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং বাঙালিয়ানার নানা আয়োজনে মুগ্ধ হয়ে তিনি দীর্ঘ সময় কাটান সবার সঙ্গে।
নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে আবেগঘন কণ্ঠে দেবজিৎ ঘোষ বলেন—
“বাংলাদেশে আসার ইচ্ছা আমার বহু দিনের। কিন্তু কুমিল্লায় এসে যে ভালোবাসা, সম্মান আর আন্তরিকতা পেয়েছি, তা আমার কল্পনারও বাইরে। এখানে এসে কখনোই মনে হয়নি আমি অন্য কোনো দেশে এসেছি। বরং মনে হয়েছে আমি আমার নিজের মানুষদের কাছেই ফিরে এসেছি।”
তিনি আরও বলেন, “বাংলার মানুষ অতিথিকে যেভাবে হৃদয় দিয়ে বরণ করে নেয়, তা সত্যিই বিরল। এই কয়েক দিনে যে অকৃত্রিম ভালোবাসা পেয়েছি, তা আমার জীবনের অন্যতম সেরা প্রাপ্তি। এই স্মৃতি আজীবন হৃদয়ে ধারণ করে রাখব। সুযোগ পেলেই আবারও পরিবারকে সঙ্গে নিয়ে বাংলায়, আবারও কুমিল্লায় ফিরে আসব।”
অভিনেতার এমন আন্তরিক অনুভূতি উপস্থিত সবার হৃদয় ছুঁয়ে যায়। অনেকের চোখে আনন্দ আর আবেগের অশ্রু ঝিলমিল করে ওঠে। কেউ তাঁর সঙ্গে স্মৃতিবন্দি হয়েছেন ছবিতে, কেউ করমর্দন করেছেন, আবার কেউ কয়েকটি কথা বলার সুযোগকেই জীবনের এক মূল্যবান স্মৃতি হিসেবে লালন করে রেখেছেন।
সফরজুড়ে তিনি স্থানীয় শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন এবং বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সম্ভাবনার ভূয়সী প্রশংসা করেন। তাঁর বিশ্বাস, দুই বাংলার শিল্পী, সাহিত্যিক ও সংস্কৃতিকর্মীদের পারস্পরিক যোগাযোগ এবং সাংস্কৃতিক বিনিময় যত বাড়বে, বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি ততই সমৃদ্ধ হবে।
কুমিল্লা বিদ্যাশিনী সাংস্কৃতিক একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক মিঠুন চক্রবর্তী বলেন, “দুই বাংলার শিল্পী ও সংস্কৃতির মধ্যে যে আত্মিক সম্পর্ক রয়েছে, সেটিকে আরও শক্তিশালী করাই আমাদের লক্ষ্য। দেবজিৎ ঘোষের মতো একজন গুণী শিল্পী কুমিল্লায় এসে মুগ্ধ হয়েছেন—এটি শুধু আমাদের প্রতিষ্ঠানের জন্য নয়, সমগ্র কুমিল্লাবাসীর জন্য গর্বের বিষয়। ভবিষ্যতেও দুই বাংলার সাংস্কৃতিক বিনিময় আরও বিস্তৃত করতে আমরা বৃহত্তর পরিসরে কাজ করে যেতে চাই।”
সফরের বিভিন্ন আয়োজনে দেবজিৎ ঘোষকে ফুলেল শুভেচ্ছা, সম্মাননা স্মারক এবং ভালোবাসার নিদর্শন হিসেবে নানা উপহার তুলে দেওয়া হয়। স্থানীয় শিল্পীদের সঙ্গে প্রাণবন্ত আড্ডা, গান, আলোকচিত্র ধারণ, স্মৃতিচারণ এবং সাংস্কৃতিক বিনিময়ের অসংখ্য মুহূর্তে মুখর হয়ে ওঠে তাঁর কুমিল্লা সফরের প্রতিটি দিন।
তবে সফরের সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্ত ছিল বিদায়ের ক্ষণ। বিদায়ের আগে কুমিল্লা আদালত অঙ্গনের পরিচিত মুখ অ্যাডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকার এবং কুমিল্লা বিদ্যাশিনী সাংস্কৃতিক একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক মিঠুন চক্রবর্তী তাঁর হাতে শুভেচ্ছা স্মারক ও ভালোবাসার উপহার তুলে দেন।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন নগরীর দিগাম্বরী তলাস্থিত শ্রীশ্রী গুপ্ত জগন্নাথ মন্দিরের প্রধান পুরোহিত স্বপন গোস্বামী, চন্দ্রিকা গীতা শিক্ষা কেন্দ্রের পরিচালক নীলাঞ্জন দাশ, কুমিল্লা বিদ্যাশিনী সাংস্কৃতিক একাডেমির সদস্যবৃন্দ এবং স্থানীয় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিশিষ্ট ব্যক্তিরা।
বিদায়বেলায় আবেগাপ্লুত কণ্ঠে দেবজিৎ ঘোষ বলেন, “এই ভালোবাসার ঋণ কোনোদিন শোধ করার নয়। কুমিল্লার মানুষ আমাকে যে হৃদয়ের জায়গা দিয়েছেন, তা আজীবন মনে রাখব। পৃথিবীর অনেক জায়গায় গিয়েছি, কিন্তু এমন আন্তরিক ভালোবাসা খুব কমই পেয়েছি। আমি আবারও আসব—এই বাংলার মানুষের কাছে, এই ভালোবাসার শহর কুমিল্লায়।”
তাঁর এই কথায় উপস্থিত অনেকেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। করতালির মধ্য দিয়ে তাঁকে আবারও ফিরে আসার আহ্বান জানান সবাই। হাসিমাখা মুখের আড়ালে লুকিয়ে ছিল বিদায়ের বেদনা, আবার ছিল পুনর্মিলনের অটুট প্রত্যাশাও।
একজন শিল্পীর এই সফর কেবল ব্যক্তিগত ভ্রমণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি দুই বাংলার ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস এবং হৃদয়ের গভীর সম্পর্কের এক জীবন্ত প্রতীক। রাজনৈতিক সীমারেখা মানুষকে আলাদা করতে পারে, কিন্তু শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি, মানবিকতা এবং ভালোবাসার বন্ধন কখনোই বিভক্ত হয় না।
দেবজিৎ ঘোষের কুমিল্লা সফর যেন আবারও প্রমাণ করে দিল—দুই বাংলার মানুষের হৃদয়ের ঠিকানা একটাই। সীমান্তের এপার কিংবা ওপার—বাংলার মানুষ আপনজনকে ভালোবাসা দিয়েই বরণ করে নেয়। সেই অফুরন্ত ভালোবাসার স্মৃতি হৃদয়ে ধারণ করে কলকাতায় ফিরলেন টলিউড অভিনেতা দেবজিৎ ঘোষ। রেখে গেলেন আবারও ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি, আর সঙ্গে করে নিয়ে গেলেন কুমিল্লাবাসীর আন্তরিকতা, ভালোবাসা ও অমলিন স্মৃতির এক অনন্য ভাণ্ডার।








